‘খারাপ ঘটনা ঘটতে শুরু করল একটার পর একটা… আমাকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল আমার এজেন্ট। কারণ একটাই… তখন মনের দুঃখে দেদারসে মদ গিলতে শুরু করে দিয়েছিলাম। তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম একটা টাকাও নেই আমার পকেটে। উপলব্ধি করলাম, আমি আর ড্যান রবার্টস না। উপলব্ধি করলাম, আবার সেই রবার্ট কর্নওয়ালিস হয়ে গেছি। তারপর আর কী… কালো রঙের একটা স্যুট পরে আমার কাযিন আইরিনের সঙ্গে যোগ দিলাম দক্ষিণ কেনসিংটনে… কাহিনিও শেষ হয়ে গেল আমার। খেল খতম।’
থামল কর্নওয়ালিস। শিউরে উঠলাম আমি। ভাবলাম, আবারও বুঝি একটা স্কালপেল তুলে নেবে লোকটা। আমার মনে হচ্ছে, আগের দুই ক্ষতস্থানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে কেউ। কিন্তু কর্নওয়ালিস আসলে এত নিমগ্ন হয়ে আছে নিজের কাহিনিতে যে, আমাকে আর আঘাত করল না।
‘এই কাজে আমি আসলে খুবই ভালো,’ বলছে শয়তানটা। ‘বলতে পারেন, এই কাজ মিশে আছে আমার রক্তে। কিন্তু এ-কাজে যতক্ষণ ব্যয় করি, তার প্রতিটা মিনিট ঘৃণা করি। যা-হোক, আমার স্ত্রী বারবারার সঙ্গে কোথায় পরিচিত হয়েছিলাম, জানেন? ওর এক চাচার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে। ব্যাপারটা রোমান্টিক, না? তারপর বিয়ে করে ফেললাম আমরা। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, বারবারাকে কখনোই সেভাবে ভালোবাসিনি আমি। বিয়ে করতে হতো, তাই করেছি আর কী। তারপর দেখতে দেখতে তিন তিনটা ছেলে হলো আমাদের। ভালো একজন বাবা হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, বারবারা আর আমাদের তিন ছেলে আমার কাছে বিদেশি কোনো বস্তুর মতোই রয়ে গেছে। ওদেরকে আসলে কখনোই চাইনি আমি। এসব কোনো কিছুই চাইনি আমি কখনও।’ একটুখানি হাসল। ‘অ্যান্ড্রিউ যখন বলল অভিনেতা হতে চায় সে, মজা পেয়েছিলাম। আচ্ছা, বলুন তো, ওই চিন্তা ওর মাথায় এল কোত্থেকে? যেখান থেকেই আসুক, ওকে শেষপর্যন্ত অভিনেতা হতে দেবো না আমি। ওই নরক থেকে ওকে রক্ষা করার চেষ্টা করে যাবো শেষপর্যন্ত।
‘যা-হোক, একদিন খোঁজ পেলাম আমান্ডার। একদিন… যখন আর সহ্য করতে পারছিলাম না আমার ব্যর্থতা… খুঁজে বের করলাম ওকে, আমার সঙ্গে ডিনার করার আমন্ত্রণ জানালাম। আর তারপর… সময় ও সুযোগ বুঝে খুন করে ফেললাম ওকে। ওকেই প্রথম হত্যা করলাম আমি। এবং স্বীকার করে নিচ্ছি, কাজটা করে যারপরনাই তৃপ্তি পেয়েছি। আমার কথা শুনে আমাকে হয়তো পাগল বলে মনে হচ্ছে আপনার। কিন্তু আমার কত বড় ক্ষতি করে দিয়েছে ওই মেয়ে আর ড্যামিয়েন, সেটা হয়তো কোনো দিনও বুঝতে পারবেন না আপনি। আমার ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়ে পুরস্কারের পর পুরস্কার জিতে নিয়েছে ধান্দাবাজ লোকটা, বিখ্যাত থেকে আরও বিখ্যাত হয়েছে। এমনকী সিনেমা করতে চলে গেছে সুদূর আমেরিকায়। কিন্তু তার মানে এই না, আমার প্রতিশোধস্পৃহা শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু আমার নাগালের বাইরে ছিল সে… এ-ই যা। তখন ভাবলাম, কী করে মুঠোর ভিতরে আনা যায় ওকে?
