একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়। অনেকদিন হয়ে গেল হোথর্নের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। আজ এক কাজ করলে কেমন হয়? হোথর্ন যেহেতু লন্ডনে নেই, আমি নিজে যদি উদ্যোগী হয়ে কিছু তদন্তকাজ পরিচালনা করি, তা হলে এগিয়ে যেতে পারবো ওর চেয়ে।
আমার চা আর টোস্ট পরিবেশন করা হলো। চায়ের উপরিতলে তেলতেলে একজাতের দীপ্তি দেখতে পাচ্ছি। টোস্ট দুটো ছেয়ে আছে কিছু-একটাতে, সেগুলো আবার গলে গেছে। গা কেমন ঘিনঘিন করে উঠল আমার। ঠেলে সরিয়ে দিলাম প্লেটটা। পকেট থেকে বের করলাম আমার ফোন। আজ সারাদিনের জন্য লন্ডনে থাকছে না হোথর্ন। তার মানে রহস্যময়ী সেই আমান্ডা লেইকে নিয়ে তদন্ত করার সুবর্ণ সুযোগ চলে এসেছে আমার হাতে।
একটু অদ্ভুত হলেও সত্যি, সাউথ লন্ডন প্রেসের যে-আর্টিকেল পড়েছিলাম, সেটাতে ওই মেয়ের কোনো ছবি ছিল না। মেয়েটা দেখতে কেমন, ভাবলাম। নেট ঘাঁটলাম কিছুক্ষণ, কিন্তু কোনো ছবি পেলাম না।
মেয়েটা গায়েব হয়ে গেছে এবং তাকে আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার বাবা-মা হয়তো আজও হা-হুঁতাশ করছে ওই মেয়ের জন্য, কিন্তু সাধারণ জনগণের কৌতূহল উবে গেছে।
আমান্ডা লেইয়ের ব্যাপারে আরও জানতে চাই আমি। রাডা-তে এমন কী ঘটেছিল, যার ফলে গায়েব হয়ে যেতে হবে একজন অভিনেত্রীকে, খুন হবে একজন অভিনেতার মা এবং খুন হবে সেই অভিনেতা নিজে?
কিন্তু… রাডা-তে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করাও তো মুখের কথা না।
কিছুক্ষণ ভাবলাম ব্যাপারটা নিয়ে। একসময় আমার মনে হতে লাগল, একটা উপায় বোধহয় আছে। রাডা মাঝেমধ্যে অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক আর চিত্রনাট্যকারদের আমন্ত্রণ জানায়… ওখানে গিয়ে দেখা করতে বলে ওদের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। গত বছর আমি গিয়েছিলাম সেখানে, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমার সেই সেশন থেকে কতখানি উপকৃত হয়েছে, সে-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না। তবে আমি ওই সেশন খুব উপভোগ করেছি।
আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন একজন সহযোগী পরিচালক। ওই ভদ্রমহিলা চান না পরিচয় ফাঁস হয়ে যাক তাঁর, তাই আপাতত তাঁকে লিয নামেই ডাকছি। ক্যাফেতে বসেই ফোন করলাম তাঁকে। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন বিকেলে তিনি রাডা- তেই ছিলেন। তিনটার সময় এক ঘণ্টার জন্য আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলেন। চালচলনে লিয স্মার্ট, ব্যবহারে ঐকান্তিক। বয়সে আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। অভিনেত্রী হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত হতে পেরেছেন লেখিকা। এবং পরিচালনার এবং পরিচালনার দায়িত্বটাও গ্রহণ করতে পেরেছেন সফলভাবে।
রাডার মেইন বিল্ডিংটা গাওয়ার স্ট্রীটে। নিচতলার একটা চটকদার ক্যাফেতে দেখা হলো লিযের সঙ্গে।
