গডউইন আর মেরি… দু’জনকেই কেমন অপরাধীর মতো দেখাচ্ছে। একইসঙ্গে মনে হচ্ছে, তাঁরা রেগে গেছেন… ভয়ও পেয়েছেন।
উঠে দাঁড়ালেন গডউইন। ‘এখানে আর থাকছি না আমি। মিস্টার হোথর্ন, আপনি যে-খেলায় মেতেছেন, সেটা নিয়ে কোনো পরোয়া নেই আমার। ওই খেলায় অংশ নিতে আমি রাজি না।’
‘খুব ভালো কথা, অ্যালান। কিন্তু আপনি যদি এই ঘর থেকে বেরিয়ে যান, পুলিশ জেনে যাবে সব কথা। এবং তারপর আপনার স্ত্রীও জানতে পারবেন।’
বরফের মতো জমে গেলেন গডউইন। মেরিও নড়ছে না।
ঘরের ভিতরের পুরো পরিস্থিতি এখন হোথর্নের নিয়ন্ত্রণে।
‘বসে পড়ুন,’ বলল সে। ‘গত দশ বছর ধরে আপনারা দু’জন গোপনে আঁতাত করছেন, এবং মিথ্যা কথা বলছেন সবার কাছে। কিন্তু আজ সেই খেল খতম। আর সে-কারণেই আপনাদেরকে ডেকে আনা হয়েছে এখানে।’
আবারও বসে পড়লেন গডউইন। গিয়ে তাঁর পাশে বসে পড়ল মেরি, তবে দূরত্ব বজায় রেখেছে।
খেয়াল করলাম, মেয়েটা বসামাত্র, গডউইন নিঃশব্দে বলে উঠলেন, ‘আমি দুঃখিত।’ তাঁর ঠোঁট নাড়ানোর ভঙ্গি দেখে বুঝে ফেললাম কথাটা। এবং এ-ও বুঝতে পারলাম, গডউইন আর মেরি আসলে প্রেমিক-প্রেমিকা। আরও বুঝতে পারলাম, এই ব্যাপারটা সন্দেহ করেছিলেন জুডিথ গডউইন। আর সে-কারণেই মন কষাকষি হয়েছিল ওই দুই মেয়েমানুষের মধ্যে।
পিয়ানো স্টুলটার উপর বসে পড়লাম আমি। এখন ঘরের ভিতরে কেবল হোথৰ্নই দাঁড়িয়ে আছে!
‘ডিলে যা ঘটেছিল,’ শুরু করল সে, ‘তা খতিয়ে দেখা দরকার আমাদের। কারণ পুরো কাহিনি কম করে হলেও ছ’বার শুনেছি আমি। কিন্তু আপনারা দু’জন যা বলেছেন ওই ব্যাপারে, তা মিথ্যা ছাড়া আর কিছু না। যা-হোক, এখন আপনারা ফেঁসে গেছেন, এবং এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই আপনাদের। আমার খারাপ লাগা উচিত ছিল আপনাদের জন্য, কিন্তু লাগছে না।
সিগারেটের প্যাকেট বের করল সে পকেট থেকে, একটা ধরাল। কিচেনে গিয়ে ঢুকলাম আমি, একটা অ্যাশট্রে নিয়ে এলাম। ওটা রাখলাম টেবিলের উপর যাতে ব্যবহার করতে পারে।
‘এই লীলাখেলা কবে থেকে শুরু করলেন আপনারা?’ জিজ্ঞেস করল হোথর্ন। নীরবতা।
কাঁদতে শুরু করেছে মেরি।
হাত বাড়িয়ে দিয়ে ওই মেয়ের একটা হাত ধরতে চাইলেন অ্যালান গডউইন, কিন্তু টান মেরে হাতটা সরিয়ে নিল সে।
গডউইন বুঝে গেছেন, আর ভান করে কোনো লাভ নেই। হোথর্নের প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘মেরি আমাদের ওখানে কাজ শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই। আসলে… আমিই শুরু করেছিলাম এসব। সম্পূর্ণ দায় নিজের উপর নিচ্ছি আমি।’
‘সব শেষ হয়ে গেছে এখন,’ নিচু গলায় বলল মেরি। ‘অনেকদিন হলো সব কিছু শেষ হয়ে গেছে আমাদের মধ্যে।
‘সত্যি বলতে কী,’ মুখ খুলল হোথর্ন, ‘আপনাদের মাঝখানের এই অনৈতিক সম্পর্কের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই আমার। আমি শুধু সত্যি কথাটা জানতে চাই। …ডায়ানা ক্যুপার হয়তো ভুলে তাঁর চশমা ফেলে এসেছিলেন, কিন্তু বাচ্চা দুটো দৌড়ে রাস্তা পার হতে চেয়েছিল আপনাদের দু’জনের কারণেই। বলুন, ঠিক না?’