‘কাজেই… যেদিন ওই শয়তানটার মা স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে হেঁটে এসে ঢুকল আমার ফিউনারেল পার্লারে, সেদিন কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম… নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটা মাকড়সা, আর আমার জালে আটকা পড়েছে কোনো মাছি। দেখামাত্র চিনতে পেরেছিলাম ওই মহিলাকে। বেশ কয়েকবার রাডায় গিয়েছিল সে। হ্যামলেট নাটকটাও দেখতে গিয়েছিল। এমনকী আমার অভিনয় দেখে আমার প্রশংসাও করেছিল। যা-হোক, সেদিন আমার সামনেই বসে ছিল ওই মহিলা… নিজের শেষকৃত্যের পরিকল্পনা করছিল। আমাকে চিনতে পারেনি… পারবেই বা কেন? নাটকের ওই স্কুল ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর অনেক বদলে গেছি আমি। চুল পাতলা হয়ে গেছে আমার, দাড়িও রেখেছি। চশমা ব্যবহার করি নিয়মিত। সবচেয়ে বড় কথা, একজন আন্ডারটেকারের দিকে ক’জনই বা ভালোমতো তাকায়? মরা মানুষদের নিয়ে যারা ঘাঁটাঘাঁটি করে তারা আসলে বাস করে ছায়ায়… আমরা যে আসলেই মানুষ, আমরাও যে কোনো-কাজ করি, সেটারই তো স্বীকৃতি দিতে চায় না কেউ! যা-হোক, আমার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল ড্যামিয়েনের মা, উইলো কফিন বাছাই করে নিল নিজের জন্য, কোন মিউযিকটা বাজানো হবে তা-ও ঠিক করে দিল। একটাবারের জন্যও বুঝতে পারল না, স্তম্ভিত হয়ে বসে ছিলাম আমি সারাটা সময়।
‘তখন দারুণ একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়… যদি খুন করতে পারি ড্যামিয়েনের মাকে, তা হলে ওই মহিলার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অবশ্যই আসবে শয়তানটা, এবং তখন তাকেও শেষ করে দিতে পারবো। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে এই চিন্তা খেলে গেল আমার মগজে, এবং শেষপর্যন্ত সেটাই করেছি। ড্যামিয়েনের মা তার ঠিকানাটা দিল আমাকে, সময়-সুযোগমতো গিয়ে হাজির হলাম সেখানে, শ্বাসরোধ করে হত্যা করলাম তাকে। তারপর… সপ্তাহ দু’-এক বাদে, উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে শেষ করে দিলাম ড্যামিয়েনকে। নিজের সেই শৌখিন ফ্ল্যাটেই মরল সে আমার হাতে। ওকে খুন করতে যে কী মজা লেগেছে আমার, কল্পনাও করতে পারবেন না। খেয়াল রেখেছিলাম, ওর মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যাতে দেখা না-হয় ওর সঙ্গে। এবং সেজন্য সব কিছু বুঝিয়েও দিয়েছিলাম আইরিনকে।
‘ড্যামিয়েনকে খুন করার আগে নিজের পরিচয়টা যখন জানালাম ওকে, তখন ওর চেহারাটা যদি দেখতেন একবার! আমার কথা শুনেই বুঝে গিয়েছিল, আমি খুন করতে চলেছি ওকে। এমনকী আমি ছুরিটা বের করার আগেই বুঝে গিয়েছিল ব্যাপারটা। এবং কেন খুন করতে গিয়েছিলাম ওকে, বুঝতে পেরেছিল সেটাও। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম আরও কষ্ট দিয়ে ওকে মারতে।’
