‘একদিক দিয়ে চিন্তা করলে আছি বটে,’ বললাম আমি।
‘না… আসলে বোঝাতে চেয়েছি, আপনাকেও একজন গোয়েন্দা ভেবেছিলাম আমি। ….মিস্টার হোথর্ন কোথায়?’
কফির কাপে চুমুক দিলাম। আমাকে জিজ্ঞেস না করেই কফিতে চিনি দিয়ে ফেলেছেন কর্নওয়ালিস। ‘এই মুহূর্তে একটা কাজে লন্ডনের বাইরে আছে।’
‘তিনিই কি পাঠিয়েছেন আপনাকে?’
‘না। সত্যি বলতে কী… আমি যে দেখা করতে এসেছি আপনার সঙ্গে, জানে না সে সেটা
কথাটা ভেবে দেখল কর্নওয়ারিস। দেখে মনে হচ্ছে, থতমত খেয়ে গেছে। ‘ফোনে তখন বললেন, আপনি নাকি একটা বই নিয়ে কাজ করছেন…’
‘হ্যাঁ।’
‘ব্যাপারটা একটু… কী বলবো… বেখাপ্পা হয়ে গেল না? কারণ আমি জানতাম পুলিশি কোনো তদন্ত… খুনের কোনো তদন্ত… গোপনেই করা হয়। আচ্ছা, আপনার সেই বইয়ে কি আমার কথাও থাকবে?’
‘মনে হয়।
‘কিছু মনে করবেন না… সে-রকম কিছু চাই না আমি আসলে। ডায়ানা ক্যুপার আর তাঁর ছেলের ব্যাপারটা নিয়ে আমি খুবই আপসেট। এসবের সঙ্গে আর জড়িত থাকতে চাই না।’
‘বইটা যেহেতু এখনও লেখাই হয়নি, কাজেই কারও যদি আপত্তি থাকে তা হলে তার নাম বদলে দিতে পারি আমি। আপনি কি চান আপনার পরিচয় বদলে দিই?’
‘সরাসরিই বলি… যদি তা করেন তা হলে ভালো হয়।
সেক্ষেত্রে… আপনার নাম যদি দিই ড্যান রবার্টস, তা হলে কেমন হয়?’
কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কর্নওয়ালিস। হাসি দেখা দিয়েছে তার চেহারায়। ‘অনেক বছর হয়ে গেল ওই নাম ব্যবহার করিনি আমি।’
‘জানি।’
সিগারেটের একটা প্যাকেট বের করল কর্নওয়ালিস। সে যে সিগারেট খায়, জানা ছিল না আমার। মনে পড়ে গেল, তার দক্ষিণ কেনসিংটনের অফিসে কোনো একজাতের একটা অ্যাশট্রে দেখেছিলাম। একটা সিগারেট ধরাল সে, হাত ঝাঁকুনি দিয়ে নেভাল জ্বলন্ত ম্যাচকাঠি। ভঙ্গিটা কেমন যেন ক্রুদ্ধ বলে মনে হলো আমার। ‘ফোনে বলেছিলেন, আপনি নাকি রাডা থেকে কথা বলছেন
‘হ্যাঁ, ঠিক। আজ বিকেলে সেখানে গিয়েছিলাম আমি। দেখা করতে গিয়েছিলাম… ‘ সহযোগী সেই পরিচালকের নাম বললাম। কিন্তু দেখে মনে হলো না, লিয়কে চিনতে পেরেছে কর্নওয়ালিস। ‘আপনি যে এককালে রাডা’র ছাত্র ছিলেন, কখনও বলেননি।’ অর্ধেকটা কফি শেষ করলাম। নামিয়ে রাখলাম মগটা।
‘না… আমি নিশ্চিত কথাটা বলেছিলাম
‘না, বলেননি। আপনার সঙ্গে দু’বার কথা বলেছে হোথর্ন, দু’বারই উপস্থিত ছিলাম আমি। যা-হোক, আপনি যে শুধু রাডা-য় ছিলেন তা-ই না, ড্যামিয়েন ক্যুপার যে-সময়ে ছিল সেই একই সময়েও ছিলেন। তার সঙ্গে অভিনয় করেছেন।
নিশ্চিত ছিলাম, কথাটা অস্বীকার করবে কর্নওয়ালিস। কিন্তু চোখের পলক পড়ছে না তার। বলল, ‘রাডা ছেড়ে চলে আসার পর ওই প্রতিষ্ঠান নিয়ে আর কথা বলি না আমি। যা-হোক, দক্ষিণ কেনসিংটনে আমার অফিসে যেদিন গিয়েছিলেন, সেদিন কিন্তু আপনাদের কথা শুনে মনে হয়েছিল ডিলের সেই গাড়ি-দুর্ঘটনার ব্যাপারে আপনারা আগ্রহী বেশি।
‘ওই দুর্ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ড দুটোর সম্পর্ক থাকতে পারে… অস্বীকার করছি না। দুর্ঘটনাটা নিয়ে ক্লাসে মাঝেমধ্যে কথা বলতেন ড্যামিয়েন। আপনি কি ছিলেন সেসব ক্লাসে?’
