‘ভালো খবরটা কী?
‘হারপার কলিন্সের এক সম্পাদক… সেলিনা ওয়াকার নাম… আপনার কাজ এত পছন্দ হয়েছে তাঁর যে, অপেক্ষা করতে রাজি আছেন। আমার সঙ্গে কোনো একটা চুক্তি করে ফেলবেন তিনি শীঘ্রই। পুলিশের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলাম। কর্নওয়ালিস যে-কাণ্ড ঘটিয়েছে, সেসবের কিছু-না-কিছু তো পত্রপত্রিকায় ছাপা হবেই। তবে আপনার নামটা যাতে ছাপা না হয়, সে- ব্যাপারে চেষ্টাচরিত্র করছি আমরা। আপনি যে এসবের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন, সেজন্য পুলিশ রীতিমতো বিরক্ত; কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হলো, আমরা চাই না আপনি কিছু লিখে শেষ করার আগেই সব ঘটনা জেনে ফেলুক সাধারণ লোকজন।’ উঠে দাঁড়াল হিলডা, চলে যাবে। ‘মিস্টার হোথর্নের সঙ্গেও কথা হয়েছে আমার। বইয়ের নাম ঠিক করা হয়েছে ‘হোথর্ন ইনভেস্টিগেটস’। বখরা আধাআধি।’
‘এক মিনিট!’ থতমত খেয়ে গেছি আমি। ‘ওই নামটা মোটেও পছন্দ না আমার। আর… যতদূর মনে পড়ে, আধাআধি বখরার ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু আপনিই আপত্তি করেছিলেন প্রথমে।’
কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হিলডা। মনে করিয়ে দেয়ার কায়দায় বলল, ‘আমি আপত্তি করলে কী হবে… রাজি তো হয়েছিলেন আপনি। তা ছাড়া মিস্টার হোথর্ন এই চুক্তির বাইরে অন্য কোনো কিছুতে রাজিও না।’
কেন যেন নার্ভাস দেখাচ্ছে হিলডাকে। ভাবলাম, ওর ব্যাপারে কিছু জানে নাকি হোথর্ন?
‘সেলিনার সঙ্গে আবার কথা বলার পর এসব নিয়ে না-হয় আলাপ করা যাবে,’ বলল হিলডা। ‘আপনার কিছু লাগবে?’
‘না! আগামীকাল নাগাদ বাসায় চলে যাবো আমি।’
‘ঠিক আছে, তখন তা হলে ফোন করবো আপনাকে।’
আমি আর কিছু বলার আগেই চলে গেল হিলডা।
সেদিন সন্ধ্যায় হাজির হলো আমার শেষ ভিটির। অনেকক্ষণ আগেই ভিযিটিং আওয়ার শেষ হয়ে গেছে… তবুও। শুনতে পেলাম, তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে একজন নার্স। আরও শুনতে পেলাম, কড়া গলায় নার্সকে বলছে লোকটা, ‘কোনো অসুবিধা নেই। আমি একজন পুলিশ অফিসার।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার বিছানার পায়ের কাছে হাজির হলো হোথর্ন। হাতে ধরে রেখেছে বাদামি কাগজের কুঁচকে যাওয়া একটা ব্যাগ।
‘হ্যালো, টনি,’ বলল সে।
‘হ্যালো, হোথর্ন।’ ব্যাপারটা অদ্ভুত, কিন্তু ওকে দেখে খুব খুশি লাগছে আমার। অনুভব করতে পারছি, এই মুহূর্তে ওর চেয়ে বেশি আর কারও সঙ্গে দেখা করতে চাই না আমি।
হিলডা যে-চেয়ারে বসে ছিল, সেই একই চেয়ারে বসে পড়ল সে। ‘কেমন লাগছে এখন?’
