লম্বা করে দম নিলাম আমি। ‘আত্মহত্যা করার?’
‘একদম ঠিক। তাঁর বাথরুমে কী পেয়েছিলাম আমরা, মনে আছে? তিন প্যাকেট টেমাযেপাম। আত্মহত্যা করার জন্য ওগুলো ছিল যথেষ্টের চেয়েও বেশি।’
‘তাঁর ডাক্তারের সঙ্গেও দেখা করেছিলাম আমরা। তিনি বলেছেন, মিসেস ক্যুপার নাকি ঘুমাতে পারতেন না।’
‘সে-কথা মিসেস ক্যুপার বলেছিলেন ডাক্তারকে। কিন্তু তিনি আসলে জমা করছিলেন ওষুধগুলো… পরে কোনো একসময় একবারে কাজে লাগাবেন ভেবে নিয়ে। তিনি হয়তো ধরেই নিয়েছিলেন, অনেক হয়েছে… আর না। তারপর… একদিন হুট করেই হারিয়ে গেল তাঁর অতি আদরের বিড়ালটা। আমার ধারণা, ওই ঘটনাই কাল হলো মিসেস ক্যুপারের জন্য। ততদিনে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন অ্যালান গডউইন, হুমকি দিয়ে এসেছেন। তাঁকে একটা চিঠিও পাঠিয়েছিলেন অ্যালান এবং সেটা পড়েছিলেন তিনি। তখন তিনি হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, অ্যালানই হত্যা করেছে তাঁর আদরের পোষা বিড়ালটাকে। মনে পড়ে, কী লিখেছিলেন অ্যালান তাঁর সেই চিঠিতে? আপনার উপর নজর রেখেছি আমি, জানি কোন্ কোন্ জিনিস খুব প্রিয় আপনার কাছে। যা-হোক, মিসেস ক্যুপার ছিলেন গোছানো স্বভাবের মহিলা, সব কিছুই গুছিয়ে রাখাটা তাঁর স্বভাব ছিল। আর তাই যেদিন তিনি পদত্যাগ করলেন গ্লোব থিয়েটারের বোর্ড থেকে, সেদিনই গিয়ে হাজির হলেন কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্সে।
আমি বললাম, ‘কারণ তাঁর জানা ছিল, তিনি মরতে চলেছেন। আজ নয়তো কাল আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলেন তিনি।’
‘একদম ঠিক।’
‘তবে সুইসাইড নোট অথবা ওই জাতের কোনো কিছু লিখে রেখে যাননি তিনি।’
‘একদিক দিয়ে চিন্তা করলে লিখে রেখে গেছেন। নিজের শেষকৃত্যের জন্য কী কী বেছে নিয়েছিলেন তিনি, দেখেছেন আপনি। প্রথমেই আসুন ‘এলিনর রিগবি’-র কথায়। অল দ্য লোনলি পিপল, হোয়ার ডু দে অল কাম ফ্রম? আমি বলবো, এটা আসলে সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন। তারপর আসুন সিলভিয়া প্লাথ নামের সেই কবির কথায়। আসুন সেই সুরকার জেরমিয়া ক্লার্কের কথায়। এঁদেরকে যে বেছে নিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, আমার মনে হয় না ঘটনাটা কাকতালীয়।’
‘আর সেই ধর্মসঙ্গীত?’
