‘করার মতো কিছু ছিল না ওর,’ একটু আগে যা বলেছেন গডউইন, সে-কথারই পুনরাবৃত্তি করল মেরি। মড়ার মতো চেহারা হয়েছে তার। দুই গালে এখনও লেগে আছে অশ্রুর দাগ।
হোথর্ন বলল, ‘এত বছর ধরে গডউইন পরিবারের সঙ্গে কেন আছেন, সেটা বোধহয় মোটামুটি বুঝতে পারছি আমি, মেরি। যা ঘটেছিল ডিলে, সে-দায় থেকে নিজেকে মুক্তি দিতে পারেননি আপনি আসলে। নাকি… অ্যালানের সঙ্গে এখনও অবাধ যৌনাচার চলছে আপনার?’
‘ঈশ্বরের দোহাই লাগে!’ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে গডউইনের চেহারা। ‘ওসব অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছি আমরা। জেরেমির জন্য রয়ে গেছে মেরি। শুধু জেরেমির জন্য।’
‘হ্যাঁ। আর জেরেমিও আছে মেরির জন্য। ওদের একজনকে আসলে বানানো হয়েছে আরেকজনের জন্য।’
‘আমাদের কাছে কী চান আপনি?’ জিজ্ঞেস করলেন গডউইন। ‘আপনার কি মনে হয় না সেদিন যা ঘটেছে, তার জন্য ইতোমধ্যেই যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছি আমরা?’ একটা মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করলেন তিনি। তারপর বলে চললেন, ‘পুরো ব্যাপারটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু না। আমি যদি ওই মুহূর্তে বেরিয়ে না- আসতাম ওই দোকান থেকে, তখন যদি আমাকে না-দেখত বাচ্চা দুটো…। আপনি কি এখন সব কথা বলে দেবেন জুডিথকে?’
‘না, তাঁকে কিছুই বলবো না আমি। ব্যাপারটা আমার না।
‘তা হলে আমাদের দু’জনকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?’
‘কারণ আপনাদের ব্যাপারে যা অনুমান করেছিলাম আমি, সেটা ঠিক কি না, জানার দরকার ছিল আমার।’
উঠে দাঁড়ালেন অ্যালান গডউইন। একই কাজ করল মেরি ও’ব্রায়ানও। দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন অ্যালান। তাঁর পিছু নিয়েছে মেয়েটা।
বেরিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে ঘুরলেন গডউইন। ‘আপনি একজন চালাক মানুষ, মিস্টার হোথর্ন। কিন্তু এতগুলো বছর আমাদের উপর দিয়ে কী গেছে, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই আপনার। কারণ আবেগ বলে কিছু নেই আপনার। ভয়ঙ্কর একটা ভুল করে ফেলেছিলাম আমরা, এবং সে-ভুলের দায় মাথায় নিয়ে প্রতিটা দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে আমাদেরকে। তারপরও বলবো, আমরা কিন্তু দানব না। আমরা অপরাধী না। আমরা একজন আরেকজনকে ভালোবেসেছিলাম।’
হোথর্নকে দেখে মনে হচ্ছে না, গডউইনের ওসব কথা বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তার করেছে ওর মনে। আরও বেশি পাণ্ডুর দেখাচ্ছে ওকে। আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিশোধপরায়ণ দেখাচ্ছে ওর দুই চোখ।
বলল, ‘কীসের ভালোবাসা? আপনারা আসলে সেক্স করতে চেয়েছিলেন। এবং আপনি জেনেবুঝে ধোঁকা দিচ্ছিলেন আপনার স্ত্রীকে। আর সে-কারণেই মারা গেছে আপনার একটা ছেলে।’
তীব্র বিতৃষ্ণার দৃষ্টিতে হোথর্নের দিকে তাকিয়ে আছেন গডউইন। মেরি ইতোমধ্যেই বেরিয়ে গেছে দরজা দিয়ে। ঘুরলেন গডউইন, অনুসরণ করলেন মেয়েটাকে।
এখন ঘরের ভিতরে শুধু আমি আর হোথৰ্ন।
‘ওই দু’জনের সঙ্গে কি এতটা কঠোর হওয়ার দরকার ছিল?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘কেন, ওদের জন্য কি খারাপ লাগছে আপনার?’