‘আগের চেয়ে অনেক ভালো।’
‘আপনার জন্য এটা নিয়ে এসেছি আমি,’ আমার হাতে ব্যাগটা ধরিয়ে দিল হোথৰ্ন।
খুললাম ওটা। বড় এক থোকা আঙুর।
‘অনেক ধন্যবাদ।’
‘ভাবলাম আপনার হয়তো আঙুর খেতে ভালো লাগবে।’
‘খুব খুশি হলাম। সহানুভূতিশীল একটা মন আছে আপনার আসলে।’ একপাশে সরিয়ে রাখলাম আঙুরগুলো। প্রাইভেট একটা রুম দেয়া হয়েছে আমাকে, কারণ পুলিশি তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে গেছি আমি। আলো কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এই ঘরে এখন শুধু আমি আর হোথর্ন। আর আছে আমার বিছানাটা এবং একটা চেয়ার। ‘হ্যামারস্মিথে… আপনি যে তখন হুট করেই হাজির হয়েছিলেন… খুব খুশি হয়েছি। আরেকটু হলে আমাকে খুন করে ফেলত রবার্ট কর্নওয়ালিস।’
‘লোকটা আসলে বদ্ধ পাগল। ওখানে একা যাওয়াটা মোটেও ঠিক হয়নি আপনার। যাওয়ার আগে আমাকে ফোন দেয়া উচিত ছিল।
‘আপনি কি জানতেন কর্নওয়ালিসই খুনি?’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘ওকে গ্রেপ্তার করতাম আমি। কিন্তু তার আগে নাইজেল ওয়েস্টের ব্যাপারটা মীমাংসা করা দরকার ছিল।’
‘কেমন আছেন তিনি?’
‘তাঁর বাড়ি যে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে তিনি হতাশ। এমনিতে ভালোই আছেন।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ‘আমি আসলে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। কর্নওয়ালিসই যে খুনি, সেটা কখন ধরতে পারলেন?’
‘এত কথা শোনার মতো সময় হবে আপনার? ঘুমাবেন না?’
‘আপনি আমাকে কিছু না-বলার আগপর্যন্ত ঘুমই হবে না আমার। এক মিনিট!’ আমার আইফোনটা বের করলাম। টান লাগল বুক আর কাঁধের পেশীতে, চোখমুখ কুঁচকে উঠল আমার। কিন্তু যত যা-ই হোক রেকর্ড করতে হবে হোথর্নের কথাগুলো। ‘একেবারে প্রথম থেকে শুরু করুন। কিছুই বাদ দেবেন না।’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘ঠিক আছে। আমি আপনাকে বলেছিলাম… আপনার মনে আছে কি না জানি না… জটিল একটা সমস্যা হাজির হয়েছে আমাদের সামনে। মিডোস আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ধরতে পারেননি ব্যাপারটা… তাঁরা ভেবে নিয়েছিলেন এই কেস খুব সহজ। একজন মহিলা নিজের শেষকৃত্যের আয়োজন করার জন্য গিয়ে হাজির হলেন জনৈক আন্ডারটেকারের অফিসে, আর তার ছ’ঘণ্টার মধ্যেই মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল ওই মহিলাকে… এই ব্যাপারটা মিডোস আর তার চ্যালাদের নজর এড়িয়ে গেছে পুরোপুরি। কিন্তু এই কেসে ওই ব্যাপারটাই ছিল আসল কথা। কারণ আপনি যদি আন্ডারটেকারের কাছে যাওয়ার ব্যাপারটা বাদ দেন, তা হলে এই কেসে অদ্ভুত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে কিছু থাকে না। সেক্ষেত্রে মিডোস যে-অবাস্তব চোরের পেছনে লেগেছিল, আমাকেও হয়তো সেই একই লোকের পেছনে লাগতে হতো। অথচ অদ্ভুত দুটো ঘটনা ছিল এই কেসে, এবং শুরুতে সে-ঘটনা দুটোর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারছিলাম না আমরা।
‘আমি তখন ভাবতে শুরু করি, কেন কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্সের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ডায়ানা ক্যুপার এবং একসময় বুঝতেও পারি সেটা। ট্রেনে কথাটা বলেছিলাম আপনাকে… আপনার খেয়াল আছে কি না জানি। ওই মহিলা তাঁর সারাটা জীবন বলতে গেলে নিঃসঙ্গই কাটিয়েছেন। তিনি মরার আগেও তাঁর স্বামীকে এত বেশি মিস করতেন যে, স্বামীর জন্য যে-মেমোরিয়াল গার্ডেন বানিয়েছিলেন, সেখানে যেতেন মাঝেমধ্যেই। কাউকে বিশ্বাস করতেন না তিনি। তাঁকে ঠকিয়েছে রেমন্ড কুন্স। তাঁর একমাত্র ছেলে চলে গেছে আমেরিকায়। বন্ধু বলতে এত কম মানুষ ছিল তাঁর জীবনে যে, তিনি খুন হওয়ার পর, তিনি যে মারা গেছেন সেটা জানতেই দুটো দিন লেগে গেছে। তা-ও কথাটা কে জেনেছে… তাঁর বাড়ির ক্লিনার। তাই এই কেসের শুরু থেকেই একটা চিন্তা খেলে যায় আমার মাথায়… করুণ একটা জীবন যাপন করছিলেন ডায়ানা ক্যুপার। আর তাই তিনি শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন… ‘
