‘তারপরও… বলতে মজাই লাগছে এখন… একটা স্বপ্ন ছিল আমার। একবার স্কুলের একটা নাটকে একটা চরিত্রে অভিনয় করতে দেয়া হলো আমাকে। তেমন বড় কোনো চরিত্র না… দ্য টেমিং অভ দ্য শ্রু নাটকের হর্টেনশিয়ো। কিন্তু কথা হচ্ছে, চরিত্রটা দারুণ ভালো লেগে গিয়েছিল আমার। শেক্সপিয়ার বেশ ভালো লাগত তখন। কারণ তাঁর ভাষা ছিল সমৃদ্ধ, যেভাবে তিনি তৈরি করতেন তাঁর নাটকের জগৎটা সেটা ছিল এককথায় দারুণ। কস্টিউম পরে, নিজের উপর লাইটের আলো নিয়ে যখন মঞ্চে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, খুব উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। হতে পারে, তখন হয়তো বুঝতে পেরেছিলাম, আমি অন্য কেউ… সেই আন্ডারটেকার পরিবারের সন্তান না। যা-হোক, আমার বয়স যখন পনেরো, তখন একদিন উপলব্ধি করতে পারলাম, অভিনেতা হতে চাই। সেই থেকে চিন্তাটা ধীরে ধীরে যেন গ্রাস করে নিল আমাকে। ভাবতে লাগলাম, শুধু অভিনেতা হলে চলবে না আমার, বিখ্যাত কোনো অভিনেতা হতে হবে। রবার্ট কর্নওয়ালিস হওয়া চলবে না কিছুতেই। হতে হবে অন্য কেউ একজন। উপলব্ধি করতে পারলাম, সেই ‘অন্য কেউ একজনের’ জন্যই যেন জন্ম হয়েছে আমার।
‘রাডা-তে অডিশন দিতে চাই, কথাটা যখন শুনেছিলেন আমার বাবা-মা, নাখোশ হয়েছিলেন। কিন্তু একটা কথা কী জানেন… আমাকে সেখানে যেতে দিয়েছিলেন তাঁরা, কারণ ধরেই নিয়েছিলেন ভাগ্যে কোনো সুযোগ জুটবে না আমার শেষপর্যন্ত। গোপনে গোপনে হয়তো হেসেছিলেন আমাকে নিয়ে। যা-হোক, অ্যাপ্লাই করলাম রাডা-তে। এবং বাবা-মাকে না-জানিয়ে আরও অ্যাপ্লাই করেছিলাম ওয়েবার ডগলাস এবং দ্য সেন্ট্রাল স্কুল অভ ড্রামা-তে। এমনকী আবেদন করেছিলাম ব্রিস্টলের ওল্ড ভিক-এও। বাড়িয়ে বলছি না, আমি আসলেই ভালো অভিনেতা ছিলাম। যখন অভিনয় করতাম, চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলতে পারতাম।
‘সুযোগ পেয়ে গেলাম রাডা-য়। যে-মুহূর্তে অডিশন দিয়েছিলাম, তখনই জানতাম, আমাকে ফেরাতে পারবে না ওরা।
কিছু-একটা বললাম আমি। কিন্তু অসংলগ্ন প্রলাপ ছাড়া আর কিছু হলো না সেটা, কারণ যে-ওষুধ প্রয়োগ করেছে কর্নওয়ালিস, তা কাজ করতে শুরু করেছে আমার ভোকাল কর্ডের উপর, ফলে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হয় আমাকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে মিনতি জানিয়েছিলাম শয়তানটার কাছে, কিন্তু তাকে ও-রকম কিছু বলা আর সময়ের অপচয় করা সমান কথা।
ভ্রূ কোঁচকাল কর্নওয়ালিস। এগিয়ে গেল টেবিলটার কাছে, একটা স্কালপেল তুলে নিল। একদৃষ্টিতে দেখছি শয়তানটাকে। আমার দিকে এগিয়ে এল সে। দেখতে পেলাম, রূপার ব্লেডের উপর প্রতিফলিত হয়ে চকচক করে উঠল নিয়ন লাইটের আলো। তারপর, একটুও দ্বিধা না-করে, স্কালপেলটা আবার বুকের ভিতরে ঢুকিয়ে দিল কর্নওয়ালিস।
গভীর বিস্ময়ে এখনও তাকিয়ে আছি আমি। দেখছি, স্কালপেলটার হাতল বেরিয়ে আছে আমার বুক থেকে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, খুব বেশি ব্যথা পাইনি। খুব বেশি রক্তও বের হচ্ছে না। আমি শুধু বিশ্বাস করতে পারছি না, এ-রকম একটা কাজ করে ফেলেছে কর্নওয়ালিস।
‘আপনাকে বলেছিলাম আপনার কাছ থেকে একটা কথাও শুনতে চাই না আমি,’ ব্যাখ্যা করার কায়দায় বলল কর্নওয়ালিস। অভিযোগ জানানোর কায়দায় আবারও চড়ে গেছে তার কণ্ঠ। ‘আমাকে শোনানোর মতো কিছুই নেই আপনার। আমি কিছু শুনতে চাইও না। কাজেই চুপ থাকুন! বুঝতে পেরেছেন? চুপ থাকুন!’
