অপেক্ষা করছি আমি… হয়তো আরও কিছু বলবে কর্নওয়ালিস। অনেক কিছুই বুঝিয়ে বলেছে সে, এবং যতক্ষণ কথা বলেছে ততক্ষণ আঘাত করেনি আমাকে। এখন থেমে গেছে হঠাৎ করেই… আমরা দু’জনই বুঝতে পারছি আর কিছু বলার নেই তার।
আমার হাত-পায়ে কোনো সাড়া নেই এখনও। কী ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে আমার উপর, ভাবলাম। পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো হয়ে গেছি, কিন্তু অনুভূতিহীন হয়ে যাইনি। বুক আর কাঁধের ব্যথাটা ছড়িয়ে পড়ছে, রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে আমার শার্ট।
কোনোরকমে বললাম, ‘এখন আমাকে নিয়ে কী করবেন?’
ভোঁতা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল কর্নওয়ালিস, কিছু বলল না।
‘এই ব্যাপারে তো কিছুই করার নেই আমার,’ বলে চললাম। ‘আমি একজন লেখক মাত্র। এই কেসের সঙ্গে জড়ানোর কোনো ইচ্ছাই ছিল না, তারপরও জড়িয়ে গেছি, কারণ হোথর্ন বলেছিল ওকে নিয়ে একটা বই লিখতে। আপনি যদি আমাকে খুন করে ফেলেন, সে বুঝে যাবে কাজটা কার। আমার ধারণা ইতোমধ্যেই সব জেনে গেছে সে।’ কেন যেন মনে হচ্ছে, যত বেশি কথা বলতে পারবো কর্নওয়ালিসের সঙ্গে, আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তত বাড়বে। ‘দেখুন, আমার স্ত্রী আছে, দুটো ছেলে আছে। ড্যামিয়েন ক্যুপারকে কেন খুন করেছেন আপনি, বুঝতে পারছি। লোকটা আসলেই ধান্দাবাজ ছিল… আমিও তা-ই ভেবেছিলাম। কিন্তু আমাকে যদি খুন করে ফেলেন, তা হলে সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে যাবে সব কিছু। আপনার যে-ক্ষতি হয়েছে, সে-ব্যাপারে আসলে কিছুই করার ছিল না আমার।’
‘অবশ্যই আপনাকে খুন করবো আমি!’
কথাটা শোনামাত্র, মনে হলো, আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন ঢুকে গেলনাড়িভুঁড়ির ভিতরে। ছোঁ মেরে তৃতীয় আরেকটা স্কালপেল তুলে নিল কর্নওয়ালিস টেবিলের উপর থেকে। কেউ না-বলে দিলেও জানি, এই অস্ত্রটাই ব্যবহার করতে চলেছে সে আমাকে-খুন-করার-কাজে। উন্মত্ত হয়ে উঠেছে কিছুটা, কেমন কালচে-নীল বর্ণ ধারণ করেছে ওর চেহারা, চঞ্চল দৃষ্টিতে বার বার তাকাচ্ছে এদিকে-সেদিকে।
‘কী ভেবেছিলেন… এত কথা বলার পরও ছেড়ে দেবো আপনাকে? প্রাণে মারবো না? দোষ আপনারও আছে!’ স্কালপেলটা চালাল কর্নওয়ালিস বাতাসে। ‘রাডা’র ব্যাপারে কিছু জানা ছিল না কারও… ‘
‘আমি অনেককেই বলেছি কথাটা!’
