পরের দুই দিনে লিখে ফেললাম বইয়ের প্রথম দুই অধ্যায়। খেয়াল করলাম, হোথর্ন নিজেই বড় একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার লেখায়। সে দেখতে কেমন অথবা কীভাবে কথা বলে সেসব তেমন কোনো কঠিন ব্যাপার না, কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, ওর ব্যাপারে ঠিক কতখানি জানি নামি?
- স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে ওর। তখন গ্র্যান্টস হিলে থাকত ওরা।
- এগারো বছর বয়সী একটা ছেলে আছে হোথর্নের।
- এককথায় বলতে গেলে, গোয়েন্দা হিসেবে হোথর্ন দুর্দান্ত। এই ব্যাপারে স্বতঃস্ফূর্ত কিছু-একটা আছে ওর ভিতরে। কিন্তু একইসঙ্গে এই কথাও ঠিক, কোথাও কোনো জনপ্রিয়তা নেই ওর।
- মদ একেবারেই খায় না সে।
- পুলিশের মার্ডার স্কোয়াড থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে ওকে। অভিযোগ ছিল, কুখ্যাত এক যৌন-নিপীড়নকারীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল সে সিঁড়ি থেকে।
- সমকাম নিয়ে কোনো একজাতের ভীতি কাজ করে ওর মনে সম্ভবত।
- একটা রিডিং গ্রুপের সদস্য সে।
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের যুদ্ধবিমান সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে ওর।
- থেমস নদীর ধারে বিলাসবহুল আর দামি একটা জায়গার একটা ফ্ল্যাটে থাকে সে।
নাহ্, যথেষ্ট না। যখনই দেখা হয়েছে ওর সঙ্গে, যখনই ওর সঙ্গে কোথাও গিয়েছি, হাতে যে-কাজ ছিল সেটা ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলার তেমন কোনো সুযোগই পাইনি। একসঙ্গে ড্রিঙ্ক করিনি আমরা। হ্যাঁরো-অন-দ্য-হিলের সেই ক্যাফের ব্রেকফাস্টের কথা বাদ দিয়ে বললে কোথাও একসঙ্গে কিছু খাইনি। আমার সঙ্গে কখনও ভালো ব্যবহার করেনি সে… অবশ্য হাসপাতালে যে দেখা করতে গিয়েছিল, সে-কথা আলাদা। সে কোথায় এবং কীভাবে থাকে সেটাই যদি জানা না-থাকে আমার, তা হলে ওকে নিয়ে কীভাবে লিখবো? বসতবাড়ি আমাদের ব্যক্তিত্বের প্রথম এবং সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি, কিন্তু এখন পর্যন্ত নিজের বাসায় আমাকে দাওয়াত করেনি হোথর্ন।
টেলিফোন করবো কি না হোথর্নকে, ভাবলাম। ঠিক তখনই একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়। হোথর্নের সেই রিভার কোর্টের ঠিকানাটা আমাকে দিয়েছিল মিডোস। কাজেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার সপ্তাহখানেক পর, একদিন বিকেলে, ইনডেক্স কার্ড-দলা পাকানো কাগজ-পোস্ট ইট নোট ইত্যাদি সব ডেস্কের উপর ফেলে বেরিয়ে পড়লাম আমি।
দিনটা মনোরম। শার্টের নিচে একটু টান লাগছে আমার সেলাইয়ের জায়গাগুলোয়, তারপরও বাসন্তি উষ্ণ বাতাসে হাঁটতে ভালো লাগছে। ফ্যারিংডন রোড ধরে পৌঁছে গেলাম ব্ল্যাকফ্লায়ার্স ব্রিজের কাছে। আমার সামনে এখন নদীটা, ওই পাড়ে সারি সারি ফ্ল্যাট। বিলাসবহুল এই জায়গায় হোথর্নের মতো একজন মানুষ কী করে থাকে, ভাবতে গিয়ে আশ্চর্য না-হয়ে পারলাম না আরও একবার। এখানে থাকার মতো টাকা পায় কোত্থেকে সে?
