‘কথাটা আমাকে বলেছে কর্নওয়ালিস।’
দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল হোথর্ন… এ-রকম কিছু করে বসবে সে, আশা করিনি। ‘কফিনের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল একটা মিউযিক প্লেয়ার… কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্সের ভিতরের কেউ যদি না-করে থাকে কাজটা, তা হলে অন্য কারও পক্ষে সম্ভব না সেটা। কারণ কফিনটা কী রকম, সেটা জানা জরুরি ছিল ওই কাজ করার জন্য… যে বা যারাই ওই মিউযিক প্লেয়ার চালান করে দিয়েছিল কফিনের ভিতরে, তাদের হাতে ছিল মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড। সবচেয়ে বড় কথা, ওই কফিনের কাছে যে-কোনো সময় একা থাকার একমাত্র সুযোগ ছিল কর্নওয়ালিসের। এবং এটাও জানা ছিল তার, নার্সারি রাইমটা শুনলে সেটার কী প্রভাব পড়তে পারে ড্যামিয়েনের উপর– অভিনয়ের ক্লাসে ড্যামিয়েনের কাছ থেকেই জানতে পেরেছে কথাটা। সে নিশ্চয়ই ঘাপটি মেরে ছিল ওই কবরস্থানের কোনো এক জায়গায়, নজর রাখছিল সব কিছুর উপর। তার পরিকল্পনাটা ছিল, ড্যামিয়েন যদি ফ্ল্যাটে ফিরে যায় তা হলে তাকে খুন করবে সেখানেই। পরিকল্পনাটা কাজে লেগে গেছে। শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর আমি যখন ফোন করেছিলাম লোকটাকে, তখন হয়তো সে দাঁড়িয়ে আছে ড্যামিয়েনের টেরেসে… অপেক্ষা করছে। তারপর যখন ড্যামিয়েন এল…’ অদৃশ্য কোনো এক ছুরি বাতাসে সাঁই সাঁই করে চালাল হোথর্ন, … সুযোগমতো ঝাঁপিয়ে পড়ল পাগলটা!’
‘কিন্তু ওই ফ্ল্যাটে এত জলদি গেল কী করে সে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘তার একটা মোটরবাইক ছিল। কেন, গ্যারেজে পার্ক করে রাখা অবস্থায় দেখেননি ওটা? মোটরসাইক্লিস্টরা যে-রকম চামড়ার-কাপড় পরে, আমার ধারণা সে-রকম কাপড় পরে ছিল সে, ফলে ড্যামিয়েনকে খুন করার সময় রক্তের ছিটা লেগে যায়নি তার শরীরে বা কাপড়ে। হত্যাকাণ্ডের পর ওই কাপড় খুলে ফেলে সে। তারপর সেগুলো হয় ফেলে দেয় নয়তো সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে যায়। লোকটা আসলে চতুর প্রকৃতির। সেদিন যখন দেখা করতে গিয়েছিলাম তার সঙ্গে, তার স্ত্রী জানতে চেয়েছিল, সে তখনও স্যুট পরে ছিল কেন। সে তখনও স্যুট পরে ছিল, কারণ সে জানত আমরা দেখা করতে যাবো তার সঙ্গে। সে আমাদেরকে দেখাতে চেয়েছিল, স্যুটটা একেবারে পরিষ্কার… কোথাও রক্তের দাগমাত্র নেই। বলেছিল, সে নাকি ছেলের স্কুলে নাটক দেখতে গিয়েছিল। তারপর ফিরে এসেছিল বাসায়। এরপর চা খেয়েছে। যেদিন সে খুন করেছে ড্যামিয়েনকে, সেদিনই এতগুলো কাজ করেছে।’
বিছানায় শুয়ে আছি আমি, ভাবছি হোথর্নের কথাগুলো। এখন সব কিছু পরিষ্কার হয়ে আসছে আমার কাছে। তারপরও মনে হচ্ছে, কোথাও বুঝি কিছু- একটা ছুটে যাচ্ছে। জানতে চাইলাম, ‘তার মানে… ডিলের সেই ঘটনার সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই?’
‘না।’
‘তা হলে নাইজেল ওয়েস্টনের উপর হামলা চালিয়েছিল কে? আর… আপনিই বা কেন বলেছিলেন ওই ঘটনার জন্য দোষ আমারই?’
