‘আপনি ঠিক আছেন?’ জানতে চাইল কর্নওয়ালিস, চেহারায় রাজ্যের উদ্বেগ। অভিনয়।
‘কী করেছেন আপনি?’ নিজের কণ্ঠ নিজের কানেই অপরিচিত বলে মনে হলো আমার। প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করতে দু’বার চেষ্টা করতে হয়েছে আমাকে।
‘উঠে দাঁড়ান…’
‘পারছি না!’
হাসল কর্নওয়ালিস। হাসিটা ভয়ঙ্কর।
ধীরেসুস্থে হেঁটে আমার কাছে হাজির হলো শয়তান লোকটা। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে গুঁজে দিল আমার মুখে, আঁতকে উঠলাম। অর্থাৎ কার্যত বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম। রুমালটা আমার মুখের ভিতরে ঢোকার আগপর্যন্ত একটাবারের জন্যও মনে হয়নি, চেঁচানো উচিত আমার। তা ছাড়া চেঁচালে খুব একটা লাভ হতো বলে মনেও হয় না। কেউ বলে না-দিলেও জানি, আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ যাতে না-থাকে এই জায়গায়, সেটা আগেই নিশ্চিত করেছে কর্নওয়ালিস।
‘একটা জিনিস নিয়ে আসি,’ বলল শয়তানটা। ‘এক মিনিটও লাগবে না।’
হেঁটে বেরিয়ে গেল সে ঘর থেকে, দরজাটা খুলে রেখে গেছে। বসে আছি আমি আগের মতোই, নতুন এই অনুভূতি টের পাওয়ার চেষ্টা করছি… বলা ভালো, শরীরের অসাড়তা অনুভব করছি। প্রকৃতপক্ষে ভয় ছাড়া আর কোনো কিছু টের পাচ্ছি না। শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে, সেটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। এখনও হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে বুকে। রুমালটা যেন একটু একটু করে ঢুকে যাচ্ছে গলায়… একটু একটু করে দম আটকে আসছে আমার। যা বুঝতে পারাটা সহজ ছিল, প্রচণ্ড আতঙ্কিত থাকার কারণে সেটা বুঝতে যেন কষ্ট হচ্ছে আমার: আমি খুশিমনে হাজির হয়ে গেছি কোনো এক মরার জায়গায়। এবং এর ফলাফল আমারই নিশ্চিত মৃত্যু।
একটা হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে হাজির হলো কর্নওয়ালিস। লাশ ঠেলার কাজে কি ওটা ব্যবহার করে সে? মনে হয় না। বরং যেসব অতি-বৃদ্ধ মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে আসে কোনো মরদেহকে, সম্ভবত তাদের জন্য ব্যবহৃত হয় ওই চেয়ার।
নিচু সুরে শিস বাজাচ্ছে কর্নওয়ালিস। আমি যেন একইসঙ্গে কৌতূহল আর ভাবলেশহীনতা দেখতে পাচ্ছি শয়তানটার চেহারায়। টিন্টেড সেই চশমা আর পরে নেই সে। পিটপিট করছে দুই চোখ, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি সে-দুটো। দেখছি তার ছোট ছোট কিন্তু পরিপাটি দাড়ি, পাতলা হয়ে আসা চুল, বুঝতে পারছি এসব আসলে শয়তানটার মুখোশ ছাড়া আর কিছু না। বুঝতে পারছি, সে-মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে দানবীয় কিছু-একটা। এবং এখন ওই মুখোশ ভেদ করে যেন দেখা যাচ্ছে দানবটাকে। সে জানে আমি নড়তে পারছি না। আমার কফিতে নিশ্চয়ই কিছু-একটা মিশিয়েছে সে। আর আমিও এমন বোকা… খেয়ে নিয়েছি ওই কফি। বাস্তবে চেঁচাতে পারছি না, কিন্তু মনে মনে ঠিকই চিৎকার করছি নিজের উদ্দেশে…. কর্নওয়ালিসই শ্বাসরোধ করেছে হত্যা করেছে ডায়ানা ক্যুপারকে, পরে টুকরো টুকরো করেছে ওই মহিলার ছেলেকে। কিন্তু কেন? এবং আরও বড় কথা হচ্ছে, এখানে এসে শয়তানটার ফাঁদে ধরা পড়ার আগে কথাটা কেন বোধগম্য হলো না আমার?
