‘আমিও যাবো আপনার সঙ্গে।’
মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘না। আমার মনে হয় না আপনার যাওয়াটা উচিত হবে। একাই যাবো আমি সেখানে।’
‘কেন?’
প্রশ্নটার জবাব দিল না হোথর্ন।
‘আপনি জানেন কে আগুন লাগিয়েছে নাইজেল ওয়েস্টনের বাড়িতে, তা-ই না?’ চ্যালেঞ্জ জানানোর সুরে বললাম আমি।
আবারও সেই শূন্যতা ফিরে এসেছে হোথর্নের চোখে। এই শূন্যতা সম্পর্কে ভালোমতো জানা আছে আমার। এই শূন্যতা আমাকে সব সময় জানিয়ে দেয়, পৃথিবীকে যেভাবে দেখি আমি, তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিতে দেখে হোথর্ন। আরও জানিয়ে দেয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কখনও কাছাকাছি হতে পারবে না।
‘হ্যাঁ,’ আমার প্রশ্নের জবাবে বলল সে। ‘আপনি।’
২১. রাডা
হোথর্ন কী বোঝাতে চেয়েছে, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই আমার। কিন্তু ওটা নিয়ে যত ভাবছি, তত খারাপ হয়ে যাচ্ছে মনটা। কেউ একজন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে নাইজেল ওয়েস্টনের বাড়িতে… আমি কীভাবে দায়ী হতে পারি ওই হামলার জন্য? এমনকী ওই জায়গায় যাওয়ার আগপর্যন্ত জানতামও না কোথায় থাকেন ওই জাজ। হোথর্ন যখন কথা বলছিল বুড়ো লোকটার সঙ্গে, তখন নিজের মুখ একেবারে বন্ধ করে রেখেছিলাম। এমনকী আমি আর হোথর্ন যে যাবো সেখানে, সে-কথা ও বলিনি কাউকে। না, একটু ভুল হলো বোধহয়… বলেছিলাম… আমার স্ত্রীকে, আমার অ্যাসিস্টেন্টকে, আর সম্ভবত আমার দুই ছেলের কোনো একজনকে। এখন কথা হচ্ছে, হোথর্ন কি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে ওর ঝাল মিটাচ্ছে? সে-রকম কোনো ইচ্ছা যদি থাকে ওর, আশ্চর্য হবো না। খুব সম্ভব এমন কিছু একটা ঘটেছে যা আসলে আশা করেনি সে, আর সেজন্য হাতের কাছে যাকে পাচ্ছে তার সঙ্গেই দুর্ব্যবহার করছে।
আমাদের তদন্তের বর্তমান অবস্থাটা আসলে কী, ভাবতে লাগলাম। যতদূর বুঝতে পারছি, নিজের সন্দেহের তালিকা থেকে অ্যালান গডউইনকে কমবেশি বাদ দিয়ে ফেলেছে হোথর্ন। আবার একইসঙ্গে এ-কথাও সত্যি, ডায়ানা ক্যুপারকে বেকসুর খালাস দিয়ে পুরো ব্যাপারটা ঘোলাটে করে ফেলেছেন নাইজেল ওয়েস্টন, কিন্তু কেউ প্রমাণ করতে পারবে না, ওই কাজ করে কোনো অপরাধ করেছেন তিনি। আর এখন প্রাণঘাতী হামলা হলো তাঁর উপরই। মুশকিল হচ্ছে, আমি যখন ভাবতে শুরু করেছি বিশেষ ওই গাড়ি-দুর্ঘটনার সঙ্গে এখনকার খুন দুটোর কোনো সম্পর্কই নেই, তখনই এমন এক ঘটনা ঘটল, যার ফলে আমার সেই অনুমানের উল্টোটাই সত্যি বলে মনে হচ্ছে।
গাড়িটা চালাচ্ছিলেন ডায়ানা ক্যুপার। সে-গাড়ির নিচে পড়ে মারা গেল টিমোথি গডউইন, গুরুতর আহত হলো ওর ভাই। ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেন তিনি। সবাই জানতে পারল, ছেলে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে বাঁচাতে পালিয়েছিলেন ওই মহিলা। তাঁর নামে মামলা দেয়া হলো, বিচার হলো আদালতে, কিন্তু তাঁকে বেকসুর খালাস দিলেন নাইজেল ওয়েস্টন… নামকাওয়াস্তের কিছু সাজার কথা যদি বাদ দিয়ে বলি। এখন কথা হচ্ছে, ডায়ানা ক্যুপার, ড্যামিয়েন ক্যুপার আর নাইজেল ওয়েস্টন… তাঁদের তিনজনের উপরই কিন্তু হামলা হয়েছে। প্রাণে মারা পড়ল প্রথম দু’জন।
এসব নিশ্চয়ই কাকতালীয় হতে পারে না?
