‘আমার কোনো ধারণা নেই,’ বললেন লিয। ‘ওই দলের কোনো একজনের বাবা হবেন হয়তো। নাটকটা প্রথমবার মঞ্চস্থ হওয়ার পর তোলা হয়েছিল এই ছবি।’
‘আপনি কি কখনও…
প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও জিজ্ঞেস করা হলো না আমার। জানতে চাইছিলাম, ড্যামিয়েনের সঙ্গে আমান্ডার সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু জানেন কি না লিয। কিন্তু ঠিক তখনই এমন কিছু একটা দেখতে পেলাম, যার ফলে বাক্যের মাঝখানে থেমে যেতে হলো আমাকে। ছবিতে যে-দলটা দেখা যাচ্ছে, তাদের বিশেষ একজনের দিকে তাকিয়ে আছি, এবং হঠাৎ করেই চিনতে পেরেছি তাকে। ওই মানুষটার পরিচয়ের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। উত্তেজনার মাথায় হঠাৎ করেই অনুধাবন করতে পারলাম, এমন কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেলেছি, যেটা এই কেসের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অনুধাবন করতে পারলাম, আমি অন্তত একটাবারের জন্য হলেও এক ধাপ এগিয়ে গেছি হোথর্নের চেয়ে। এমন কিছু একটা জেনে গেছি, যা সে জানে না। গ্রেস লোভেলদের বাসা থেকে যখন বের হয়েছিলাম, তখন জেনে-বুঝে উপহাস করেছে সে আমাকে। উপহাস বলছি কেন… রীতিমতো অবজ্ঞা করেছে আমাকে, অপমান করেছে। এখন কথা হচ্ছে, সে ক্যান্টাব্রি থেকে ফেরার পর আমি যদি তাকে বলি কোন্ বিষয়টা মিস করেছে, তা হলে কেমন হবে? একটুখানি না-হেসে পারলাম না। লন্ডনের পথেঘাটে আমাকে ঘুরিয়েছে সে… সাইডলাইনে বসে-থাকা খেলোয়াড়দের মতো নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করেছে ওর দিকে… কাজেই সে ফেরার পর যদি এই কথা বলি তাকে, এক হাত নিতে পারবো আমি ওকে।
‘লিয, আপনার কোনো জবাব নেই,’ বললাম আমি। ইঙ্গিতে দেখালাম ছবিটা। ‘এটা কি ধার নিতে পারি আমি?’
‘দুঃখিত। ছবিটা এই প্রতিষ্ঠানের… এটাকে এই বিল্ডিঙের বাইরে যেতে দেয়াটা উচিত হবে না। তবে আপনি চাইলে আপনার মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে নিতে পারেন।
‘চমৎকার!’ আইফোনটা টেবিলের উপরই আছে… এতক্ষণ ধরে আমাদের কথোপকথন রেকর্ড করেছি। ওটা তুলে নিলাম, একটা ছবি তুললাম বিশেষ সেই ফটোগ্রাফের। তারপর উঠে দাঁড়ালাম। ‘অনেক ধন্যবাদ।
রাডা’র বাইরে এসে যোগাযোগ করলাম আলাদা আলাদা তিন জায়গায়।
প্রথমে আয়োজন করলাম একটা মিটিং।
তারপর ফোন করলাম আমার অ্যাসিস্টেন্টকে… আমার জন্য অপেক্ষা করছে সে। মেয়েটাকে বললাম, আজ বিকেলে আর ফিরতে পারছি না।
সবশেষে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিলাম আমার স্ত্রীর কাছে, জানিয়ে দিলাম আজ ডিনারে যোগ দিতে হয়তো একটু দেরি হবে।
জানা ছিল না, সে-রাতে ডিনারই জুটবে না আমার কপালে।
২২. মুখোশের আড়ালে