‘সাম থার্টি ফোর (Psalm 34)। ঈশ্বরভক্ত লোকদের অনেক কষ্ট হয়, কিন্তু প্রভু তাদেরকে সব কিছু থেকে রক্ষা করেন। যে বা যারা আত্মহত্যা করে, এই স্তব তাদের জন্য। যে-কোনো একজন ভিকারের সঙ্গে কথা বলে দেখুন, আপনি নিজেই জানতে পারবেন।
‘আমার মনে হয় আপনি কারও সঙ্গে কথা বলেছিলেন এই ব্যাপারে।’
‘অবশ্যই।’
‘ডায়ানা ক্যুপার যখন গিয়েছিলেন কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্সে, তখন প্রথমে কী দেখতে পেয়েছিলেন?’ জানতে চাইলাম আমি। ‘আপনি বলেছিলেন ব্যাপারটা নাকি গুরুত্বপূর্ণ।’
‘ঠিক। জানালার গোবরাটে একটা মার্বেল বুক ( marble book) রাখা ছিল, ওটাই দেখেছিলেন তিনি। এবং সেই বইয়ে বিশেষ একটা কথা লেখা ছিল।’
কথাটা মুখস্ত হয়ে গেছে আমার, তাই মনে করতে কোনো সমস্যা হলো নাঃ মানুষের জীবনে দুঃখ যখন আসে, একাকী কোনো গুপ্তচরের মতো আসে না, বরং বিশাল এক বাহিনীর মতো আসে।
‘হ্যামলেট নাটকে বলা আছে কথাটা। শেক্সপিয়ার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা নেই আমার… তবে এই কেসে মহান সেই সাহিত্যিকের ভূমিকা আছে অনেক। ডায়ানা ক্যুপারের বাসায় ফ্রিজের গায়ে শেক্সপিয়ারের উক্তি দেখেছি আমরা। তাঁর বেশিরভাগ মঞ্চনাটকের বিষয়বস্তু ছিল শেক্সপিয়ার। এমনকী ডিলে সেই ফোয়ারার গায়েও শেক্সপিয়ারের একটা উক্তি দেখেছি আমরা।
‘টু স্লিপ, বিড়বিড় করে বললাম আমি, ‘পারচ্যান্স টু ড্রিম। এটাও নেয়া হয়েছে হ্যামলেট থেকে।
‘হুঁ। সেই ফিউনারেল পার্লারে যখন গিয়েছিলেন ডায়ানা ক্যুপার, তখন তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল হ্যামলেট। কিন্তু ঘটনা ঘটে গেল অন্যরকম। তাঁকে চিনে ফেলল রবার্ট কর্নওয়ালিস। তিনি নিজেই মোটামুটি বিখ্যাত, তবে আমার ধারণা বড়াই করে ড্যামিয়েনের পরিচয়ও দিয়েছিলেন তিনি। ফলে মাথাটা বিগড়ে যায় কর্নওয়ালিসের। আসলে ওই লোকের মাথাটা সেই শুরু থেকেই বিগড়ানো ছিল।
‘আপনি জেনে গেছেন, ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে রাডায় ছিল কর্নওয়ালিস।’ চেয়ারে আরাম করে বসেছে হোথর্ন, যা বলছে তা উপভোগ করছে। ‘আমরা যেদিন প্রথমবার দেখা করতে গিয়েছিলাম কর্নওয়ালিসের সঙ্গে, সেদিন লোকটার অফিসে একটা অ্যাশট্রে দেখতে পেয়েছিলাম… মনে আছে? আন্ডারটেকার অভ দ্য ইয়ার হিসেবে ওটা উপহার দেয়া হয়েছিল রবার্ট ড্যানিয়েল কর্নওয়ালিসকে। নামের শেষের অংশটা বাদ দিয়ে, প্রথম আর দ্বিতীয় অংশটা এদিক-ওদিক করে নিজের জন্য নতুন একটা নাম বানিয়ে নেয় সে… ড্যান রবার্টস।’
‘হ্যাঁ… আমাকে বলেছিল লোকটা। সে চায়নি লোকে জেনে যাক, তার বাপ- দাদার সবাই গোরখোদকারির ব্যবসা করে।’
‘কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, গ্রেস লোভেল ভেবেছিল, আমান্ডা লেইয়ের নামটা বানোয়াট। যা-হোক, কর্নওয়ালিস যে অভিনেতা হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে, সেটা আমাদেরকে জানতে দিতে চায়নি সে। এমনকী রাডা’র সঙ্গে যে যোগাযোগ ছিল তার, সেটাও বুঝতে দিতে চায়নি আমাদেরকে।’
কিন্তু আমি সেই যোগসূত্রটা বের করে ফেলেছিলাম, ভাবলাম। কত ভালোই না হতো যদি সেই মুহূর্তে ফোন করতাম হোথর্নকে, সব কথা জানিয়ে দিতাম ওকে!
