যা-হোক, চ্যারিং ক্রস হাসপাতালের অ্যাক্সিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ইউনিটে জ্ঞান ফিরল আমার। ফুলহ্যাম প্যালেস রোড ধরে কিছুদূর এলেই এই হাসপাতাল।
কিছুটা বিব্রত বোধ করছি। এই কেসে এই নিয়ে দু’বার জ্ঞান হারাতে হয়েছে আমাকে। তবে ডাক্তাররা ইতোমধ্যে আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, জ্ঞান হারানোর এই ব্যাপারটা যতটা না আমার কাপুরুষত্বের জন্য, তার চেয়ে বেশি আমার উপর যে-ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছিল সেটার জন্য। ওই ওষুধ কোত্থেকে জোগাড় করেছিল কর্নওয়ালিস, তা আর জানা হবে না কখনও। তবে তার স্ত্রী বারবারা একজন ফার্মাসিস্ট, কাজেই ধারণা করে নেয়া যায় ওষুধটা ওই মহিলার মাধ্যমেই জোগাড় করে নিয়েছিল সে। পরে বারবারা আর তার তিন ছেলের কী হয়েছিল, তা আর জানতে পারিনি আমি। মানসিক বিকারগ্রস্ত এক লোকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বেচারী মহিলার, সেটা জানতে পারাটা খুব সুখকর কিছু না।
যা-হোক, অবযার্ভেশনে রাখা হয়েছে আমাকে, কিন্তু আমার অবস্থা যে খুব খারাপ, তা কিন্তু না। আমার বুক আর কাঁধের যে-দুই জায়গায় স্কালপেল ঢুকিয়ে দিয়েছিল কর্নওয়ালিস, এখনও প্রচণ্ড ব্যথা করছে জায়গা দুটো। কিন্তু ওই দুই জায়গায় কেবল দুটো করে সেলাই পড়েছে… তার বেশি কিছু না। আমি আসলে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম সাংঘাতিক। আমার উপর যে-ওষুধ প্রয়োগ করেছিল কর্নওয়ালিস, সেটার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে আট থেকে বারো ঘণ্টার মতো লেগে গেছে।
লোকে দেখা করতে আসছে আমার সঙ্গে। সবার আগে এসেছে আমার স্ত্রী। এবং আমাকে এই অবস্থায় দেখে মোটেও খুশি হয়নি সে। ‘কী করতে গিয়েছিলে তুমি সেখানে?’ দাবি জানানোর সুরে বলল। ‘আরেকটু হলে তো মারাই পড়তে!’
‘জানি।’
‘এসব নিয়ে আবার লেখালেখি শুরু করবে নাকি? আমি বুঝলাম না… তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল? ওই বিল্ডিঙে গিয়ে ঢুকলে কী কাজে? তুমি যদি আগে থেকেই জানতে লোকটা খুনি…’
‘ওই বিল্ডিং যে খালি ছিল ওই সময়ে, জানা ছিল না আমার। আর কর্নওয়ালিসই যে খুনি, সেটাও ভাবিনি। ভেবেছিলাম, সে যা বলছিল, তার চেয়ে বেশি জানা ছিল তার।’
কথাটা সত্যি। লিখ আমাকে যে-ফটোগ্রাফ দেখিয়েছিলেন, সেটাতে কর্নওয়ালিসকে চিনতে পেরেছিলাম আমি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আমি ততক্ষণে ধরেই নিয়েছিলাম, অ্যালান গডউইন যদি খুন না-করে থাকে ড্যামিয়েন আর তার মাকে, তা হলে গ্রেসের বাবা মার্টিন লোভেলই দায়ী ওই হত্যাকাণ্ড দুটোর জন্য। কারণ বিশেষ ওই ফটোগ্রাফে তিনিও ছিলেন… ফ্রেমের কোনায় ফুল-সহ যাঁকে দেখেছিলাম আমি। ড্যামিয়েন ক্যুপারের মৃত্যু কামনা করার যথোপযুক্ত কারণ ছিল তাঁর। মেয়েকে রক্ষা করতে এবং তাকে তার ক্যারিয়ারটা নতুনভাবে শুরু করতে দিতে প্রয়োজনে যে-কোনো কিছু করে ফেলতে পারতেন তিনি। নিজের এই ধারণার ব্যাপারে আসলে এতটাই নিশ্চিত ছিলাম আমি যে, আরেকটু হলে মরতে বসেছিলাম।
‘তুমি যে এ-বই লিখছ, আমাকে বলোনি কেন?’ জিজ্ঞেস করল আমার স্ত্রী। ‘তুমি তো সাধারণত কোনো কিছু গোপন করো না আমার কাছ থেকে!
