‘আমরা যখন থার্ড ইয়ারে,’ বলছে কর্নওয়ালিস, ‘ঝামেলা শুরু হয়ে গেল তখন। সব কিছু খুব প্রতিযোগিতামূলক একটা অবস্থায় এসে পৌঁছেছে ততদিনে। আমরা সবাই এমন ভান করছি, যেন আমরা একজন আরেকজনের খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু যখনই কোনো নাটকের প্রদর্শনীর সময় হতো, একেকজনের মুখোশটা খুলে যেত তখনই। একটা কথা বলি, বিশ্বাস করবেন কি না জানি না… সবচেয়ে ভালো বন্ধুটাকে ফায়ার এস্কেপের সিঁড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলে একজন এজেন্ট পাওয়া যাবে, এ-ব্যাপারে যদি নিশ্চয়তা পেতাম আমরা, তা হলে হয়তো তা-ই করতাম সবাই। সে-সময় ড্যামিয়েনের ভূমিকা কী ছিল, জানেন? সেরা পুরস্কারটা যেভাবেই হোক সব সময় লুফে নিত নিজের জন্য। এবং শেষপর্যন্ত কী করল সে, জানেন? অনুমান করতে পারেন?’
থামল কর্নওয়ালিস, কিন্তু টু শব্দটা করারও সাহস হচ্ছে না আমার। আমার দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা, হঠাৎ ছোঁ মেরে তুলে নিল দ্বিতীয় একটা স্কালপেল, সেটা ধাঁ করে বসিয়ে দিল আমার একদিকের কাঁধে।
ব্যথায় চিৎকার করে উঠলাম।
স্কালপেলটা বের করে নিল না কর্নওয়ালিস। চিৎকার করে বলল, ‘অনুমান করে বলুন শেষপর্যন্ত কী করেছিল ড্যামিয়েন!’
‘আপনাকে ঠকিয়েছিল!’ কীভাবে জানি না, কিন্তু যেভাবেই হোক উচ্চারণ করতে পারলাম কথাগুলো। কী বলেছি তা ঠিকমতো জানি না নিজেই। কিছু-একটা বলার দরকার ছিল, তাই বলেছি।
‘ঠকানোর চেয়েও বেশি কিছু করেছিল সে। হ্যামলেট নাটকে যখন হ্যামলেটের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য প্রস্তাব করা হলো আমার নাম, রীতিমতো মারমুখী হয়ে উঠল সে। ধরেই নিয়েছিল ওই চরিত্রে অভিনয় করার জন্য একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি সে-ই। অভিনয়ে কতখানি দক্ষ সে, আসলে সেটা দেখিয়ে দিতে চাইছিল সবাইকে। কিন্তু আমিই বা এত সহজে ছেড়ে দেবো কেন? কারণ ওই চরিত্র ছিল আমার। আমি কী করতে পারি, সারা পৃথিবীকে তা দেখিয়ে দেয়ার জন্য ওই নাটকের ওই চরিত্রই ছিল আমার শেষ সুযোগ। ড্যামিয়েন তখন ওর সেই কুত্তী গার্লফ্রেন্ডটাকে সঙ্গে নিয়ে জঘন্য এক চাল চালল আমার বিরুদ্ধে। ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে অসুস্থ বানিয়ে দিল তারা… যাতে আমি গিয়ে যোগ দিতে না-পারি রিহার্সেলে, এবং যাতে বিশেষ ওই চরিত্র হাতছাড়া হয়ে যায় আমার।’
কর্নওয়ালিস এসব কী বলছে, কেনই বা বলছে… কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু বুঝতে না-পারলেও পরোয়া করছি না। ষাঁড়ের লড়াইয়ে আহত ষাঁড় যেভাবে রিঙের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকে, সেভাবে বসে আছি আমি। দুটো স্কালপেল গেঁথে আছে আমার শরীরে। যত সময় যাচ্ছে, ক্ষতস্থান দুটোর ব্যথা তত বাড়ছে। আমি নিশ্চিত, আর কিছুক্ষণ পর খুন করে ফেলা হবে আমাকে। কর্নওয়ালিস অপেক্ষা করছে, কখন মুখ খুলবো আমি… কখন মরণআঘাতটা হানবে সে।
