‘আপনার মনে আছে হয়তো… মিসেস ক্যুপারের লিভিংরুমে সাইডবোর্ডের উপর পাওয়া গিয়েছিল তাঁর ক্রেডিট কার্ডটা। ওই জিনিস কেন এবং কী-করে গেল সেখানে, ভাবছিলাম আমি এই কেসের শুরু থেকে। আচ্ছা… আগে আরেকটা কথা বলি… কর্নওয়ালিস যেদিন খুন করেছে মিসেস ক্যুপারকে, সেদিন যে সে দুপুর দুটোর দিকে ফোন করেছিল ওই মহিলাকে, জানি আমরা। তখন গ্লোব থিয়েটারে ছিলেন মিসেস ক্যুপার। তাঁকে কেন ফোন করেছিল কর্নওয়ালিস, জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি তাকে। জবাবে বানোয়াট একটা কথা শুনিয়ে দিয়েছে সে… যেখানে দাফন করা হয়েছে মিস্টার ক্যুপারকে, সে-জায়গার প্লট নাম্বার কত, সেটা নাকি জানা দরকার ছিল তার। আপনিই বলুন, ওই তথ্য জেনে কী করবে লোকটা? আর যদি কিছু করার ছিলই, তা হলে চ্যাপেল অফিসে ফোন করে জেনে নিল না কেন? তখনই বুঝে গিয়েছিলাম, আমাদের সঙ্গে আসলে মিথ্যা কথা বলছে সে। কেন ফোন করেছিল সে মিসেস ক্যুপারকে, তা-ও অনুমান করে নিয়েছি… বলেছিল, মিসেস ক্যুপার তাঁর ক্রেডিট কার্ডটা ভুলে ফেলে গেছেন, তিনি যদি রাজি থাকেন তা হলে তাঁর বাসায় হাজির হয়ে কার্ডটা ফিরিয়ে দিতে পারবে কর্নওয়ালিস।
‘সুতরাং সেদিন সন্ধ্যায় শয়তানটা ঠিক ঠিকই হাজির হয়ে গেল মিসেস ক্যুপারের বাসায়। ততক্ষণে অন্ধকার ঘনাতে শুরু করেছে বাইরে। বাসায় মিসেস ক্যুপার সম্পূর্ণ একা। কর্নওয়ালিসকে ভিতরে ঢুকতে দিলেন তিনি। কার্ডটা লিভিংরুমের সাইডবোর্ডের উপর নামিয়ে রাখল শয়তানটা। তারপর এটা-সেটা নিয়ে কথা বলতে লাগল মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে… কালক্ষেপণ করতে চাইছিল আসলে, সুযোগ খুঁজছিল। এবং তখন, হঠাৎ করেই, রবার্ট কর্নওয়ালিসকে চিনে ফেলেন মিসেস ক্যুপার। বুঝতে পারেন, লোকটাকে আগেও কোথাও দেখেছেন। কোথায় দেখেছেন তা-ও মনে পড়ে যায় তাঁর… রাডায়। কর্নওয়ালিসের কথায় তখন গা ছমছম করে ওঠে তাঁর, ঘাবড়ে যান তিনি। বুঝতে পারেন, তাঁর ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নিয়েই হাজির হয়েছে লোকটা।
‘তখন কী করার ছিল মিসেস ক্যুপারের? যদি অ্যালার্ম বাজিয়ে দিতেন, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আক্রমণ করত কর্নওয়ালিস। লোকটা যে আসলে খেপাটে, সেটা হয়তো বোঝা হয়ে গিয়েছিল তাঁর। তাই তিনি ড্রিঙ্ক অফার করলেন কর্নওয়ালিসকে। কর্নওয়ালিস তখন পানি খেতে চাইল। কিচেনে গিয়ে ঢুকলেন মিসেস ক্যুপার, সঙ্গে সঙ্গে পর্দা বাঁধার দড়ি আলগা করে নিল শয়তানটা। পানি নিয়ে ফিরে আসার আগে ছেলের উদ্দেশে একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে দিলেন ডায়ানা ক্যুপার।’
একটু থামল হোথর্ন, সে বাকি কথা বলার আগেই বুঝে গেলাম কী বলতে চলেছে। ‘টেক্সট মেসেজটা অটো কারেক্ট করে নিয়েছিল মিসেস ক্যুপারের মোবাইল ফোন!’
