‘হোটেল থেকে আমাদেরকে বলা হয়েছে, ওই ফ্যামিলি রুম থেকে নাকি সাগর দেখা যায় না।’
‘সাগর দেখা যাওয়া না-যাওয়ার সঙ্গে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই আসলে। …মেরি, আসল ঘটনাটা আপনিই বলে দিচ্ছেন না কেন টনিকে?’
আমার দিকে তাকাল না মেরি। যখন কথা বলল, আমার মনে হলো কোনো মানুষ না, একটা রোবট কথা বলছে যেন। ‘ডিলে… দেখা করার কথা ছিল আমাদের দু’জনের। একসঙ্গে… থাকার কথা ছিল।
‘ঠিক,’ ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল হোথর্নের কণ্ঠে। ‘পুরনো সেই প্রেমকাহিনি … আয়া এবং তার নিয়োগকর্তা। কিন্তু হ্যাঁরো-অন-দ্য-হিলে এসব করার উপায় ছিল না আপনাদের, তাই না? কাজেই আপনারা করলেন কী… চুরি করে একটা উইকএন্ড ম্যানেজ করলেন নিজেদের জন্য, তা-ও আবার সমুদ্রতীরবর্তী কোনো শহরে। ভালোমতোই জানা ছিল আপনাদের, বাচ্চা দুটো ছ’টার মধ্যে শুয়ে পড়ে বিছানায়। অর্থাৎ একসঙ্গে থাকার জন্য সারাটা রাত ছিল আপনাদের হাতে।’
‘আপনি আসলে বিরক্তিকর একটা মানুষ,’ বলে উঠলেন গডউইন। ‘নোংরা সব কথাবার্তা বলছেন।’
‘কেন, নোংরা কোনো কিছু কি করেননি আপনারা?’ ধোঁয়া ছাড়ল হোথর্ন। ‘সেদিন সেই ওষুধের দোকানে একজন রহস্যমানবের আবির্ভাব ঘটেছিল… আপনিই সে-লোক। কী করছিলেন আপনি সেখানে, বলুন তো? যদি বলি, ডায়ানা ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময় যে-কারণে কাঁদছিলেন, ঠিক একই কারণে সেদিন গিয়েছিলেন ওই দোকানে, তা হলে কি ভুল হবে?’
খুব মনমরা দেখাচ্ছে গডউইনকে… কেন, ভাবলাম আমি।
‘আসলে আপনার হে ফিভার (hay fever) আছে। এটা একজাতের অ্যালার্জি… ফুলের রেণু বা ধূলিকণার কারণে হয়। এই অসুখ যাদের আছে, তাদের চোখ আর নাকের মিউকাস মেমব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, ফলে চোখ আর নাক দিয়ে সমানে পানি পড়তে থাকে… দেখলে মনে হয় কাঁদছে তারা।’ আমার দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘ব্রম্পটন সেমেট্রিতে যখন ছিলাম আমরা, প্লেন ট্রি-গুলো লক্ষ করেছিলেন?’
‘হ্যাঁ। এবং ওই ব্যাপারে নোটও নিয়েছি আমি। মিসেস ক্যুপারের কবরের ঠিক পাশেই ছিল ওই গাছগুলো।
‘আপনার যদি হে ফিভার থাকে, তা হলে প্লেন ট্রি আপনার জন্য সাংঘাতিক খারাপ। কারণ ওসব গাছের পরাগরেণু সরাসরি চলে আসতে পারে আপনার নাকে। …এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের দুটো বহুল-পরিচিত উপায় কি আপনাকে বলে দিতে হবে?’