‘জানি। আমি দুঃখিত।’ নিজেকে হতভাগা মনে হচ্ছে আমার। ‘জানতাম সব শুনলে তুমি বলবে, আমার আইডিয়াটা মোটেও ভালো কিছু ছিল না।’
‘নিজেকে যে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছ, সেটাই ভালো লাগেনি আমার। দেখ তোমার এই কাজ তোমাকে কোথায় এনে হাজির করেছে… ইন্টেনসিভ কেয়ারে।’
‘না… তেমন কিছু না… মাত্র চারটা সেলাই পড়েছে আমার শরীরে।’
‘তোমার কপালটা আসলে খুব ভালো,’ মোবাইল ফোন বেজে উঠল আমার স্ত্রীর। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। ‘একটা জিনিস নিয়ে এসেছি তোমার জন্য।’
একটা বই নিয়ে এসেছে সে… ওটা নামিয়ে রাখল বিছানায়। রেবেকা ওয়েস্টের দ্য মিনিং অভ ট্রিন। বইটা পড়ছিলাম আমি।
‘নতুন সিরিযটার জন্য তোমার কাছ থেকে কিছু শুনবার অপেক্ষায় আছে আইটিভি,’ আমাকে মনে করিয়ে দিল আমার স্ত্রী।
‘হাতের কাজটা শেষ করেই ওটা শুরু করবো আমি,’ কথা দিলাম।
আমার দুই ছেলে আমাকে চমৎকার দুটো টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছে, কিন্তু দেখা করতে আসেনি হাসপাতালে। গত বছর গ্রীসে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলাম আমি, তখনও এই কাজ করেছিল ওরা। আসলে আমাকে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখার ব্যাপারে ওরা বোধহয় একটু খুঁতখুঁতে।
আমার স্ত্রী চলে যাওয়ার পর ঝড়ের বেগে ভিতরে ঢুকল আমার এজেন্ট হিলডা স্টার্ক। ধপাস করে বসে পড়ল একটা চেয়ারে, আপাদমস্তক দেখছে আমাকে। ‘কেমন আছেন?’
‘ঠিক আছি। আমাকে শুধু পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্য রাখা হয়েছে এখানে।’
সন্দেহ দেখা দিল হিলডার চেহারায়।
‘ওষুধ খাইয়ে অবশ করে দেয়া হয়েছিল আমাকে,’ বুঝিয়ে বললাম।
‘রবার্ট কর্নওয়ালিস হামলা চালিয়েছিল আপনার উপর?’
‘হ্যাঁ। তারপর আত্মহত্যা করেছে সে।’
মাথা ঝাঁকাল হিলডা। ‘সেক্ষেত্রে বলতেই হয়, ভয়ঙ্কর একটা পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে আপনার বইয়ে। যা-হোক, ভালো-খারাপ দু’রকম খবরই আছে আপনার জন্য। ওরিয়ন বুকসের সঙ্গে কথা বলেছিলাম আপনার এ-বইয়ের ব্যাপারে। আগ্রহ দেখায়নি তারা। বরং তারা চায়, তিনটা বই লিখে দেয়ার ব্যাপারে যে-চুক্তি করেছিলেন আপনি তাদের সঙ্গে, সেগুলো লিখে শেষ করুন।
