‘তাঁর সদর-দরজার নিচ দিয়ে একটা নোট ঠেলে দিয়েছিলাম আমি ভিতরে। সত্যি বলতে কী, ব্রিটানিয়া রোডের সবগুলো বাসার সদর-দরজার নিচ দিয়েই একটা করে নোট ঠেলে দিয়েছিলাম। ওসব বাড়ির বাসিন্দাদের কেউ দেখতে পেয়েছিল কি না বিড়ালটাকে, সেটাই জানতে চেয়েছিলাম আসলে।’
‘কেন?’
‘মিস্টার টিবসের কারণেই সব কিছু ঘটেছে, টনি। মিস্টার টিবস যদি হারিয়ে না-যেত, তা হলে খুন হতেন না মিসেস ক্যুপার। খুন করা হতো না তাঁর ছেলেকেও।’
আমি নিশ্চিত, মশকরা করছে হোথর্ন। অথচ ওকে দেখে তা মনে হচ্ছে না। আমার সামনেই বসে আছে সে; আক্রোশ আর আত্মকেন্দ্রিকতার যে-অদ্ভুত শক্তিমত্তা দেখা যায় ওর ভিতরে, দেখতে পাচ্ছি সেটা… সে-শক্তির কারণে ওকে ঠিক বুঝে উঠতে পারি না বেশিরভাগ সময়। এইমাত্র যা বলেছে সে, সে-ব্যাপারে ওকে চ্যালেঞ্জ জানানোর আগেই দ্বিতীয়বারের মতো বেজে উঠল ডোরবেলটা।
‘দরজা খুলবো?’ জিজ্ঞেস করলাম।
হাত নাড়ল হোথর্ন। ‘এই বাসা আপনার।’
এগিয়ে গিয়ে তুলে নিলাম ইন্টারকম টেলিফোনটা। ‘হ্যাঁ, বলুন?’
‘আমি অ্যালান গডউইন।’
উত্তেজনার উত্তাল একটা তরঙ্গ যেন টের পেলাম নিজের ভিতরে। উপরে আসতে বললাম আমার প্রথম অতিথিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হয়ে গেলেন গডউইন। কাপড়ের উপরে একটা রেইনকোট পরেছেন, সেটা তাঁর শরীরের তুলনায় বেশ বড় দেখাচ্ছে। মনে পড়ে গেল, এই কোট তিনি মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যের দিনও পরেছিলেন। এমন এক ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলেন, দেখে মনে হলো, ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কোনো আসামি।
আমি প্রায় নিশ্চিত, ক্যান্টেব্রিতে যাওয়ার পথে হোথর্ন আমাকে যা-ই বলে থাকুক না কেন, সে আজ এখানে গডউইনকে ডেকে এনেছে একটা মাত্র কারণে… সে-ও আমার মতোই ভাবছে, গডউইনই খুনি। এবং কথাটা আজ সরাসরি বলবে সে। আজ নিজের সব গোপন কথা প্রকাশ করবে আমার সামনে। মনে পড়ে গেল, আরও একজনের আসার কথা আছে। তার মানে… খুনের কাজে কি কোনো সহযোগী ছিল গডউইনের?
‘কী চান আপনি?’ জিজ্ঞেস করলেন গডউইন, সোজা এগিয়ে গেছেন হোথর্নের দিকে। ‘বলেছেন, আমাকে বলার মতো নাকি কিছু কথা আছে আপনার। সেসব কথা ফোনে কেন বলতে পারলেন না?’ এদিক-ওদিক তাকালেন তিনি, চারপাশটা দেখে নিলেন একনজর। ‘আপনি কি এখানেই থাকেন?’