আমার উপর ঝুঁকে পড়ল সে, একটা মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমাকে বুঝি চুমু খেতে চলেছে। প্রচণ্ড ঘৃণায় কুঁকড়ে গেলাম, কিন্তু অবলীলায় আমাকে তুলে নিল শয়তানটা, লোকে যেভাবে ময়লা ছুঁড়ে ফেলে সেভাবে আমাকে ছুঁড়ে ফেলল হুইলচেয়ারে। আমার ওজন প্রায় পঁচাশি কেজি, কাজ শেষ করে দম নিতে হলো কর্নওয়ালিসকে। তারপর ঠিক করে দিল আমার পা দুটো, এখনও শিস বাজাচ্ছে। ঠেলতে শুরু করল হুইলচেয়ারটা, অফিসের বাইরে নিয়ে এল আমাকে।
খোলা একটা দরজা পার হলাম আমরা। এবার একদিকে একটা গির্জা দেখতে পাচ্ছি। একঝলক তাকালাম সেদিকে। চোখে পড়ল মোমবাতি, কাঠের প্যানেল, একটা বেদি… সেখানে সম্ভবত একটা ক্রুশ বা মেনোরাহ অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত ধর্মীয় প্রতীক রাখা আছে। করিডরের শেষমাথায় আছে একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিফট। ওটা এত বড় যে, ভিতরে একটা কফিন এঁটে যাবে। হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে আমাকে ওই লিফটের কাছে নিয়ে গেল কর্নওয়ালিস, ঢুকিয়ে দিল ভিতরে। তারপর খোঁচা মারল একটা বাটনে। দরজাটা যখন লেগে যাচ্ছে, তখন টের পেলাম, আমার জীবনটাও বুঝি শেষ হয়ে গেল। একটা ঝাঁকুনি অনুভব করলাম, নামতে শুরু করলাম নিচে।
লিফটটা হাজির হলো নিচু ছাদওয়ালা বড়সড় একটা ওয়ার্করুমে। আরও নিয়ন লাইট আছে এখানে। নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর বসানো আছে সেগুলো। যা-কিছু দেখছি, তাতেই নতুন নতুন ভয়ে ছেয়ে যাচ্ছে আমার মন। আমি যে অসহায়, সে-অনুভূতি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে আমার ভিতরে। দূরের এক কোনায় দেখা যাচ্ছে রূপার ছ’টা কেবিনেট… ওগুলো আসলে রেফ্রিজারেটেড কম্পার্টমেন্ট, দুই সেটে তিনটা তিনটা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষকে অনায়াসে ঢুকিয়ে রাখা যাবে যে-কোনো কেবিনেটে। ঘরের বাকি অংশ দেখলে মনে পড়ে যায় কোনো সার্জারির কথা। একধারে আছে ধাতব একটা গার্নি। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা শেল্ফ, গাঢ় রঙের কিছু তরলে ভর্তি কতগুলো বোতল আর শিশি দেখা যাচ্ছে সেগুলোতে। একটা টেবিলের উপর থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে স্কালপেল, সুঁই আর ছুরি। হুইলচেয়ারটা ঠেলতে ঠেলতে ওসব জিনিসের সামনে নিয়ে রাখল কর্নওয়ালিস, যাতে আমার মুখোমুখি থাকে ওগুলো। একটু আগে যে- লিফট থেকে বের হয়েছি, আমার পিঠটা এখন সেদিকে। চারদিকের দেয়ালে সাদা চুনকাম করা। ধূসর শিট ভিনাইলে আচ্ছাদিত পুরো মেঝে। এককোনায় একটা বালতি আর একটা মপ আছে।