নিজেকে শান্ত করল শয়তানটা। তারপর এমন ভঙ্গিতে আবার কথা বলতে লাগল, যেন কিছুই হয়নি।
‘যেদিন রাডা-য় ঢুকেছি, আমি যা, তার জন্য আমাকে গ্রহণ করে নেয়া হয়েছিল সেদিন থেকেই। আমি যা দিতে পারবো, সেটার জন্যও সাদরে বরণ করে নেয়া হয়েছিল আমাকে। সে-সময় আমি নিজের আসল নাম, মানে রবার্ট কর্নওয়ালিস ব্যবহার করতাম না। নিজের পরিবারের ব্যাপারেও কথা বলতাম না কারও সঙ্গে। ড্যান রবার্টস নামে নিজের পরিচয় দিতাম। অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামাত না কেউ। যত যা-ই হোক, ওই নাম ছিল আমার স্টেজ-নেম… কাজেই সেটা ঠিক নাকি বেঠিক তাতে তেমন কিছু যায় আসে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমি আর তখন কোনো ‘ফিউনারেল বয়’ ছিলাম না। বরং আমি ছিলাম অ্যান্টনি হপকিন্স বা কেনেথ ব্রানাহ। অথবা ডেরেক জ্যাকোবি। আয়ান হোম। সেসব নাম তখন সুপরিচিত। ভাবতাম, আমিও একদিন ও-রকম কেউ হবো। যতবার ওই বিল্ডিঙের ভিতরে ঢুকতাম, ততবার মনে হতো, নিজেকে যেন খুঁজে পেয়েছি। একটা কথা বলে রাখি… ওই তিনটা বছর ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের সময়। মাত্র ওই তিনটা বছরই সুখে-শান্তিতে কাটাতে পেরেছি আমি!
‘আমার সঙ্গে রাডা-য় ড্যামিয়েন ক্যুপারও ছিল। ভুল বুঝবেন না… ওকে ভালো লাগত আমার। ওর প্রশংসা করতাম। কিন্তু কাজটা করতাম, কারণ আমি আসলে তখনও ঠিকমতো চিনতাম না ওকে। ভেবেছিলাম সে আমার বন্ধু … সবচেয়ে ভালো বন্ধু। কিন্তু তখনও আসলে ওকে চেনা হয়ে ওঠেনি আমার। তখনও বুঝিনি, সে আসলে ঠাণ্ডা-মাথার, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, ধান্দাবাজ একটা শুয়োর।’
দৃষ্টি নামিয়ে তাকালাম স্কালপেলটার দিকে। ওটা এখনও কুৎসিত এক কায়দায় বেরিয়ে আছে আমার বুকের ভিতর থেকে। রক্তের ছোট্ট একটা পুকুর তৈরি হচ্ছে ওটার আশপাশে… আকৃতিতে ওই পুকুর আমার হাতের তালুর চেয়ে বড় না। দপদপ করতে শুরু করেছে ক্ষতস্থানটা। অসুস্থ বোধ করছি আমি।