‘মধু,’ বললাম আমি। ‘আর আদা চা।’
‘এবং ঠিক ওগুলোই ওই ফার্মেসি থেকে কিনেছিলেন অ্যালান সেদিন।’ গডউইনের দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘তখন রোদ ঝলমল করছিল না, অথচ সানগ্লাস পরে ছিলেন আপনি। আসলে চাননি কেউ চিনে ফেলুক আপনাকে। আপনার বান্ধবীর সঙ্গে প্রেম করার জন্য ডিলে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু তখন, যে- কোনো কারণেই হোক, হে ফিভারে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। আর তাই সাহায্যের জন্য ওই ওষুধের-দোকানে যেতে হয় আপনাকে। কিছু হার্বাল সামগ্রী কেনার পর ওই দোকান থেকে বেরিয়ে আসেন, আর তখনই ঘটে দুর্ঘটনাটা।
‘আপনার কারণেই ঘটেছিল মর্মান্তিক ওই ঘটনা। আপনার দুই ছেলে তখন ছিল সৈকতসংলগ্ন প্রমেনেডে। কখনও যাতে দৌড়ে রাস্তা পার না-হয়, সেটা বলে দেয়া হয়েছিল ওদেরকে। ওরাও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, আইসক্রিমের দোকানটা বন্ধ। কিন্তু হঠাৎ করেই ওদের চোখের সামনে হাজির হলো ওদের বাবা… হেঁটে বের হলো সেই ওষুধের দোকানটা থেকে। আপনি তখন ক্যাপ আর সানগ্লাস পরে ছিলেন, তারপরও আপনাকে চিনে নিতে কষ্ট হয়নি বাচ্চা দুটোর। খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল ওরা, ছুট লাগাল আপনার উদ্দেশে। আর ঠিক সে-মুহূর্তেই রাস্তার কোনা ঘুরে বেরিয়ে এল ডায়ানা ক্যুপারের গাড়িটা। এবং মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনাও ঘটল আপনার চোখের সামনেই। আপনার দুটো বাচ্চাই চাপা পড়ল গাড়ির নিচে।’
গুঙিয়ে উঠলেন গডউইন। দুই হাতে চেপে ধরলেন মাথা। নিঃশব্দে ফোঁপাচ্ছে মেরি।
‘টিমোথি মারা গেল,’ বলে চলল হোথর্ন, ‘ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল জেরেমি, ‘বাবা, বাবা’ বলে ডাকতে লাগল সে, কারণ কিছুক্ষণ আগে আপনাকে দেখেছিল। অ্যালান, ওই মুহূর্তে আপনার মনের ভিতরে ঠিক কী চলছিল, কল্পনাও করতে পারি না আমি। কারণ আপনি তখন চোখের সামনে দেখেছেন, আপনার দুই ছেলেকে চাপা দিয়ে চলে গেছে একটা গাড়ি। অথচ বাচ্চা দুটোর কাছে যেতে পারছেন না, কারণ তা হলে ফাঁস হয়ে যাবে আপনি আসলে ম্যানচেস্টারে যাননি। বাচ্চা দুটোর কাছে যেতে পারেননি আপনি, কারণ যদি যেতেন তা হলে ডিলে কী করছিলেন সে- ব্যাপারে কী ব্যাখ্যা দিতেন আপনার স্ত্রীর কাছে?’
ওরা যে গুরুতরভাবে আহত হয়েছে, সেটা বুঝতে পারিনি আমি তখন,’ কর্কশ হয়ে গেছে গডউইনের কণ্ঠ। ‘ওদের জন্য আমার কিছু করারও ছিল না আসলে…
বিশ্রী একটা গালি দিল হোথর্ন। ‘কিছু করার ছিল না আপনার, না? দৌড়ে হাজির হতে পারতেন আপনি আপনার ছেলেদের কাছে। টিমোথির জন্য হয়তো কিছু করার ছিল না, কিন্তু জেরেমির জন্য তো কিছু করতে পারতেন? আসলে আপনার মাথায় তখন খেলা করছিল নিজেকে লুকিয়ে ফেলার ব্যাপারটা, আর তাই সুযোগ পাওয়ামাত্র সটকে পড়েছিলেন।’ অ্যাশট্রেতে পিষে নেভাল সিগারেটটা, গনগন করে উঠল ছাই। ‘আসলে ওই মুহূর্তে মেরির সঙ্গে একরকমের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন আপনি। কোনো কথাই হয়নি আপনাদের মধ্যে, শুধু ইশারায় সম্পাদিত হয়েছিল ওই চুক্তি। কীভাবে বুঝলাম? ট্রাভের্টন বলেছেন, মেরি নাকি তাকিয়ে ছিলেন তাঁর দিকে। ভুল বলেছেন তিনি। মেরি আসলে তাকিয়ে ছিলেন আপনার দিকে। কারণ আপনি দাঁড়িয়ে ছিলেন ট্রাভের্টনের ঠিক পাশে।’ মেরির দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘আপনি ইশারায় চলে যেতে বলেছিলেন অ্যালানকে, ঠিক না?’