‘আপনার কথা বিশ্বাস করি না আমি। আর… এখন এসবে কিছু আসে-যায়ও না। বাচ্চাদের জন্য যেসব ফালতু বই লেখেন আপনি, সেগুলো নিয়েই থাকা উচিত ছিল আপনার… এসব ব্যাপারে নাক গলানো উচিত হয়নি।
আমার দিকে এগিয়ে আসছে কর্নওয়ালিস। মেপে মেপে পা ফেলছে যেন। ‘আমি আসলেই দুঃখিত। কিন্তু নিজের খারাপি নিজেই ডেকে এনেছেন আপনি।’
নতুন কোনো খদ্দেরের দিকে যে-প্রফেশনাল দৃষ্টিতে তাকায় একজন আন্ডারটেকার, শেষ-মুহূর্তটাতে আমার দিকে সে-দৃষ্টিতে তাকাল কর্নওয়ালিস। স্কালপেলটা হাতে ধরে রেখেছে এখনও, আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে সেটা। নজর বোলাচ্ছে আমার সারা শরীরের উপর… কোথায় আঘাত করা যায় ভাবছে বোধহয়।
ঠিক তখনই যেন বিস্ফোরিত হলো একদিকের একটা দরজা… ওটা আগে খেয়ালই করিনি আমি। চোখের কোনা দিয়ে দেখতে পেলাম, ছুটে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল কেউ একজন। ঘাড়টা ঘুরাতে সক্ষম হলাম।
হোথর্ন।
নিজের রেইনকোটটা সামনের দিকে বাড়িয়ে ধরে রেখেছে সে… যেন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে ওটা। এখানে এই সময়ে কীভাবে হাজির হলো, সে- ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই আমার। কিন্তু এত খুশি হলাম ওকে দেখে যে, অত খুশি আর হইনি কখনও।
‘ওটা নামিয়ে রাখুন,’ বলতে শুনলাম ওকে। ‘খেলা শেষ আপনার।‘
আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কর্নওয়ালিস… বড়জোর দু’মিটার দূরে। হোথর্নের দিকে তাকিয়ে ছিল, দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকাল আমার দিকে। কী করতে যাচ্ছে লোকটা, ভাবলাম। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল হঠাৎ, এবং সেটাও টের পেলাম আমি। নামিয়ে রাখল না স্কালপেলটা, বরং ওটা নিয়ে গেল নিজের গলার কাছে। অনুভূমিকভাবে একবার মাত্র পোঁচ দিল গলায়।
ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে লোকটার গলা থেকে। তার গলা আর বুক বেয়ে নামছে রক্ত… রক্তের ছোটখাটো একটা পুকুর তৈরি হচ্ছে তার পায়ের কাছে। এখনও দাঁড়িয়ে আছে সে; এমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে যে, আজকের এই দিনটা দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে আমার জন্য। আনন্দিত দেখাচ্ছে তাকে… বলা ভালো, বিজয়ের উল্লাস দেখতে পাচ্ছি যেন তার চেহারায়। তারপর একসময় ধপাস করে পড়ে গেল। মাংসপেশীর অনৈচ্ছিক আক্ষেপে সমানে ঝাঁকি খাচ্ছে শরীরটা। আরও রক্ত ছিটকে-ছিটকে পড়ছে তার আশপাশে।
আর কিছু দেখতে পেলাম না। ছুটে এসে হুইলচেয়ারটা আঁকড়ে ধরল হোথর্ন, ঘুরিয়ে দিল আমাকে। ঠিক তখনই শুনতে পেলাম সাইরেনের স্বস্তিদায়ক প্যাঁ-পোঁ আওয়াজ। বুঝতে পারলাম, পুলিশের গাড়ি হাজির হয়েছে বাইরে।
‘আপনি এখানে কী করছেন?’
হাঁটু গেড়ে আমার পাশে বসে পড়ল হোথর্ন, বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে স্কালপেল দুটোর দিকে। হয়তো ভাবছে, কেন উঠে দাঁড়াতে পারছি না আমি।
ওর প্রতি ওই মুহূর্তে যে-ভালোবাসা জন্ম নিল আমার মনে, জোর গলায় বলতে পারি, শার্লক হোমসের প্রতি ওয়াটসনের, অথবা পোয়ারোর প্রতি হেস্টিংসের সে- রকম কোনো আবেগ জন্মায়নি কখনও।
জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে ভাবলাম, আমি কতই না সৌভাগ্যবান… শেষমুহূর্তে পাশে পেয়েছি হোথর্নকে।
২৩. ভিযিটিং আওয়ার্স
পুরো ঘটনা পর্যালোচনা করে যদি বলি… প্রথম পুরুষে এই উপন্যাস লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বলে এখন খারাপই লাগছে আমার। কারণ প্রথম পুরুষে কোনো কিছু লেখার মানেই হলো, কাহিনির বর্ণনাকারী শেষপর্যন্ত জীবিত থাকবে… সে-ই যদি মারা যায়, তা হলে বাকি কথা বলবে কে?