‘না,’ ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিল হোথর্ন। ‘তিনি থাকেন।’
গডউইন বোধহয় বুঝতে পারলেন, আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরও আমার ব্যাপারে কিছুই জানেন না তিনি। ‘আপনি কে?’ দাবি জানানোর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন। ‘নিজের নামটা আমাকে বলেননি কখনও।’
সৌভাগ্যক্রমে ডোরবেলটা বেজে উঠল আবারও, জবাব দেয়ার জন্য দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম।
কিন্তু এবার ইন্টারকমের ও-প্রান্তে নীরবতা।
‘আপনি কি হোথর্নের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘হ্যাঁ,’ জবাব দিল একটা নারীকণ্ঠ।
‘একটা বাটন চেপে দরজা খুলে দিচ্ছি। সিঁড়ি বেয়ে চলে আসুন উপরতলায়।’
‘কে এসেছে?’ জিজ্ঞেস করলেন গডউইন, তাঁর কণ্ঠের ভীতি স্পষ্ট টের পেলাম। এবং এ-ও বুঝতে পারলাম, যে এসেছে তার পরিচয় জানা আছে তাঁর।
‘আপনি বসে পড়ছেন না কেন, মিস্টার গডউইন?’ বলল হোথর্ন। ‘আপনি যদিও আমাকে বিশ্বাস করবেন না, তারপরও বলি… আমি কিন্তু আসলে আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। কিছু লাগবে আপনার?’
‘জুস আছে আমার বাসায়,’ বললাম আমি।
‘পানি খাবো,’ টেবিলের আরেকপ্রান্তে বসে পড়লেন গডউইন। হোথর্নের মুখোমুখিই বসেছেন, কিন্তু ওর সঙ্গে যাতে চোখাচোখি না-হয় সে-ব্যাপারে সতর্ক আছেন।
পানি আর জুস দুটোই সরিয়ে রাখতে বলেছিল হোথর্ন; গিয়ে পানি নিয়ে এলাম গডউইনের জন্য। ঠিক তখনই পায়ের আওয়াজ শুনতে পেয়ে মুখ তুলে তাকালাম।
ঘরে ঢুকছে মেরি ও’ব্রায়ান।
কল্পনাও করিনি, ওই মেয়েকে এখন এই সময়ে দেখতে হবে আমার এখানে।
আমাদের দিকে দু’কদম এগিয়ে এল সে, তারপরই থেমে দাঁড়িয়ে পড়ল স্থাণুর মতো। একটা মুহূর্ত আগেও হয়তো নার্ভাস আর অনিশ্চিত ছিল সে, কিন্তু এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার উপর বজ্রপাত হয়েছে যেন। অ্যালান গডউইনকে দেখতে পেয়েছে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে। গডউইন নিজেও কোনো অংশে কম চমকাননি মেরির চেয়ে, তিনিও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মেয়েটার দিকে।
লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল হোথর্ন। শয়তানি কিছু-একটা দেখা যাচ্ছে ওর চেহারায়… এমন একজাতের উল্লাস দেখতে পাচ্ছি সেখানে, যা আগে কখনও দেখিনি। বলল, ‘আমার ধারণা আপনারা দু’জন চেনেন একজন আরেকজনকে।’
বজ্রাহত অবস্থা থেকে আগে সামলে নিলেন অ্যালান গডউইন। ‘অবশ্যই আমরা চিনি একজন আরেকজনকে। আপনি আসলে কী বোঝাতে চাইছেন, বলুন তো?’
‘আমার ধারণা কী ঘটছে এখানে, সেটাও জানেন আপনি, অ্যালান। মেরি, আপনি বসছেন না কেন? আপনাদের দু’জনকে যদি নাম ধরে ডাকি, অসুবিধা আছে? আসলে আমরা এখানে যারা আছি এখন, সবাই একজন আরেকজনের বন্ধু… ঠিক না?’
‘কিছুই বুঝতে পারছি না আমি!’ নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছে মেরি ও’ব্রায়ান, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আর কিছুক্ষণের মধ্যে কান্নায় ভেঙে পড়বে। গডউইনের দিকে তাকাল। ‘আপনি কেন এসেছেন এখানে?’
ইঙ্গিতে হোথর্নকে দেখিয়ে দিলেন গডউইন। ‘তিনি আসতে বলেছেন।’
