‘আপনি যদি এখানে না-আসতেন, তা হলেই ভালো হতো,’ বলল কর্নওয়ালিস। শয়তানটার কথাবার্তায় এখনও ভদ্রতা আছে। আমার ধারণা, বছরের পর বছর ধরে চর্চা করে এ-রকম কথাবার্তা রপ্ত করেছে সে। সে যে-ভূমিকা পালন করছে, সেটার জন্য এ-রকম আচরণেরও দরকার আছে। কথাটা বললাম, কারণ আমি এখন জেনে গেছি, আসলেই বিশেষ একটা ভূমিকা পালন করছে সে। একটা একটা করে মুহূর্ত পার হচ্ছে, আর আসল রবার্ট কর্নওয়ালিস যেন একটু একটু করে উদ্ভাসিত হচ্ছে আমার সামনে।
‘আপনার সঙ্গে আসলে কোনো রেষারেষি নেই আমার,’ বলল শয়তানটা! ‘আপনার কোনো ক্ষতিও করতে চাইনি কখনও। কিন্তু আপনি নিজেই স্বেচ্ছায়- সজ্ঞানে এসেছেন এখানে। স্বেচ্ছায় নাক গলিয়েছেন আমার ব্যবসায়।’ বলতে বলতে গলা চড়ে গিয়েছিল তার, নিজেকে সামলে নিল একটুখানি। ‘রাডা’র ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করতে গেলেন কেন? কেন খুঁড়ে বের করতে গেলেন আমার অতীত? এখানে হাজির হয়ে বোকার মতো সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, ফলে আমাকে বাধ্য হয়ে…। এই কাজটা আসলেই করতে চাইনি আমি।’
কথা বলতে চাইলাম, কিন্তু মুখের ভিতরে ঢুকে-থাকা রুমালটা সে-কাজ করতে দিল না আমাকে। ওটা আমার মুখের ভিতর থেকে টেনে বের করল কর্নওয়ালিস। ওটা বেরিয়ে যাওয়ামাত্র কথা বলতে পারলাম।
‘আমি যে এখানে এসেছি, আসার আগে সেটা বলে এসেছি আমার স্ত্রীকে। আমার অ্যাসিস্টেন্টকেও বলেছি। এখন আপনি যদি কিছু করেন আমাকে, ওরা জেনে যাবে।’
‘হ্যাঁ, তা যাবে বটে… যদি তাঁরা আপনাকে খুঁজে পান।’ বলল কর্নওয়ালিস, আবেগের ছিটেফোঁটাও নেই কণ্ঠে। আবারও কথা বলতে চাইলাম আমি কিন্তু হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিল শয়তানটা। ‘পরোয়া করি না। আপনার কাছ থেকে আর কিছু শুনতেও চাই না। এখন আর এসবে আমার তেমন কিছু আসে-যায়ও না। আমি শুধু এখন কিছু কথা বুঝিয়ে বলতে চাই।’
আঙুল তুলে কপালের একটা পাশ স্পর্শ করল সে, তাকিয়ে আছে অনতিদূরের কোনো এক জায়গার দিকে। কী বলবে, তা মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে বোধহয়। অবশের মতো বসেই আছি আমি, নিঃশব্দে চিৎকার করছি। মনে মনে বলছি, আমি একজন লেখক। এসব ঘটতে পারে না আমার সঙ্গে। আমি চাইনি এসব ঘটুক।
‘আমার জীবনটা আসলে কী-রকম, সে-ব্যাপারে আদৌ কি কোনো ধারণা আছে আপনার?’ শেষপর্যন্ত বলল কর্নওয়ালিস। ‘আপনি কি মনে করেন জীবিকার জন্য যা করি আমি সেটা উপভোগ করি? দিনের পর দিন ঠায় বসে থেকে দুঃস্থ কিছু লোকের মরা বাপ-মা-দাদা-দাদী-নানা-নানীর করুণ গল্প শুনতে কেমন লাগে, বলুন তো? মাথার উপর যখন গনগন করছে দুপুরের সূর্যটা, তখন ওসব মরা মানুষের শেষকৃত্যানুষ্ঠান বা শবদাহের আয়োজন করতে কেমন লাগে? তাদের কফিন বা সমাধিফলক বয়ে বেড়াতে কেমন লাগে? লোকে আমার দিকে তাকায়, আর দেখে, স্যুট-কোট পরে বসে আছে বিরক্তিকর একটা মানুষ, যার মুখে কখনও হাসি নেই, যে সব সময় সান্ত্বনার বাণী শোনায় তার খদ্দেরদের, কখনও কখনও আবার ক্রন্দনরত কারও দিকে বাড়িয়ে দেয় টিস্যু। অথচ ভিতরে ভিতরে আমি সব সময় চেয়েছি তাদের চেহারায় সজোরে ঘুসি হাঁকাতে। কারণ এ-রকম কিছু হতে চাইনি আমি কখনও।