‘ঠিক। মিসেস ক্যুপার আসলে লিখতে চেয়েছিলেন, I have seen the boy who was Laertes and I’m afraid। আসলে রাডায় থাকতে নিজের জন্য যে-নাম বেছে নিয়েছিল কর্নওয়াসিল… মানে, ড্যান রবার্টস, সেটা মনে করতে পারছিলেন না মিসেস ক্যুপার। কিন্তু তিনি চাইছিলেন, তাঁর লিভিংরুমে হাজির হয়েছিল কে, সেটা ড্যামিয়েনকে জানাতে। খুব দ্রুত টেক্সট করছিলেন তিনি… নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন আসলে। এমনকী বাক্যের শেষে ফুলস্টপ দেয়ার মতো সময়ও পাননি।
‘আর সে-কারণেই খেয়াল করেননি, তাঁর মোবাইলের অটো কারেক্ট অপশন সংশোধন করে নিয়েছে তাঁর টেক্সট মেসেজটা … I have seen the boy who was lacerated। যে-বাক্যের সোজাসাপ্টা অর্থ: ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখেছি আমি। ডিলের সেই দুর্ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল জেরেমি গডউইন… কিন্তু তার দেখা কিছুতেই পেতে পারেন না মিসেস ক্যুপার। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে… মিসেস ক্যুপার কিন্তু তখন সাংঘাতিক তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিলেন। কাজেই I have seen the boy who was lacerated… এত কথা লেখার মতো সময় পাওয়ার কথা না তাঁর। বরং তিনি যদি লিখতেন The boy who was injuredঅথবা যদি লিখতেন The boy who was hurt তা হলে কিন্তু নয়টি অক্ষরের বদলে সাতটি বা মাত্র চারটি অক্ষর লিখতে হতো তাঁকে। সেই অটো কারেকশনের কারণে ধোঁকা খেয়ে গিয়েছিলাম আমরা।
‘যা-হোক, টেক্সট মেসেজটা পাঠানোর পর লিভিংরুমে গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, সঙ্গে ছিল পানির গ্লাসটা। হয়তো পানি খাওয়া শেষ হলে কর্নওয়ালিসকে চলে যেতে বলতেন তিনি তাঁর বাসা থেকে। কিন্তু তাঁকে সে-সুযোগ দেয়নি কর্নওয়ালিস… খুব দ্রুত ছোবল হেনেছে। পানির গ্লাসটা মাত্র নামিয়ে রেখেছেন মিসেস ক্যুপার, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গলায় ফাঁস এঁটে দিয়েছে লোকটা, মুহূর্তের মধ্যেই শ্বাসরোধ করে দিয়েছে তাঁর। যখন বুঝতে পেরেছে মরে গেছেন মিসেস ক্যুপার, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লাশটা ফেলে রেখে ঘুরে বেরিয়েছে বাসার ভিতরে এদিকে-সেদিকে, এটা-সেটা তছনছ করেছে, কিছু জিনিস আবার সঙ্গে করে নিয়েও গেছে… বোঝাতে চেয়েছে কোনো একটা চোর ঢুকেছিল ওই বাড়িতে। তারপর ওই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে সে। এবং চলে যাওয়ার আগে খুব দক্ষতার সঙ্গে মুছে ফেলেছে নিজের সমস্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট।’
হাসপাতাল আসলে অদ্ভুত একটা জায়গা। চ্যারিং ক্রসে যখন নিয়ে আসা হলো আমাকে, পুরো জায়গাটা ছিল আলো ঝলমলে, ব্যস্ত আর কোলাহলে পূর্ণ। কিন্তু হঠাৎ করেই, বিশেষ করে ভিযিটিং আওয়ারের পর, সব কিছু যেন থমকে গেছে… কেউ যেন হুট করেই চাপ দিয়েছে কোনো একটা সুইচে। নিভিয়ে দেয়া হয়েছে বেশিরভাগ লাইট। নীরব হয়ে গেছে করিডরগুলো। একরকমের স্তব্ধতা বিরাজ করছে এখন পুরো হাসপাতালে… অস্বস্তি লাগছে আমার। একইসঙ্গে ক্লান্তিও অনুভব করছি। সেলাই দেয়া হয়েছে যেসব জায়গায়, সেগুলো ব্যথা করছে। হাত- পা নাড়াতে পারছি, কিন্তু সে-রকম কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করছে না কেন যেন। একরকমের অসাড়তা পেয়ে বসছে আমাকে… মানসিক যে-ধাক্কা খেয়েছি, হতে পারে সে-কারণেই হচ্ছে এ-রকম।
