নিচের দিকে তাকাল গ্রেস। বিষাদ দেখতে পাচ্ছি তার চোখে।
‘কিন্তু সব কিছু ঠিক হয়নি শেষপর্যন্ত। দোষ আসলে আমার। চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলস ভালো লাগেনি। কারণটা হলো, ওটা আসলে কোনো শহরই না। সেখানে যদি কোথাও যেতে চান আপনি, গাড়িতে চড়তে হবে, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই সেখানে। মানে… সারি সারি দোকান আছে, রেস্টুরেন্ট আছে, সমুদ্রসৈকত আছে, তারপরও কেমন যেন খালি-খালি লাগে সব কিছু। আর সেখানে গরমও অনেক বেশি… বিশেষ করে আমি যখন প্রেগন্যান্ট ছিলাম, তখন। একসময় খেয়াল করতে শুরু করলাম, বাইরে যতটা না যাচ্ছি, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় একা-একা কাটিয়ে দিচ্ছি আমাদের সেই বাসায়। একটু আগে বলেছি, ড্যামিয়েন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ওর বন্ধুদের সঙ্গে, কিন্তু আসলে অত বেশি বন্ধু ছিল না ওর। আর ওরা সব সময় ওদের কাজ নিয়েই গল্পগুজব করত। ফলে আমার অবস্থা হলো দলছুটের মতো। তখন মনে হতো লাগল, মা আর বাবাকে মিস করছি অনেক। মনে হতে লাগল, মিস করছি লন্ডনকে, আমার ক্যারিয়ারকে।
‘ড্যামিয়েনের সঙ্গে আমার কখনও ঝগড়াঝাঁটি হতো না। তারপরও সুখী ছিলাম না আমরা। কারণ আমার মনে হতো, রাডা-য় যে-ড্যামিয়েনকে চিনেছিলাম, আসলে সে-রকম ছিল না সে। মনে হতো, বদলে গেছে অনেকখানি। হতে পারে, বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল সে… আর সেজন্যই ও-রকম মনে হতো আমার। কখনও কখনও আমার মনে হতো, আমার সঙ্গে অভিনয় করছে লোকটা। বিখ্যাত যেসব ব্যক্তির কথা শোনাত আমাকে, তাঁদের কথা শুনে মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতাম… একেকজন কোত্থেকে কোথায় চলে গেল, আর আমি কিনা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছি বাসায়! অস্বীকার করছি না, মা হতে চেয়েছিলাম আমি, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছুও হতে চেয়েছিলাম।
‘যা-হোক, একসময় জন্ম নিল অ্যাশলিই। ব্যাপারটা জাদুকরী কিছু-একটা ছিল আমাদের জন্য। ওই উপলক্ষে বেশ বড় একটা পার্টি দিল ড্যামিয়েন। আমি বলবো, একজন গর্বিত পিতা ছিল সে। কিন্তু তারপর টের পেলাম, আস্তে আস্তে দূরে… আরও দূরে সরে যাচ্ছে সে যেন। আমি যখন বাসায় বসে অ্যাশলিইকে দুধ খাওয়াচ্ছি, অথবা ওর ন্যাপি বা ডায়াপার বদল করছি, তখন পার্টি, প্রিমিয়ার, দামি- দামি দ্রুত গতির গাড়ি আর নিত্য নতুন নারী মডেল যেন ভরিয়ে তুলছে ড্যামিয়েনের জীবনটা। এত টাকা কামাই করত সে, তারপরও কখনও কখনও আমাদের মালির বেতন আর মুদি দোকানের বিল দেয়ার মতো টাকা থাকত না আমার হাতে।’
‘ড্রাগসের ব্যাপারটা বলছ না কেন এঁদেরকে?’ বললেন মার্টিন লোভেল।
‘কোকেইন এবং হাবিজাবি আরও কিছু খেত ড্যামিয়েন। তবে সেটা বিশেষ কিছু না… হলিউডের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীই খায় ওসব। শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে পার্টিতে যাওয়া ছেড়ে দিলাম আমি। কখনও ড্রাগস খাইনি, ওসব ভালো লাগত না আমার। আমার গায়ে কখনও হাত তোলেনি ড্যামিয়েন। খারাপ মানুষ ছিল না সে। কিন্তু সে আসলে…’
‘স্বার্থপর একটা মানুষ ছিল,’ বাক্যটা শেষ করে দিলেন মার্টিন লোভেল।
‘বরং আমি বলবো সফল একজন মানুষ ছিল সে,’ দ্বিমত পোষণ করল গ্রেস। ‘আর ওর সেই সফলতাই গিলে খেয়েছিল ওকে।’
শূন্য দৃষ্টিতে গ্রেসের দিকে তাকিয়ে আছে হোথর্ন। ‘তার মানে… ড্যামিয়েন যে খুন হয়েছেন… তাঁর খুন হওয়ার জন্য এরচেয়ে ভালো সময় আর ছিল না?’