‘কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স। এই পরিবারেই আমার জন্ম। আমার বাবা ছিলেন একজন আন্ডারটেকার। আমার দাদাও ছিলেন তা-ই। তাঁর বাবাও তা-ই ছিলেন। আমার চাচা-ফুফুরাও একই কাজ করতেন। আমি যখন নেহাৎই একজন বালক, তখন থেকেই যাঁদেরকে দেখেছি আমার আশপাশে, তাঁরা সব সময় কালো কাপড় পরে থাকতেন। কতগুলো ঘোড়া টেনে নিয়ে চলেছে একটা শবযান… এই দৃশ্য দেখানোর জন্য বার বার রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হতো আমাকে। ওটাই ছিল আমার শৈশবের শিক্ষা। রাতে যখনই আমার বাবাকে ডিনার খেতে দেখতাম, আমার মনে পড়ে যেত, সারাটা দিন কাটিয়েছেন তিনি মরা মানুষদের সঙ্গে। মনে পড়ে যেত, যে-দুই হাতে আমাকে আলিঙ্গন করতেন তিনি, সে-হাতেই সারাদিনে ঘেঁটেছেন মানুষের লাশ। মৃত্যু যেন তাঁর পিছু নিয়ে হাজির হতো আমাদের সেই বাড়িতে, সেই ডাইনিংরুমে। আমার ধারণা, আমাদের পুরো পরিবার সংক্রমিত হয়েছিল এই চিন্তায়। মৃত্যুই ছিল আমাদের জন্য জীবন। যখনই ভাবতাম একদিন আমাকেও হতে হবে ও-রকম, কারণ আমার জন্যও ভেবে রাখা হয়েছে এসব, তখনই খারাপটা লাগত সবচেয়ে বেশি। কিন্তু কিছু করার নেই… আমরা কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স… এবং আমি ওই পরিবারের একজন পুত্রসন্তান।
‘এই ব্যাপারটা নিয়ে স্কুলে আমার বন্ধুরা প্রায়ই খেপাত আমাকে। আমাদের পারিবারিক নামটা জানা ছিল সবারই… কর্নওয়ালিস। তাদের কাউকে কাউকে আবার স্কুলের বাসে গিয়ে ওঠার জন্য আমাদের দোকানের সামনে দিয়েই যেতে হতো। এমনকী স্কুলে আমার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ফিউনারেল বয়’। কেউ কেউ আবার ডাকত ‘ডেড বয়’। আমার কাছে জানতে চাইত, মরা মানুষের গায়ে যখন কাপড় থাকে না, তখন তাদেরকে দেখতে কেমন লাগে। জানতে চাইত, পুরুষ মানুষ মরে গেলেও কি তাদের লিঙ্গ উত্থিত হয়? মরা মানুষের কি নখ বাড়ে? স্কুলে যেসব শিক্ষক-শিক্ষিকা পড়াতেন আমাদেরকে, তাঁদের অর্ধেক মনে করতেন, আমি বোধহয় রোমাঞ্চকর কোনো কিছু… কারণটা আর কিছুই না, আমাদের সেই পারিবারিক কর্মযজ্ঞ। আরেকটু বড় ক্লাসে যখন উঠলাম, বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা বলত, যার যার ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলত। স্বপ্ন ছিল তাদের। ভবিষ্যৎ ছিল। কিন্তু আমার ওসব কিছুই ছিল না। স্বপ্ন বা ভবিষ্যৎ যা-ই বলুন, সব মরে গিয়েছিল আমার সেই ছেলেবেলাতেই।