মাথা ঝাঁকাল মেরি। তার গাল বেয়ে অশ্রু নামছে।
আমার দিকে তাকাল হোথর্ন। ‘একটা সত্যি কথা বলি আপনাকে, টনি আপনাকে নিয়ে যখন ডিলে গেলাম, অনেক কিছুই আমার বোধগম্য হচ্ছিল না। যেমন, বাচ্চা দুটো ওই আইসক্রিমের দোকানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তা পার হওয়ার জন্য ছুট লাগিয়েছিল। কিন্তু দোকানটা তখন ছিল বন্ধ। শুধু তা-ই না, পানিতে ভেসে গিয়েছিল সেটা, ইলেকট্রিক লাইনেও সমস্যা হয়েছিল। তার মানে দোকানের ভিতরে তখন ছিল অন্ধকার। আমি জানি বাচ্চা দুটোর বয়স তখন মাত্র আট বছর। তারপরও… কোনো দোকান বন্ধ নাকি খোলা, সেখানে গেলে আইসক্রিম পাওয়া যাবে কি যাবে না… এসব বুঝবার মতো বুদ্ধি নিশ্চয়ই ছিল তাদের? তারপরও তারা দৌড় দিল, এবং গিয়ে পড়ল মিসেস ক্যুপারের গাড়ির নিচে। একজন মারা গেল সেখানেই। আরেকজন পড়ে থাকল গুরুতর আহত অবস্থায়। এবার ওষুধের দোকানের মিস্টার ট্রাভের্টনের কথা অনুযায়ী, বেঁচে থাকা বাচ্চাটা ওর বাবাকে ডাকতে লাগল। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, ও-রকম অবস্থায় কোনো বাচ্চাই ওই কাজ করবে না। কোনো বাচ্চা যখন আহত হয়, সে তার মাকে চায়… সে তার মাকে ডাকে। কাজেই, ঠিক কী হচ্ছিল তখন সেখানে?’
একটুখানি থামল সে।
কেউ কিছু বলছে না।
আমার মনে হচ্ছে, পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছে হোথর্ন। মনে হচ্ছে, এই ফ্ল্যাট শুধু আমারই না, ওরও। অস্বীকার করার উপায় নেই, চুম্বকের মতো কোনো একজাতের ব্যক্তিত্ব আছে হোথর্নের। এবং এ-কথাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, চুম্বক শুধু আকর্ষণই করে না, বিকর্ষণও করে।
‘চলুন একেবারে শুরুতে ফিরে যাই,’ বলছে সে। ‘বাচ্চা দুটোকে ডিলে নিয়ে গেলেন মেরি। তাদের মায়ের একটা কনফারেন্স ছিল। আর বাবা একটা বিযনেস ট্রিপে গিয়েছিলেন ম্যানচেস্টারে। ছেলে দুটোকে নিয়ে রয়্যাল হোটেলে উঠলেন মেরি। একটা ফ্যামিলি রুম বরাদ্দ দেয়া হলো তাঁদেরকে, কিন্তু সেটা পছন্দ হলো না তাঁর। তিনি বাচ্চা দুটোর জন্য চেয়েছিলেন একটা টুইন রুম। আর নিজের জন্য চেয়েছিলেন একটা ডাবল রুম। এবার, টনি, আপনিই বলুন, ও-রকম কেন চাইলেন মেরি?’