‘ড্যামিয়েন ক্যুপারের কথা খুব ভালোমতো মনে আছে আমার,’ বললেন তিনি ‘কাঁপাচিনো নিয়ে বসে পড়তাম আমরা, আমাদের আশপাশে থাকত সাদা-কালো অনেক ছবি। আমাদের সঙ্গে বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীও থাকত… নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করত তারা, অথবা নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ত।’ কণ্ঠ নিচু করলেন। ‘একটা কথা সব সময় মনে হতো আমার… ড্যামিয়েন ক্যুপারের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ওর বয়স ছিল কম, তবে নিজের উপর বিশ্বাস ছিল, আর… মাঝেমধ্যে একটু খারাপ ব্যবহার করত।’
‘আপনি যে তখনও শিক্ষকতা করতেন এখানে, বুঝতে পারিনি।’
‘১৯৯৭ সালের কথা বলছি আমি। তখন কেবল যোগ দিয়েছি এখানে। ড্যামিয়েন তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।’
‘তাকে মনে হয় তেমন একটা পছন্দ করতেন না আপনি।
‘না, সে-রকম কিছু না। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত যে-আবেগ, সেটা সব সময় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতাম। যা-হোক, যা বলছিলাম… ড্যামিয়েন ছিল খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কাস্টিং পাওয়ার জন্য দরকার হলে নিজের মাকেও ছুরি মারতে পারত সে, এমন অবস্থা।’ বলতে গিয়ে কী বলে ফেলেছেন, সেটা কিছুক্ষণ ভাবলেন লিয। তারপর বললেন, ‘আমি কী বোঝাতে চেয়েছি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন।’
‘হ্যামলেট নাটকে অভিনয় করেছিল সে। সেটা কি দেখেছিলেন?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু কথাটা স্বীকার করতে রীতিমতো ঘৃণা হচ্ছে আমার। কারণ ওই চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল না ড্যামিয়েনের। যার অভিনয় করার কথা ছিল, সে গ্রান্ডুলার ফিভারে আক্রান্ত হয়ে পড়ায় সুযোগটা পেয়ে গিয়েছিল ড্যামিয়েন। সে- বছর ওই অসুখ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। একবার ভয়াবহ প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল লন্ডনে, তখনকার মতো হয়েছিল অবস্থাটা। আসলে… একটা কথা ঠিকই বলেছেন আপনি… ড্যামিয়েনকে ঠিক পছন্দ হতো না আমার। কারণ অন্যদেরকে নিজের কাজে লাগানোর একটা বাজে স্বভাব ছিল তার। তা ছাড়া ডিলের ঘটনাটা…’
‘ডিলের কোন্ ঘটনা?’ হঠাৎ করেই আগ্রহী হয়ে উঠেছি আমি। নাটকের এই স্কুল আর সেই গাড়ি দুর্ঘটনার মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? এবং এই সম্পর্কের ব্যাপারটা কি জানা নেই হোথর্নের? আমিও কি মিস করেছি এটা?
‘ঘটনাটা বলার আগে একটা কথা বলে নিই আপনাকে,’ বলছেন লিয। ‘আমাদের ক্লাসগুলোতে একটা নিয়ম চালু ছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের সবাইকে একটা করে জিনিস নিয়ে আসতে হতো, এবং সেটা নিয়ে কথা বলতে হতো সহপাঠীদের সামনে। তো… একবার প্লাস্টিকের একটা খেলনা নিয়ে এল ড্যামিয়েন… লন্ডনের একটা বাস। তখন একটা নার্সারি রাইমের রেকর্ডিংও বাজিয়ে শুনিয়েছিল সে আমাদেরকে… দ্য হুইলস অন দ্য বাস গো রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড। সে বলেছিল, ওই ছড়া নাকি বাজানো হয়েছিল একটা ছেলের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে… ছেলেটা মারা পড়েছিল বিশেষ সেই গাড়ি-দুর্ঘটনায়। আর গাড়িটা চালাচ্ছিল ওর মা।’
