গ্রেস লোভেলের কথাই বা বাদ দিই কী করে? মুখে যদিও বলেনি সে, কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে হয়েছে, শাশুড়ির সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না তার। ওদিকে ওই অভিনেত্রী মেয়েটার উপরও কোনো টান ছিল না মিসেস ক্যুপারের… নাতনি অ্যাশলিই ছিল তাঁর সব আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বাচ্চা ওই মেয়ের কারণেই শেষ হয়ে গিয়েছিল গ্রেসের অভিনয়-ক্যারিয়ার। শুধু তা-ই না, পত্রপত্রিকায় যেসব খবর ছাপা হয়েছিল, সেগুলো যদি সত্যি হয়ে থাকে, তা হলে স্বীকার করে নিতেই হবে, আদর্শ পার্টনার বলতে যা বোঝায়, সেটার সঙ্গে যোজন যোজন দূরত্ব ছিল ড্যামিয়েনের। সোজা কথায় তার সঙ্গে গ্রেসের সম্পর্কটা ছিল কেবল শারীরিক, মানসিক দিক দিয়ে যথেষ্ট দূরত্ব ছিল তাদের দু’জনের মধ্যে। ড্রাগস, পার্টি, শোগার্ল… এসব নিয়ে আমেরিকায় ব্যস্ত ছিল ড্যামিয়েন, হয়তো ঠিকমতো সময় দিতে পারত না গ্রেসকে।
সুযোগ পাওয়ামাত্র সে-বঞ্চনারই কি শোধ তুলেছে মেয়েটা? ড্যামিয়েনকে খুন করার জন্য সেটাই কি মোটিভ তার? কিন্তু একইসঙ্গে এ-কথাও ভুললে চলবে না, ডায়ানা ক্যুপারকে যখন খুন করা হয়, তখন আমেরিকায় ছিল মেয়েটা।
আসলেই?
আরও একবার হাতড়াতে লাগলাম আমার নোটগুলো। যা খুঁজছিলাম, তা পেয়েও গেলাম একসময়।
একবার একটা কথা বলেছিল ড্যামিয়েন ক্যুপার। এবং যখন বলেছিল সে কথাটা, তখন ততটা গুরুত্ব পায়নি সেটা। কিন্তু এখন কেন যেন ওই কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে আমার।
গ্রেস অভিযোগ জানিয়ে বলেছিল, লস অ্যাঞ্জেলসে ফিরে যেতে চায় না সে। তার বাবা-মায়ের সঙ্গে আরও বেশি করে সময় কাটাতে চায় সে। ড্যামিয়েন তখন বলেছিল, তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যেই একটা সপ্তাহ কাটিয়ে ফেলেছ তুমি, বেইব।
সন্তুষ্টি অনুভব করছি আমি। কিছুই মিস করিনি! এমনও হতে পারে, এই কেস সমাধান করার ব্যাপারে হোথর্নকে ছাড়িয়ে গেছি। হতে পারে, ড্যামিয়েনের চেয়ে নয়-দশ দিন আগেই ইংল্যান্ডে চলে এসেছিল গ্রেস। তার মানে যেদিন খুন হয়েছেন ডায়ানা ক্যুপার, সেদিন এ-দেশেই ছিল মেয়েটা।
কিন্তু একটা ব্যাপার মিলছে না। মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পরে মেয়েটাকে ফুলহ্যাম রোডের ওই পাবে রেখে ব্রিক লেনের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম আমি আর হোথর্ন। আমার মনে আছে, কী সাংঘাতিক যানজট ছিল তখন। ড্যামিয়েনকে খুন করতে হলে আমাদের আগে ব্রিক লেনের ওই ফ্ল্যাটে হাজির হতে হবে গ্রেসকে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেটা সে করল কী করে?
সেদিনের সেই শেষকৃত্যে আর কে কে ছিল?