আরও একটা প্রশ্ন চলে আসছে আমাদের সামনে।
আমান্ডা লেই… মানে, যে-মেয়ে ড্যামিয়েন ক্যুপারের সঙ্গে রাডা-তে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, এবং পরে যে-মেয়ে গায়েব হয়ে গিয়েছিল রহস্যজনকভাবে… পুরো ব্যাপারটাতে তার ভূমিকা কী? হতে পারে, আসলে ওই মেয়ের কোনো ভূমিকাই নেই। গ্রেস লোভেলদের বাসা থেকে বের হয়ে আমি আমার আইফোনে আমান্ডা- লেইকে-নিয়ে-লেখা একটা আর্টিকেল বের করেছিলাম এবং সেটা দেখিয়েছিলাম হোথর্নকে। কিন্তু ওই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি সে। কাজেই আমি আসলে এখনও নিশ্চিত হতে পারছি না, পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে রহস্যময়ী সেই অভিনেত্রীর কোনো যোগসূত্র আছে কি না।
হঠাৎ করেই টের পেলাম, প্রচণ্ড বিরক্ত লাগছে নিজের উপরই।
এখন মাঝবিকেল, হাউনস্লো ইস্ট টিউব স্টেশনের পাশে সস্তা কিন্তু চটকদার একটা ক্যাফেতে একা বসে আছি। হোথর্ন চলে যাওয়ার পর এখানে এসে ঢুকেছি। টিউব ট্রেনে চেপে চলে গেছে সে। আমার চারদিকে এখন আয়না এবং চকচকে সব মেন্যুর রাজত্ব। একদিকের দেয়ালে একটা ওয়াইড স্ক্রীন টিভি লাগানো আছে, ওটাতে একটা অ্যান্টিক শো চলছে। দুই পিস টোস্ট আর এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়েছি। কিন্তু আসলে এসব খেতে চাইনি। আপনমনে নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে আমার? হোথর্নের সঙ্গে যখন প্রথমবার দেখা হলো, আমি ততদিনে একজন সফল ও প্রতিষ্ঠিত লেখক। এমনকী একটা টিভি শো’র ক্রিয়েটর… সেই শো কম করে হলেও পঞ্চাশটা দেশে দেখানো হয়েছে। শুধু তা-ই না, সেই শো’র প্রোডিউসারকে বিয়েও করেছি। আমাদের হয়ে তখন কাজ করত হোথর্ন। ঘণ্টাপ্রতি দশ কি বিশ পাউন্ড করে দেয়া হতো ওকে… বিনিময়ে কিছু তথ্য সরবরাহ করত সে, আর সেসব তথ্য আমার চিত্রনাট্যে ব্যবহার করতাম আমি।
কিন্তু গত দু’সপ্তাহের মধ্যে বদলে গেছে সব কিছু। আমাকে একজন মৌন সহযোগীতে পরিণত করে ফেলেছে হোথর্ন। আমি আমার নিজের বইয়েই পরিণত হয়েছি গৌণ একটা চরিত্রে। তার চেয়েও খারাপ কথা, কী ঘটছে, সেটা হোথর্ন বলে না-দেয়া পর্যন্ত এই কেসের কোনো একটা ক্লু নিয়ে কাজ করার স্বাধীনতা নেই আমার। সে কি আমাকে বোকা ভাবে? কিন্তু আমি আসলে যথেষ্ট চালাক।