‘বলেছিলাম, কারণ আসলেই দোষ ছিল আপনার।’ সিগারেটের একটা প্যাকেট বের করল হোথর্ন, কিন্তু মনে পড়ে গেল হাসপাতালে আছে সে, কাজেই পকেটে ঢুকিয়ে রাখল সেটা। ‘রবার্ট কর্নওয়ালিসের সঙ্গে যেদিন প্রথমবার কথা বলেছিলাম আমরা, আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন লোকটাকে, টিমোথি গডউইনের ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন কি না ডায়ানা ক্যুপার।’
‘এবং আমার মুখ থেকে সে-কথা শুনে রেগে গিয়েছিলেন আপনি।’
‘সেনাবাহিনীতে যেসব সৈন্য ভর্তি হয়, তারা প্রায়ই কিছু ভুলভ্রান্তি করে ফেলে; ওই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে আপনি সে-রকম একটা ভুল করেছিলেন। ভুলটা কী ছিল তা-ও বলে দিই। আপনি কর্নওয়ালিসকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ডিলে যে-দুর্ঘটনা ঘটেছিল, আমরা সেটার ব্যাপারে আগ্রহী। সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিল সে সুযোগটা, আমাদেরকে ভুল পথে ঠেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। শুধু তা-ই না, আমার মনে হয় ‘দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড’-এর ধারণাটাও ঢুকেছিল তার মাথায় তখনই। সে জানত, ওই রাইম আপসেট করে দেবে ড্যামিয়েনকে। .নাইজেল ওয়েস্টনের বাড়িতে আগুন লাগিয়েছে সে-ই, এবং আমি বলবো কাজটা করে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে সে। ডায়ানা ক্যুপারকে খালাস দিয়েছিলেন ওয়েস্টন। কাজেই গডউইনের দৃষ্টিভঙ্গিতে যদি বিচার করা হয়, তা হলে ওয়েস্টনও কিন্তু একজন টার্গেট। কিন্তু এই কেসে একটা কথা বার বার বলতে চেয়েছি আমি আপনাকে… দশ বছর পর কেন? দুর্ঘটনাটা যখন ঘটেছিল, চাইলে তার পরই শোধ নিতে পারতেন অ্যালান গডউইন অথবা তাঁর স্ত্রী; কিন্তু তা না-করে ন’ বছর এগারো মাস পর ফণা তুলতে হলো কেন তাঁদেরকে?’
‘আচ্ছা, বুঝতে পারলাম। এবার বলুন ওই টেক্সট মেসেজের কথা… ডায়ানা ক্যুপার যেটা পাঠিয়েছিলেন।’
ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘চলুন ফিরে যাই প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। বলা যায় ওটা অপরিকল্পিত ছিল… অনেকটা ঝোঁকের মাথায় কাজটা করে ফেলেছিল কর্নওয়ালিস। মিসেস ক্যুপার গিয়ে হাজির হয়েছিলেন কর্নওয়ালিসের অফিসে। তাঁর বাসার ঠিকানা জানা হয়ে গিয়েছিল লোকটার। হতে পারে, মিসেস ক্যুপার যে একা থাকতেন, সেটা তিনি নিজেই জানিয়ে দিয়েছিলেন কর্নওয়ালিসকে। আবার এমনও হতে পারে, ইনফর্মেশন যা-যা লাগে সব জেনে নিয়েছিল লোকটা মিসেস ক্যুপারের কাছ থেকে। এখন একটু ভেবে দেখুন… মিসেস ক্যুপারকে খুন করতে হলে তাঁর সঙ্গে তাঁর বাসায় একা দেখা করাটা কিন্তু খুব জরুরি কর্নওয়ালিসের জন্য। এবং সেজন্য যে-কোনো ছুতো দরকার তার। এবং সেই ছুতোটা কী, তা-ও বোধহয় অনুমান করতে পেরেছি আমি… ক্রেডিট কার্ড। ওটা ভুলে কর্নওয়ালিসের অফিসে ফেলে এসেছিলেন মিসেস ক্যুপার। আমার ধারণা, ওই জিনিস ফিরিয়ে দেয়ার বাহানাতেই ওই মহিলার বাসায় গিয়ে ঢোকে লোকটা।