আমি চুপ করে আছি দেখে লোকটা আরও রেগে যাবে ভেবে বিড়বিড় করে কোনো রকমে বললাম, ‘আমান্ডা লেই…’
‘আমান্ডা লেই। ঠিকই বলেছেন। আমাকে পাকড়াও করার জন্য ওই মেয়েকে ব্যবহার করেছিল ড্যামিয়েন। কিন্তু শেষপর্যন্ত আমিই পাকড়াও করেছি মেয়েটাকে। এবং তার কাজের জন্য মূল্য দিতে বাধ্য করেছি।’ মুখ টিপে হাসল কর্নওয়ালিস
আমার মনে হচ্ছে, মাথা খারাপ হয়ে গেছে লোকটার। আরও মনে হচ্ছে, এত বড় কোনো পাগল কোনোকালে দেখিনি।
‘তিলে তিলে কষ্ট দিয়েছি আমি ওই মেয়েকে, শেষপর্যন্ত গায়েব হয়ে গেছে সে। কোথায় গেছে হারামজাদীটা, জানেন? আপনি চাইলে বলতে পারি… কিন্তু কুত্তীটাকে যদি খুঁজে বের করতে চান, তা হলে একটা না দুটো না… সাত সাতটা কবর খুঁড়তে হবে আপনাকে।’
‘ড্যামিয়েনকে খুন করেছেন আপনি,’ কোনো রকমে বললাম, নিজের কণ্ঠ অপরিচিত ঠেকল নিজের কাছেই। হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে ধুকপুক করছে যে, মনে হচ্ছে বিস্ফোরিত হবে কিছুক্ষণের মধ্যে।
‘হ্যাঁ। লোকে তখন বলেছিল, হ্যামলেট চরিত্রটার জন্য আমিই উপযুক্ত। হ্যামলেট হওয়া উচিত ছিল আমারই। হতে পারিনি, কারণ তখন আমি অসুস্থ ছিলাম, ফলে অভিনয় করতে হলো অন্য একটা চরিত্রে… যে-চরিত্র মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিল সব মিলিয়ে মাত্র ছ’বার। বেশিরভাগ সময় মঞ্চের বাইরেই থাকতে হয়েছিল আমাকে। বেশি হলে মাত্র ষাটটা লাইন আউড়াতে পেরেছি আমি দর্শকদের সামনে। ফলে কী হলো? একজন এজেন্টও জুটল না আমার কপালে। রাডা ছেড়ে চলে আসতে হলো আমাকে, অথচ যে-ক্যারিয়ারের জন্য স্বপ্ন দেখেছিলাম, যে- ক্যারিয়ারের জন্য এত চেষ্টা করলাম, সেটাও অর্জন করতে পারলাম না। তারপরও চেষ্টা করে গেছি। গিয়ে যোগ দিয়েছি অভিনয়ের বিভিন্ন ক্লাসে। জায়গায় জায়গায় অডিশন দিয়েছি। কিন্তু বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি।
‘অবশ্য… দু’-এক জায়গায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু সেসব শেষপর্যন্ত কোনো উপকারেই আসেনি আমার। জানেন, পাইরেটস অভ দ্য ক্যারিবিয়ানের জন্য তিন-তিনবার ফোন করা হয়েছিল আমাকে, তারপর ওই চরিত্র দিয়ে দেয়া হয়েছে অন্য কাউকে। বয়সও ক্রমেই বেড়ে চলেছিল আমার, ফুরিয়ে আসছিল পকেটের টাকাও। মাসের পর মাস গড়িয়ে গড়িয়ে কেটে যাচ্ছিল বছরের পর বছর। টের পাচ্ছিলাম, কিছু-একটা ভেঙে পড়েছে আমার ভিতরে। টের পাচ্ছিলাম, সেই কিছু-একটা ভেঙে পড়ার জন্য আমান্ডা আর ড্যামিয়েনই দায়ী। জানেন কি না জানি না… অভিনেতাদের জন্য বেকারত্ব কিন্তু ক্যান্সারের মতো। এই অসুখ নিয়ে যতদিন বসে থাকবেন আপনি, আপনার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তত কমে যাবে। ওদিকে আমার পরিবারও যেন সাইডলাইনে বসে নজর রাখছিল আমার উপর… কবে ব্যর্থ হবো আমি, কবে আবার ফিরে যাবো তাদের সেই গোরখোদকারির ব্যবসায়। তারা হয়তো মনেপ্রাণে আশাও করছিল ব্যর্থ হই আমি।
