হোথর্ন বুঝতে পারল, চলে যাওয়ার সময় হয়েছে।
জানতে চাইল, ‘আপনাকে আর ক’দিন রাখা হবে এখানে?’
‘বলেছে আগামীকাল নাকি বাসায় যেতে পারবো।’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘আপনার কপাল ভালো… সময়মতো হাজির হতে পেরেছিলাম আমি।’
‘ওখানে যে যেতে হবে, জানলেন কী করে?’
‘আপনার খোঁজ পাওয়ার জন্য ফোন করেছিলাম আপনার অ্যাসিস্টেন্টকে। কোথায় গেছেন আপনি, সেটা জানিয়ে দিল সে আমাকে। কথাটা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। দুশ্চিন্তা হচ্ছিল আপনাকে নিয়ে।’
‘ধন্যবাদ।’
‘হাজার হোক যদি কিছু হয়ে যেত আপনার, তা হলে বইটা লিখত কে?’ দেখে মনে হচ্ছে, হঠাৎ করেই যেন অপ্রতিভ হয়ে গেছে হোথর্ন। ‘দেখুন… একটা কথা বলি আপনাকে… সেদিন আপনার সঙ্গে মিথ্যা বলেছিলাম আমি।’
‘কবে?’
‘ক্যান্টেব্রিতে। মুখের উপর আমার সমালোচনা করছিলেন আপনি, আর আমিও খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম আপনাকে নিয়ে। তাই বলেছিলাম, এই বইয়ের ব্যাপারে কথা বলেছি অন্য লেখকদের সঙ্গে। আসলে… আপনি ছাড়া আর কারও কাছে যাইনি আমি এই বইয়ের ব্যাপারে।’
লম্বা নীরবতা।
কী বলবো, জানি না আসলে।
‘ধন্যবাদ,’ বিড়বিড় করে বললাম শেষপর্যন্ত।
উঠে দাঁড়াল হোথর্ন। ‘আপনার সেই এজেন্টের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাকে পছন্দ হয়েছে আমার। সে বলেছে, সে নাকি আমাদের জন্য মোটা অঙ্কের অগ্রীম- টাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।’ হাসল। ‘আর কিছু হোক না-হোক, অন্তত লেখালেখি করার মতো কিছু-একটা পেয়ে গেলেন আপনি। আমার মনে হয় ভালোই হবে ব্যাপারটা।
চলে গেল সে।
শুয়ে আছি আমি। এইমাত্র যা বলে গেল হোথর্ন, ভাবছি সেটা।
ভালোই হবে ব্যাপারটা।
ঠিকই বলেছে সে।
সম্ভবত এই প্রথমবারের মতো সে-রকম কোনো সুযোগ দেখা দিয়েছে।
২৪. রিভার কোর্ট
বাসায় ফিরে এসেছি আমি। কাজ শুরু করে দিয়েছি।
খেয়াল করছি, কাজের যে-পদ্ধতি এবার অনুসরণ করতে হচ্ছে আমাকে, সেটা, সব সময় যেভাবে কাজ করি তার চেয়ে অনেক আলাদা। সাধারণত আমার মাথায় যখন কোনো বইয়ের চিন্তা ঢোকে, ওটা মাথায় নিয়েই বছরখানেক সময় পার করে দিই, তারপর ধীরেসুস্থে লিখতে বসি। কাহিনিটা যদি কোনো হত্যারহস্য হয়, তা হলে স্টার্টিং পয়েন্টটা হয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটাই। কেউ একজন অন্য কোনো একজনকে কোনো একটা কারণে খুন করে ফেলল। এরপর চরিত্রগুলো তৈরি করি আমি, তৈরি করি তাদের আশপাশের জগৎটা। বিভিন্ন সন্দেহভাজনের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করি। অতীতে তাদের সঙ্গে ঘটে গেছে এ-রকম কিছু বিশেষ ঘটনা উল্লেখ করি। তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করি। বাইরে যখন হাঁটতে যাই, ওই