‘এই ঘটনার ঠিক কোন্ ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর বলে মনে হচ্ছে আপনার কাছে?’
‘এই ব্যাপারটা নিয়ে পরে তার সঙ্গে একটু মন কষাকষি হয়েছিল আমার। এই ব্যাপারে খুব আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিল সে। বলেছিল, ওই ছড়াগান নাকি ওর ভিতরটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল। ওটা নাকি কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না সে মাথা থেকে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, আমার মনে হয় না ওই গাড়ি দুর্ঘটনার সঙ্গে আদৌ কোনো সম্পর্ক ছিল তার। বরং আমার মনে হয়, ঘটনাটা ব্যবহার করতে চাইছিল সে আসলে… ওটা উপজীব্য করে কোনো একটা ফায়দা লুটতে চাইছিল। তার সেই ভান ছিল খুবই আত্মকেন্দ্রিক। ড্যামিয়েনের মা হয়তো সেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর কারণেই যে মারা গিয়েছিল আট বছর বয়সী ওই ছেলেটা, সে-ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমার মনে হয় না, এই ব্যাপারটা ক্লাসে সবার সামনে উপস্থাপন করে ঠিক কাজ করেছে ড্যামিয়েন। এবং সেটা তাকে বলেছিলামও।
‘আমান্ডা লেইয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন?’
‘তার কথা তেমন একটা মনে নেই আমার। তবে এটা মনে আছে, মেয়েটা মেধাবী আর চুপচাপ প্রকৃতির ছিল। ড্যামিয়েনের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কোথায় কোথায় যেন যেত। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তাদের দু’জনের মধ্যে। বলতে খারাপই লাগছে… রাডা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মেয়েটা তার ক্যারিয়ার বেশিদূর টেনে নিতে পারেনি। দুটো গীতিনাট্যে অভিনয় করেছিল, কিন্তু তার বেশি কিছু না।’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন লিয। ‘মাঝেমধ্যে হয় এ-রকম। কোথাকার জল গড়িয়ে কোন্ পর্যন্ত যাবে, সেটা আগেভাগে অনুমান করা যায় না।
‘মেয়েটা একদিন হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গিয়েছিল, না?’
‘পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল খবরটা। আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য এখানেও এসেছিল পুলিশ, অথচ রাডা থেকে চলে যাওয়ার চার কি পাঁচ বছর পর হারিয়ে যায় মেয়েটা। একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল তখন… ওই মেয়ে নাকি তার এক ভক্ত বা উত্যক্তকারীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। কিন্তু এই ব্যাপারে পরে নিজেদের মত বদল করে পুলিশ। বলে, মেয়েটা নাকি কারও সঙ্গে ডেট করার জন্য গিয়েছিল সম্ভবত। কারণ তার পরনে তখন ছিল স্মার্ট পোশাক। একটা ফ্ল্যাটে থাকত সে, সেখানে তার সঙ্গে আরও কয়েকটা মেয়ে থাকত… তারা বলেছে, বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সে নাকি খোশমেজাজে ছিল। যা-হোক, সেই যে গেল মেয়েটা… তার দেখা পাওয়া গেল না আর কখনও। সে যদি আরও বিখ্যাত কেউ হতো, তা হলে এই ব্যাপারটা আরও বেশি হইচই হতো। অথবা কেউ যদি ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে ওই মেয়ের কোনো একটা সম্পর্ক জুড়ে দিতে পারত, তা হলেও আলোড়ন তৈরি হতো ব্যাপারটা নিয়ে। কারণ ক্যুপার ততদিনে নিজের জন্য নাম কামাতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, লন্ডনের বাসিন্দা অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে হরহামেশা… ওই মেয়েও হয়তো তাদের মতোই একজন।’
‘আপনি বলেছিলেন আপনার কাছে নাকি ওই মেয়ের একটা ছবি আছে।’
‘হ্যাঁ। আপনি আসলে সৌভাগ্যবান। কারণ ওই সময়ে যারা ছিল রাডা-য়, তাদের কারও তেমন কোনো ছবি নেই আমাদের কাছে। এখনকার দিনে তো সবারই মোবাইল ফোন থাকে। যা-হোক, আমরা ছবিটা রেখেছিলাম সেই হ্যামলেট নাটকের কারণে।’ সঙ্গে করে বড় একটা ক্যানভাসের ব্যাগ নিয়ে এসেছেন লিয, ওটা তুলে রাখলেন টেবিলের উপর। ‘আমাদের অফিসে খুঁজে পেয়েছি ছবিটা।’
ফ্রেমে বাঁধাই-করা সাদা-কালো একটা ছবি বের করলেন তিনি। আমাদের দু’জনের কফির কাপ দুটোর মাঝখানে রাখলেন ওটা। তাকালাম ছবিটার দিকে। হঠাৎ করেই টের পেলাম, যেন কোনো জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি ১৯৯৯ সালের দিকে।
কম-বয়সী পাঁচজন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দেখা যাচ্ছে। খালি একটা স্টেজের উপর আছে তারা সবাই, তাকিয়ে আছে ক্যামেরার দিকে, ভাবভঙ্গিতে অতিরিক্ত সিরিয়াসনেস। ছবিটা দেখামাত্র চিনতে পারলাম ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। গত বারো বছরে খুব একটা বদলায়নি সে। তবে ওই সময়ে আরও হালকাঁপাতলা ছিল, আরও সুন্দর ছিল। কিন্তু ছবিটা দেখামাত্র মনে হয়, ধৃষ্টতা যেন লেপ্টে আছে তার চেহারায়। সোজা তাকিয়ে আছে লেন্সের দিকে, পারলে তাকে উপেক্ষা করার নিঃশব্দ চ্যালেঞ্জ যেন জানাচ্ছে চোখ দুটো। পরনে কালো জিন্স আর খোলা গলার কালো শার্ট। হাতে একটা জাপানিয মুখোশ। গ্রেস লোভেল দাঁড়িয়ে আছে ড্যামিয়েনের এক পাশে। আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা ছেলে।
এদের পেছনে দাঁড়িয়ে-থাকা আরেকটা মেয়েকে দেখিয়ে দিলেন লিয। ‘এই যে… এটাই আমান্ডা।
মেয়েটার মাথায় লম্বা চুল। ওই নাটকে একটা পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করেছিল সে, আর তাই ড্যামিয়েন যে-রকম কাপড় পরেছে সে-ও সে-রকম কাপড় পরেছে।
বলতে বাধ্য হচ্ছি, মেয়েটা হতাশ করল আমাকে। কী আশা করছিলাম, সে- ব্যাপারে আসলে নিশ্চিত না আমি, কিন্তু এই মেয়েকে কেন যেন খুব সাধারণ বলে মনে হলো আমর কাছে। চেহারানকশা এমনিতে সুন্দর, কিন্তু ছুলীতে ভরা। দলটার একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে একটা লোকের দিকে… অন্য এক দিক থেকে ওই দলের উদ্দেশে এগিয়ে যাচ্ছে লোকটা।
‘এটা কে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
অপরিচিত ওই লোক ছবির ফ্রেমে নেই বললেই চলে। ফলে তার চেহারাটা ভালোমতো দেখতেও পাচ্ছি না, তাকে চিনতেও পারছি না। তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছে… লোকটা কৃষ্ণাঙ্গ, চশমা পরে আছে, হাতে একগুচ্ছ ফুল, বিশেষ সেই দলের সবার চেয়ে বয়সে যথেষ্ট বড় এবং স্পষ্ট ঠাহর করা যায় ব্যাপারটা।