গাওয়ার স্ট্রীট থেকে টিউব ট্রেনে চেপে চলে এলাম পশ্চিম লন্ডনে। মিনিট পাঁচেক হেঁটে হাজির হলাম লাল-ইটে-বানানো চৌকোনা একটা বিল্ডিঙের সামনে। এটার জানালাগুলোয় ফ্রস্টেড কাঁচ লাগানো। বিজ্ঞাপনমূলক কোনো কিছু নেই কোথাও। চাপ দিলাম ডোরবেলে। ঘণ্টার আওয়াজটা কেমন যেন ক্রুদ্ধ বলে মনে হলো আমার। ভিতরের কোনো এক জায়গা থেকে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে খুলে দেয়া হলো তালা, ক্লিক করে শব্দ হলো। ঢোকার সময় খেয়াল করলাম, একটা সিসিটিভি ক্যামেরা তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হাজির হলাম শূন্য একটা রিসিপশন এরিয়ায়। দেয়ালগুলো খালি, মেঝেতে টাইলস করা। আশপাশ দেখে কোনো ক্লিনিক অথবা কোনো একটা হাসপাতালের অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনো ডিপার্টমেন্টের কথা মনে পড়ে গেল আমার। প্রথমে মনে হলো, আমি বুঝি একা এখানে। কিন্তু একটা ডাক শুনতে পেলাম হঠাৎ। এগিয়ে গেলাম একটা অফিসের দিকে। সেখানে দু’কাপ কফি বানাচ্ছে ফিউনারেল ডিরেক্টর রবার্ট কর্নওয়ালিস। এই বিল্ডিঙের অন্যান্য জায়গার মতো এই অফিসেও উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু নেই। একটামাত্র ডেস্ক আছে এখানে, আর আছে কাজ চালানোর মতো অল্প কয়েকটা চেয়ার। তুলার আবরণ দেখতে পাচ্ছি সেসব চেয়ারে, কিন্তু একইসঙ্গে এ-ও বুঝতে পারছি, খুব একটা আরামদায়ক না সেগুলো। একদিকে কাঠের-পায়াওয়ালা একটা টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে আছে একটা কফি মেশিন। আরেকদিকের দেয়ালে ঝুলছে একটা ক্যালেন্ডার।
কর্নওয়ালিসের সঙ্গে যখন প্রথমবার দেখা হয়েছিল আমার, তখন এই জায়গার কথা আমাকে বলেছিল সে। আলাপ-আলোচনার জন্য তার খদ্দেররা যায় দক্ষিণ কেনসিংটনে, কিন্তু লাশগুলো নিয়ে আসা হয় এখানে। এই জায়গার ধারেকাছে ছোট একটা গির্জা আছে। অন্য কেউ আছে কি না কাছেপিঠে, জানার জন্য কান পাতলাম। আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ যে নেই, সে-কথা একবারও মনে হয়নি আমার। এখন পড়ন্ত বিকেল, কাজ শেষে সবাই বোধহয় ফিরে গেছে যার যার বাসায়। কর্নওয়ালিসকে তার অফিসে ফোন করেছিলাম আমি, কিন্তু এখানে দেখা করার ব্যাপারে জোরাজুরি করেছে সে।
নাম ধরে আমাকে সম্ভাষণ জানাল লোকটা। শেষ দু’বার যখন দেখা হয়েছে তার সঙ্গে, তখন তাকে যতটা আন্তরিক আর নিরুদ্বেগ বলে মনে হয়েছে, এখন তার চেয়েও বেশি বলে মনে হচ্ছে। স্যুট পরে আছে, তবে টাই খুলে ফেলেছে। শার্টের উপরের দিকের দুটো বোতামও খুলে রেখেছে।
‘আপনি কে সে-ব্যাপারে কোনো ধারণাই ছিল না আমার,’ বলল সে। কফির একটা কাপ বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। ফোনে নিজের নামটা বলেছি আমি তাকে। ‘আপনি একজন লেখক! বলতেই হয়… পুরোপুরি বিস্মিত হয়েছি আমি। কারণ আপনি যখন আমার অফিসে আর বাসায় গিয়েছিলেন, আমি ধরেই নিয়েছিলাম আপনিও পুলিশে আছেন।’