‘ছিলাম। ঘটনাটা অনেক বছর আগের। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, আপনি সব মনে করিয়ে দিলেন।’ ঘরের ভিতরে অত্যুজ্জ্বল একটা নিয়ন লাইট জ্বলছে, সেটার আলো প্রতিফলিত হচ্ছে কর্নওয়ালিসের চশমায়। ‘একবার লাল রঙের একটা ছোট্ট বাস নিয়ে এসেছিল ড্যামিয়েন। একটা মিউযিকও বাজিয়েছিল তখন। কী ঘটেছিল ডিলে, সেটা জানিয়েছিল আমাদের সবাইকে। ওই ঘটনা কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল তার মনে, বলেছিল সে-কথাও।’ কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। ‘জানেন কি না জানি না… ওই দুর্ঘটনায় বাচ্চা একটা ছেলে মারা যাওয়ার পরও ড্যামিয়েন এবং তার ক্যারিয়ার নিয়ে যে ভেবেছে তার মা, বিশেষ এই ব্যাপারে কিন্তু বেশ গর্বিত ছিল সে। বলাই বাহুল্য, মা আর ছেলে দু’জনই ছিল উল্লেখ করার মতো দুটো চরিত্র। …আপনি কি একমত?’
‘ড্যামিয়েনের সঙ্গে অভিনয় করেছেন আপনি,’ জবাব দিলাম না কর্নওয়ালিসের প্রশ্নটার। ‘হ্যামলেট নাটকে ছিলেন আপনারা দু’জন।’
‘ছিলাম। তবে এখন ওসব পাগলামি বলে মনে হয় আমার। আসলে আমাদের বয়স তখন ছিল অল্প… বাচ্চাই বলা চলে। অথচ বড় বড় অনেক চিন্তাভাবনা খেলা করত আমাদের মাথায়।
‘আপনি প্রতিভাবান একজন অভিনেতা ছিলেন,’ বললাম আমি।
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল কর্নওয়ালিস। ‘একটা সময় ছিল যখন অভিনেতা হতে চাইতাম আমি।’
‘কিন্তু শেষপর্যন্ত হয়েছেন একজন আন্ডারটেকার।’
‘আমার বাসায় যখন গিয়েছিলেন আপনারা, তখন এসব নিয়ে কথা বলেছি। .এই ব্যবসা আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। আমার বাবা, দাদা… মনে আছে কী বলেছিলাম?’ চেহারা বদলে গেল কর্নওয়ালিসের… দেখে মনে হলো, কিছু একটা স্মরণে এসেছে তার। ‘কিছু একটা দেখাতে চাই আমি আপনাকে। ওটা হয়তো ইন্টারেস্টিং লাগবে আপনার।’
‘কী?’
‘এখানে না। পাশের ঘরে…’
উঠে দাঁড়াল কর্নওয়ালিস, আশা করছে তাকে অনুসরণ করবো আমি। তা-ই করতে চেয়েছিলাম আমিও। কিন্তু যখন উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম, টের পেলাম, পারছি না কাজটা করতে।
প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম… এত আতঙ্কিত কখনও হইনি এই জীবনে। নড়তে পারছি না আমি। আমার মস্তিষ্ক উঠে দাঁড়ানোর সিগনাল পাঠাচ্ছে আমার দুই পায়ে, কিন্তু পা-দুটো শুনছে না সে-আদেশ। আর আমার হাত দুটো ভিনদেশী কোনো কিছু বলে মনে হচ্ছে… সংযুক্ত আছে আমার শরীরের সঙ্গে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আমার পুরো শরীরটা পরিণত হয়েছে পেশী আর হাড়ের একটা অকেজো স্তূপে। আতঙ্কে বুকের ভিতরে… ঠিক হৃৎপিণ্ডে হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে যেন। মনে হচ্ছে, পাঁজরা ভেঙে বেরিয়ে আসবে ওটা। বুঝতে পারছি, কোনো একজাতের ড্রাগ খাইয়ে দেয়া হয়েছে আমাকে। আরও বুঝতে পারছি, ভীষণ বিপদে পড়েছি আমি।