যে-বিল্ডিঙে থাকে হোথর্ন, সেটার নাম আমাকে জানিয়েছে মিডোস, কিন্তু ফ্ল্যাটের নম্বরটা বলেনি। জায়গামতো পৌঁছে দেখলাম, খোলা একটা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন কুলি। এগিয়ে গেলাম তার দিকে। বুদ্ধি করে সঙ্গে করে একটা খাম নিয়ে এসেছি, ওটা বের করলাম পকেট থেকে
বললাম, ‘ড্যানিয়েল হোথর্ন নামের এক ভদ্রলোকের জন্য একটা চিঠি আছে আমার কাছে। চিঠিটা যে পৌঁছে দেয়া হবে তাঁর কাছে সেটা জানেন তিনি। কিন্তু চাপ দিলাম তাঁর ডোরবেলে, অথচ ভিতর থেকে সাড়া দিল না কেউ।’
কুলি লোকটা বয়স্ক, রোদে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে… মনে হয় উপভোগ করছে ব্যাপারটা। ‘হোথর্ন?’ খুঁতনি চুলকাল সে। ‘তিনি তো থাকেন পেন্টহাউসে। ভুল জায়গায় ডোরবেল বাজিয়েছেন আপনি।’
পেন্টহাউস?
উত্তরোত্তর আশ্চর্য হচ্ছি আমি।
এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে, কিন্তু এবার আর বেল বাজালাম না। কারণ আমি চাই না আমাকে ভিতরে ঢুকতে না-দেয়ার মতো কোনো অজুহাত খুঁজে পাক সে। টানা বিশ মিনিট অপেক্ষা করলাম দরজার বাইরে, তারপর ভিতর থেকে বেরিয়ে এল সেখানকার একজন বাসিন্দা। ঠিক তখন ভিতরে পা রাখলাম আমি, পকেট থেকে একগোছা চাবি বের করে সেগুলো হাতড়াচ্ছি… এমন ভান করছি যেন ওই দরজা খুলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলাম আমি নিজেই। আমার দিকে দ্বিতীয়বার তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না ওই বাসিন্দা।
লিফট ধরে পৌঁছে গেলাম টপ ফ্লোরে। তিনটা দরজা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমার মন বলছে, যে-ফ্ল্যাট থেকে নদী দেখা যায় সেটাতেই থাকে হোথৰ্ন। এগিয়ে গিয়ে চাপ দিলাম ডোরবেলে।
লম্বা নীরবতা।
বিরক্ত হয়ে ভাবছি হোথর্ন হয়তো বাইরে গেছে, এমন সময় খুলে গেল দরজাটা।
গোবরাটে দাঁড়িয়ে আছে হোথর্ন স্বয়ং।
পুরোপুরি হতবুদ্ধি হয়ে গেছে সে। সব সময় যে-স্যুট পরে, সেটাই পরে আছে, তবে কোটটা খুলে রেখেছে। হাতা গুটিয়ে রেখেছে শার্টের। আঙুলে ধূসর রঙ লেগে আছে।
‘টনি!’ চেঁচিয়ে উঠল সে। ‘আমাকে খুঁজে বের করলেন কী করে?’
‘আমারও নিজস্ব কিছু কায়দাকানুন আছে,’ ডাঁটের সঙ্গে বললাম আমি।
‘কায়দাকানুন না ছাই! মিডোসের সঙ্গে দেখা করেছেন আসলে। ঠিকানাটা তিনিই দিয়েছেন আপনাকে।’ চিন্তিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে হোথর্ন। ‘নিচের গেটের বেল বাজাননি আপনি। ‘
‘ভেবেছিলাম চমকে দেবো আপনাকে।’
‘দরকার ছিল না। কারণ আপনাকে এমনিতেই নিমন্ত্রণ জানাতাম আমার এখানে। কিন্তু… এখন তো একটা কাজে একটু বাইরে যেতে হবে আমাকে।’