‘আপনার কথা বুঝতে পারছি না আমি,’ কিছুটা হলেও রেগে গেছে গ্রেস। ‘ও- রকম কিছু বলিনি আমি, বলবোও না কখনও। ড্যামিয়েন ছিল অ্যাশলিইয়ের বাবা। মেয়েটা বড় হয়ে উঠবে একসময়, অথচ বাবার অভাবটা সব সময় রয়ে যাবে ওর ভিতরে।’
‘ড্যামিয়েন কি কোনো উইল রেখে গেছেন?’
একটুখানি যেন থতমত খেয়ে গেল গ্রেস। ‘হ্যাঁ।’
‘সেটা কী, জানেন আপনি?’
‘হ্যাঁ। ড্যামিয়েনের উকিল চার্লস কেনওয়ার্দি উপস্থিত ছিলেন শেষকৃত্যানুষ্ঠানে, তাঁকে তখন জিজ্ঞেস করেছি ওই উইলের ব্যাপারে। আসলে অ্যাশলিইয়ের খাতিরে নিজেদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে জানাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল।’
‘তা… কী জানতে পেরেছেন?’
‘জানতে পেরেছি, চিন্তা করার কোনো কারণ নেই আমার। নিজের সব কিছু আমাকে আর অ্যাশলিইকে দিয়ে গেছে ড্যামিয়েন।’
‘একটা জীবনবীমা ছিল তাঁর।’
‘ওই ব্যাপারে কিছু জানি না আমি।’
‘কিন্তু আমি জানি,’ পায়ের উপর পা তুলে বসেছে হোথর্ন, দুই হাত ভাঁজ করে রেখেছে বুকের উপর। ওকে দেখে এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিশ্চিন্ত মানুষ বলে মনে হচ্ছে। একইসঙ্গে সবচেয়ে পাষাণহৃদয়ও মনে হচ্ছে। কালো চোখ জোড়া যেন স্থির হয়ে আছে গ্রেসের উপর… যেন দৃষ্টি দিয়েই গেঁথে ফেলতে চাইছে মেয়েটাকে। ‘মাস ছয়েক আগে একটা পলিসি নিয়েছিলেন ড্যামিয়েন। এবং সেটার ফলে প্রায় এক মিলিয়ন পাউন্ড পেতে যাচ্ছেন আপনি। ব্রিক লেনের ওই ফ্ল্যাট, হলিউড হিলসের সেই বাড়ি, আর আলফা রোমিও স্পাইডারটার কথা না-হয় বাদই দিলাম…
‘কী বলতে চাইছেন আপনি, মিস্টার হোথর্ন?’ দাবি জানানোর সুরে বলে উঠলেন মার্টিন লোভেল। ‘আপনার কি ধারণা আমার মেয়ে খুন করেছে ড্যামিয়েনকে?
‘কেন নয়?’ গ্রেসের দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘ড্যামিয়েনের মা যেদিন খুন হলেন, তার আগের দিন ইংল্যান্ডে এসেছেন আপনি। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে কি দেখা হয়েছিল আপনার?