চরিত্রগুলো নিয়ে ভাবি… বিছানায় যখন শুয়ে থাকি, তখনও একই কাজ করি। এমনকী যখন বসে থাকি বাথরুমে, তখনও। মোদ্দা কথা হচ্ছে, পুরো কাহিনিটা যতক্ষণ-পর্যন্ত-না ভালো একটা আকৃতি লাভ করে আমার মাথার ভিতরে, ততক্ষণ পর্যন্ত লিখতে শুরু করি না। বই নিয়ে আলোচনা-অনুষ্ঠানে প্রায়ই একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয় আমাকে… শেষটা কী হবে তা না-জেনেই কোনো উপন্যাস লিখতে শুরু করি কি না আমি। না, সে-রকম কিছু করি না, কারণ আমার দৃষ্টিতে সে-রকম কোনো কাজের মানে হচ্ছে এমন কোনো ব্রিজ বানানো, যেটা শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা জানা থাকে না।
কিন্তু এবার আর ভাবাভাবির কিছু নেই আমার। কারণ এবার মালমশলা বলতে যা-কিছু আছে, সব আগেই দিয়ে দেয়া হয়েছে আমাকে। কাজেই বিশেষ এই বই লেখার ব্যাপারটা এখন আমার জন্য যতটা না সৃষ্টিনৈপুণ্যের, তার চেয়ে বেশি কাহিনিটাকে একটা উপযুক্ত কাঠামো দেয়ার। আরও বড় কথা হচ্ছে, এই কাহিনির কোনো কোনো মালমশলা নিয়ে আমি মোটেও খুশি না। সত্যি বলতে কী, ধান্দাবাজ কোনো হলিউড-অভিনেতাকে নিয়ে কিছু লিখতে চাইনি আমি। কারণ হলিউডের অনেকের সঙ্গে পরিচয় আছে আমার, তাদের কারও কারও সঙ্গে কাজও করেছি। আবার রেমন্ড কুন্স, ব্রুনো ওয়াং, ডক্টর বাটিমোর-সহ আরও অনেকে এই কাহিনিতে তেমন কোনো ভূমিকাই পালন করেননি। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার দরকার ছিল বলে তাঁদের কাছে গেছে হোথর্ন, কিন্তু শেষপর্যন্ত তাঁদের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে।
একটা প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে আমার মনের ভিতরে… সত্যির কতখানি কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করবো? জানি কিছু কিছু নাম বদল করতে হবে আমাকে… কাজেই কোনো কোনো ঘটনাও যদি বদল করে দিই, অসুবিধা কী?
নিজের নোট আর আইফোনের রেকর্ড ঘেঁটে দেখলাম, আসলে পুরোপুরি ভোঁতা না আমি। রবার্ট কর্নওয়ালিসের সঙ্গে যখন প্রথমবার দেখা হয়েছিল তখন একজায়গায় লিখেছিলাম ‘এই কেসে এই লোকের কোনো ভূমিকা থাকতেও পারে’… সঠিক প্রমাণিত হয়েছে আমার অনুমান। গোরখোদকারির কাজটা তার ভালো লাগত কি না সেটা জানতে চেয়েছিলাম আমি তার কাছে, শেষপর্যন্ত ওই প্রশ্নের জবাবই পরিণত হলো হত্যাকাণ্ডের মোটিভে। তার মানে খুব একটা খারাপ কাজ দেখাইনি আমি এই কেসে। কর্নওয়ালিসের গ্যারেজে একটা মোটরবাইক পার্ক করে রাখা ছিল, উল্লেখ করেছি সেটাও। হলে রাখা ছিল তার মোটরবাইকের হেলমেট… টুকে নিয়েছি সে-কথাও। ফ্রিজের ম্যাগনেট, পানিভর্তি গ্লাস, কী-হোল্ডার… নাহ্, মোটামুটি পঁচাত্তর শতাংশ ক্লু-ই আমি টুকে নিয়েছি আমার নোটবুকে। তবে মুশকিলটা হচ্ছে, এসব কুর গুরুত্ব বুঝতে পারিনি সময়মতো।
