‘আমরা যেদিন গিয়েছিলাম কর্নওয়ালিসের বাড়িতে,’ বলে চলল হোথর্ন, ‘সেদিন নিজের ব্যাপারে অনেক কথাই বলেছে লোকটা, কিন্তু তার বয়স যখন বিশের কোঠায় ছিল তখন কী করেছে তা চেপে গেছে। যখন আত্মহত্যা করল তখন তার বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ ছিল। আমাদেরকে সে বলেছে, গোরখোদকারির এই ব্যবসা নাকি গত দশ বছর ধরে করছে। তার মানে এই কাজ শুরু করার আগে আরও অন্তত পাঁচটা বছর ছিল তার হাতে। এবং সে-সময়ে অন্য কিছু-একটা করেছে সে। আরেকটা কথা। আমরা যখন ছিলাম সেখানে, তার ছেলে অ্যান্ড্রিউ আমাদের সামনে হাজির হয়ে কী বলল? সে নাকি অভিনেতা হতে চায়। বারবারা কর্নওয়ালিসও বলেছিলেন আমাদেরকে কথাটা: অভিনয় মিশে আছে ওই ছেলের রক্তে। তিনি আসলে বলতে চেয়েছিলেন, বাবার কাছ থেকে অভিনয়ের নেশা পেয়েছে ছেলেটা। কিন্তু আমাদের সামনে হাজির হয়ে অ্যান্ড্রিউ যখনই বলতে চেয়েছিল কথাটা, সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দিয়ে কর্নওয়ালিস বলে উঠেছিল, এখন এসব নিয়ে কথা বলার সময় না। অ্যান্ড্রিউ জানত, তার বাবা একসময় একটা ড্রামা স্কুলে ছিল। কিন্তু কর্নওয়ালিস সেদিন ঘাবড়ে গিয়েছিল… কথাটা যদি ফাঁস হয়ে যায়, তা হলে ড্যামিয়েন আর তার মায়ের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার যোগসূত্রটাও ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
‘পুরো ব্যাপারটা তা হলে এ-ই,’ বললাম আমি। সব খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে এখন। ‘হ্যামলেট নাটকের প্রোডাকশন নিয়েই যত গণ্ডগোল! ওই নাটকের মাধ্যমে পাদপ্রদীপের আলোয় আসার কথা ছিল রবার্ট কর্নওয়ালিস ওরফে ড্যান রবার্টসের। এবং মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগও পেয়ে গিয়েছিল সে। বড় বড় সব এজেন্টদের দেখতে আসার কথা ছিল নাটকটা। কিন্তু ওর কাছ থেকে পুরো ব্যাপারটাই বলতে গেলে চুরি করে নিয়েছিল ড্যামিয়েন।’
‘কীভাবে করা হয়েছিল কাজটা, সে-ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলেছে কর্নওয়ালিস?’
‘না।’ কিছুক্ষণ ভাবলাম আমি। ‘আমান্ডা লেইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ড্যামিয়েনের। কিন্তু গ্রেস আমাদেরকে বলেছে, ওই দু’জনের মধ্যে নাকি ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। এবং সেটা সেই হ্যামলেট নাটকের রিহার্সেল শুরু হওয়ার ঠিক আগে। তখনই কোনো এক সময় ড্যানের সঙ্গে আমান্ডাকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলে গ্রেস।’ হঠাৎ করেই সব কিছু পরিষ্কার হয়ে গেল আমার কাছে। ‘কথাটা আসলে ঠিক না!’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। ‘কর্নওয়ালিসের সঙ্গে যাতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেজন্য ড্যামিয়েনই হয়তো বলেকয়ে রাজি করিয়েছিল আমান্ডাকে। ‘ আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল আমার। ‘আমার এক বন্ধু আছে রাডায়… লিয নাম… তিনি বলেছেন সে-সময় নাকি রাডা’র অনেকেই গ্রান্ডুলার ফিভারে আক্রান্ত হয়ে পড়ছিল…’