‘জানি না… সম্ভবত। অ্যালান গডউইন খুন করেননি ডায়ানা ক্যুপারকে।’
‘ঠিক। ওই দুর্ঘটনার জন্য তিনি দায়ী করেন না মিসেস ক্যুপারকে। বরং তিনি দায়ী করেন নিজেকেই। কাজেই মিসেস ক্যুপারকে খুন করার কোনো কারণই নেই তাঁর।’
‘কিন্তু গাড়িটা যে চালাচ্ছিল তখন…’
‘ড্যামিয়েন, তার মা, অথবা তাদের কোনো প্রতিবেশী… গাড়িটা কে চালাচ্ছিল ওই সময়ে, তাতে কিছু যায়-আসে না।
ঘরের বাতাসে যেন ঝুলে আছে সিগারেটের ধোঁয়া। এই ঘটনার ব্যাখ্যা পরে আমার স্ত্রীর কাছে দিতে হবে আমাকে। আমি এখনও বসে আছি পিয়ানো টুলটার উপর। হত্যাকাণ্ড দুটোর ব্যাপারে যে-এক নম্বর থিউরি দাঁড় করিয়েছিলাম, সেটা বিধ্বস্ত হয়েছে এইমাত্র।
বললাম, ‘অ্যালান গডউইন যদি খুনি না-হবে, তা হলে কে খুন করেছে মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে?’
‘গ্রেস লোভেল,’ বলল হোথ
চমকে উঠলাম আমি।
কিন্তু হোথর্নের পরের কথায় কেটে গেল আমার সে-চমক।
‘আগামীকাল গ্রেস লোভেলের সঙ্গে দেখা করতে যাবো আমরা।’
২০. একজন অভিনেত্রীর জীবন
ব্রিক লেনের সেই ফ্ল্যাটে আর ফিরে আসেনি গ্রেস লোভেল এবং সেজন্য তাকে দোষও দিচ্ছি না আমি। সেখানে যে-পরিমাণ রক্তপাত হয়েছে, সেসব মুছে ফেলতে অনেক সময় লাগবে। হিংসাত্মক যে-ঘটনা ঘটেছে সেখানে, সেটা মুছে ফেলতে সময় লাগবে আরও বেশি।
আপাতত হাউনস্লো-তে, নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে, অ্যাশলিইকে নিয়ে থাকছে লোভেল। জায়গাটা হিথ্রো এয়ারপোর্টের কাছে। ওই বিমানবন্দরে সিনিয়র কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন লোভেলের বাবা। তাঁর নাম মার্টিন লোভেল। আজ ছুটি নিয়েছেন তিনি। ভদ্রলোক বিশালদেহী, তাঁকে দেখলেই ভয় লাগে মনে। যে-পোলো শার্ট পরে আছেন, সেটা তাঁর শরীরে কেমন ছোট হয়ে গেছে। সে-শার্টের হাতা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আছে কসাইদের-হাতের মতো শক্তিশালী দুটো বাহু। মাথা কামিয়ে রেখেছেন তিনি, ফলে তাঁর বয়স অনুমান করা মুশকিল। তবে আপাতত ধারণা করে নিলাম ষাটের কাছাকাছি হবে। তাঁর সঙ্গে আদৌ কোনো মিল নেই গ্রেসের। অ্যাশলিইকে কোলে নিয়েছেন তিনি, এবং আমার ধারণা কী করছেন তিনি সে-ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক আছেন। কারণ তিনি যদি তা না- থাকেন, তা হলে তাঁর সেই ভালুকের মতো আলিঙ্গনে হয়তো দম আটকে যেতে পারে ছোট্ট মেয়েটার। দুনিয়ার কোথায় কী হচ্ছে না-হচ্ছে সে-ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই ওই মেয়ের, ডুবে আছে একটা র্যাগ বুকের পাতায়