রবার্ট কর্নওয়ালিস অথবা আইরিন লযের যে-কেউ ওই মিউযিক প্লেয়ারটা ঢুকিয়ে থাকতে পারেন কফিনের ভিতরে। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়ে যায়… কেন করতে যাবেন তাঁরা কাজটা? ডায়ানা ক্যুপার যেদিন খুন হয়েছেন, সেদিনই তাঁর সঙ্গে প্রথমবার দেখা হয়েছে ওই দু’জনের। তাদের কারও কোনো লাভ হয়নি ওই মহিলা কিংবা তাঁর ছেলের মৃত্যুতে।
সারাটা দিন মেতে থাকলাম আমার সেই নোটগুলো নিয়ে। ঘড়ির দিকে তাকানোর মতো সময়ই পেলাম না। পাঁচটা বাজতে যখন মিনিট পনেরো বাকি, তখন বেজে উঠল ডোরবেল।
যে-বিল্ডিঙে থাকি আমি, সেটার পঞ্চম তলায় কাজ করি… মানে লেখালেখি করি। একটা ইন্টারকম আছে আমার এখানে, সেটা সরাসরি যুক্ত হয়েছে রাস্তার সঙ্গে। আমাদের বাসায় যদি কেউ আসে, তার সঙ্গে ওই ইন্টারকমের মাধ্যমে কথা যায়।
মনে পড়ে গেল হোথর্নের কথা। বুঝলাম, হাজির হয়ে গেছে সে।
‘সুন্দর জায়গা,’ ভিতরে ঢুকে বলল সে। ‘তবে আমার মনে হয় না ড্রিঙ্কের কোনো দরকার আছে।’
অতিথি আসবে বাসায়; তাই মিনারেল ওয়াটার, কমলার জুস আর কয়েকটা গ্লাস রেখেছি আমি। হোথর্নের কথামতো ওগুলো নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়ে রাখছি ফ্রিজে, এমন সময় খেয়াল করলাম, আমার লিভিংরুমটা ভালোমতো দেখছে সে।
একটা কফি টেবিল ঘিরে দুটো সোফা আছে, ওগুলোর একটাতে বসে পড়ল হোথর্ন। ওকে দেখে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত বলে মনে হচ্ছে।
‘ডিলে ঠিক কী ঘটেছিল, সেটা তা হলে জানা হয়ে গেছে আপনার,’ বললাম আমি। ‘তা হলে… ডায়ানা ক্যুপারকে কে খুন করেছে, সেটা কি জানতে পারি?’
মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘এখনই না। তবে কথাটা যখন বলবো আপনাকে, ইন্টারেস্টিং লাগবে আপনার কাছে। যা-হোক, ভালো একটা খবর আছে আমার কাছে।
‘কী?’
‘মিস্টার টিবসকে পাওয়া গেছে।
‘মিস্টার টিবস?’ নামটা কীসের, মনে করতে কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল আমার। ‘মিসেস ক্যুপারের বিড়ালটার কথা বলছেন?’
‘হ্যাঁ। মিসেস ক্যুপারের সেই পার্শিয়ান গ্রে।’
‘কোথায় আছে ওটা?’
‘স্কাইলাইট দিয়ে ওই মহিলার এক প্রতিবেশীর বাসায় ঢুকে পড়েছিল। তারপর আর বের হতে পারেনি। ওই প্রতিবেশী ভদ্রলোক আবার বেড়াতে গিয়েছিলেন দক্ষিণ ফ্রান্সে, তিনি বাসায় ফিরে এসে খুঁজে পান বিড়ালটাকে। তারপর ফোন করেছেন আমাকে।
‘হ্যাঁ… খবরটা মনে হয় ভালোই।’ বললাম বটে, কিন্তু এই কেসের সঙ্গে ডায়ানা ক্যুপারের বিড়ালের কী সম্পর্ক, বুঝতে পারছি না। এমন সময় একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়। ‘এক মিনিট। যতদূর মনে পড়ে, মিসেস ক্যুপারের এক প্রতিবেশী একজন উকিল… ‘
‘মিস্টার গ্রসম্যান।
‘তিনি কেন ফোন করলেন আপনাকে? আপনি কে, সেটাই বা জানলেন কী করে তিনি?’