‘গ্রান্ডুলার ফিভারের আরেকটা নাম আছে… কিসিং ডিযিয,’ বলল হোথর্ন। ‘আমান্ডা ইচ্ছাকৃতভাবে ওই ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে ড্যানের মধ্যে। ফলে কী হলো? ড্যানকে বাদ দেয়া হলো হ্যামলেট নাটকের মুখ্য চরিত্র থেকে। সেই চরিত্র পেয়ে গেল ড্যামিয়েন, বাকিটা ইতিহাস। যা-হোক, ড্যামিয়েনের এই চালাকি ধরে ফেলেছিল কর্নওয়ালিস এবং কোনো দিনও ক্ষমা করেনি সে ধান্দাবাজ ওই লোককে। ক্ষমা করেনি আমান্ডাকেও। বছর চারেক পর খুঁজে বের করে সে মেয়েটাকে, এবং খুন করে।’
‘ওই মেয়েকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল সে। পরে নিজের সাতটা লাশের সঙ্গে দাফন করেছিল একেকটা টুকরো।’ মনে পড়ে গেল কর্নওয়ালিস কী বলেছিল আমাকে।
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘খুন করে কারও লাশ গুম করে ফেলতে চাইলে গোরখোদকারির কাজটা অনেক উপকারে আসতে পারে।’
‘কিন্তু কর্নওয়ালিসের স্ত্রী কিছু টের পেল না কেন? সে কেন বুঝতে পারল না কোথাও কিছু-একটা ঘাপলা আছে? ব্যাপারটা আশ্চর্য লাগছে আমার।’
‘কারণ ওই মহিলা আসলে কিছু বুঝতেই পারেনি,’ বলল হোথর্ন। ‘একটু মনে করে দেখুন আমাদেরকে কী বলেছিল সে। বলেছিল, কর্নওয়ালিস নাকি ড্যামিয়েনের একজন ভক্ত। কিন্তু আসলে বুঝতে পারেনি, ড্যামিয়েনের অভিনীত প্রতিটা নাটক আর সিনেমা কী সাংঘাতিক প্রভাব বিস্তার করেছে তার স্বামীর মনে। ড্যামিয়েনের প্রতিটা অভিনয় দেখেছে কর্নওয়ালিস, আর স্মরণ করেছে নিজের ব্যর্থ অভিনয়- ক্যারিয়ারের কথা। অভিনয়-জীবনে একটাই মাত্র সাফল্য ছিল ওই লোকের, আর সে-সাফল্য অনুযায়ীই নিজের তিন ছেলের নাম রেখেছিল সে।’
‘টনি, সেবাস্টিয়ান আর অ্যান্ড্রিউ। সবগুলো চরিত্র টুয়েল্থ নাইট-এর। এটা আমার চোখে আগে ধরা পড়ল না কেন?’
‘নাটকের ওই স্কুল ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর এই একটা মাত্র নাটকে অভিনয় করেছিল কর্নওয়ালিস। বেচারা মনে হয় ওই স্কুল ছেড়ে বের হওয়ার পর প্রতিটা দিনই ভেবেছে ড্যামিয়েনকে খুন করার কথা। ভুলভ্রান্তি যা-যা ঘটেছে তার সঙ্গে, সব কিছুর জন্য ড্যামিয়েনকেই দোষ দিয়ে গেছে সে।’
‘আর তারপর একদিন সকালে হুট করেই তার অফিসে হাজির হয়ে গেলেন ডায়ানা ক্যুপার।’
‘ঠিক। ড্যামিয়েনের নাগাল পাওয়া সম্ভব ছিল না কর্নওয়ালিসের পক্ষে। কারণ ড্যামিয়েন ছিল আমেরিকায়। সে ছিল বিখ্যাত একজন মানুষ। কাছের লোকজন সব সময় ঘিরে রাখত তাকে। কিন্তু যদি কোনো শেষকৃত্যানুষ্ঠানে হাজির করা যায় ড্যামিয়েনকে, তা হলে তাকে শেষ করে দেয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও যেতে পারে কর্নওয়ালিস। এবং সে-রকম কোনো সুযোগের জন্য বছরের-পর-বছর ধরে অপেক্ষা করছিল সে। আর সে-কারণেই শেষ করে দিল ডায়ানা ক্যুপারকে… উদ্দেশ্য একটাই: ড্যামিয়েনকে হাতের নাগালে পাওয়া।’
