হঠাৎ করেই টের পেলাম, এই হোটেলে আর থাকতে ইচ্ছা করছে না আমার। তাই হোথর্ন যখন মিসেস রেন্ডেলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল আর-কিছু জিজ্ঞেস করার নেই ওর, খুশি হলাম তখন।
হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা দু’জন।
১৯. মিস্টার টিবস
পরদিন যে দেখা হয়ে যাবে হোথর্নের সঙ্গে, আশা করিনি। তাই যখন ফোন করল সে আমাকে, আশ্চর্য হলাম। ব্রেকফাস্টের কিছুক্ষণ পর এল ওর কলটা।
‘আজ সন্ধ্যায় কিছু করছেন?’
‘হ্যাঁ, কাজ আছে,’ বললাম আমি। ‘আমার একটু আসা দরকার।’
‘কোথায়? আমার এখানে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
হোথর্ন আগে কখনও আমার লন্ডনের-ফ্ল্যাটে আসেনি। এবং সে যে আসেনি, সেজন্য আমি খুশি। সুকৌশলে একটু একটু করে ঢুকতে চেয়েছি আমি ওর জীবনে, কখনও চাইনি উল্টোটা ঘটুক। এখনপর্যন্ত নিজের বাসার ঠিকানাটা পর্যন্ত বলেনি সে আমাকে। সত্যি বলতে কী, সে জেনেশুনে ভুল পথে পরিচালিত করেছে আমাকে। বলেছে, ওর বাসা নাকি গ্যান্টস হিলে। অথচ ব্ল্যাকফায়ার্সের রিভার কোর্টে একটা ফ্ল্যাট আছে ওর। আমি চাই না, সে ওর গোয়েন্দা-নজরটা ফেলুক আমার বাসার উপর। চাই না, পরে আমারই কোনো কিছু ব্যবহার করুক আমার বিরুদ্ধে।
আমি যে ইতস্তত করছি, সেটা বোধহয় লাইনের ওপ্রান্তে থেকেও টের পেয়ে গেল সে। ব্যাখ্যা করার কায়দায় বলল, ‘একটা মিটিঙের আয়োজন করতে চাই আসলে। এবং আমি চাই, সেটা নিরপেক্ষ কোনো জায়গায় হোক!
‘ওই মিটিং আপনার বাসায় হলে সমস্যা কী?
‘মিটিংটা আমার বাসায় করা ঠিক হবে না আসলে।’ একটুখানি থামল সে। ‘ডিলে আসলে কী ঘটেছিল, সে-ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে এসেছি আমি। এবং সেটার সঙ্গে যে আমাদের তদন্তের সম্পর্ক আছে, আমার মনে হয় সে-ব্যাপারে একমত হবেন আপনি।’
‘কার সঙ্গে মিটিং করতে চান?’
সেটা তাঁদের দু’জনকে দেখলেই জানতে পারবেন।’ শেষ আরেকবার অনুরোধ করল হোথর্ন। ‘ব্যাপারটা জরুরি।
ঘটনাক্রমে আজ সন্ধ্যায় আমি একাই আছি বাসায়। আমার মনে হলো, কোথায় থাকি সেটা যদি দেখতে দিই হোথর্নকে, তা হলে সে কোথায় থাকে, তা দেখতে দেয়ার ব্যাপারে বলেকয়ে রাজি করাতে পারবো ওকে। নদীর দিকে মুখ করে আছে এ-রকম কোনো ফ্ল্যাটে থাকার আর্থিক সামর্থ্য হয় কী করে ওর, জানার খুব ইচ্ছা আমার। অথচ মিডোস বলেছে, ওই ফ্ল্যাট নাকি হোথর্নের নিজের না।
‘কখন?’ জানতে চাইলাম।
‘বিকেল পাঁচটায়।’
‘ঠিক আছে। বললাম বটে, কিন্তু ইতোমধ্যেই ভুগতে শুরু করেছি অনুশোচনায়। ‘আগেই বলে রাখি… এক ঘণ্টার বেশি সময় দিতে পারবো না।’
‘ঠিক আছে,’ লাইন কেটে দিল হোথর্ন।
সকালের বাকি সময়টা আমাদের তদন্তের বিভিন্ন নোট টাইপ করার কাজে ব্যয় করলাম… ব্রিটানিয়া রোড, কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স, দ্য সাউথ অ্যাক্টন এস্টেট। কারও কারও কথা নিজের আইফোনে রেকর্ড করে নিয়েছিলাম; ওটা কানেক্ট করলাম আমার কম্পিউটারের সঙ্গে, হেডফোনের মাধ্যমে শুনতে লাগলাম হোথর্নের আকর্ষণহীন আর ছলনাপূর্ণ কণ্ঠ। ডজনখানেকের মতো ফটোও তুলেছি, দেখতে লাগলাম ওগুলো। যা যা দেখেছি এই কেসে, নিজেকেই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছি সেগুলো। এই কেসে, বলা বাহুল্য, যা যা দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি মালমশলা ছিল আমার কাছে এবং আমি নিশ্চিত সেগুলোর নব্বই শতাংশই অপ্রাসঙ্গিক।
আসলে এ-রকম কোনো পদ্ধতিতে আগে কখনও কাজ করিনি আমি। সাধারণত যখন কোনো উপন্যাস বা টিভি স্ক্রিপ্টের পরিকল্পনা করি, কী-কী দরকার তা ভালোমতোই জানা থাকে আমার। অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা দিতে গিয়ে সময় নষ্ট করি না তখন। কিন্তু হোথর্নের মাথায় কী চলছে তা যেহেতু জানা নেই আমার, সেহেতু কোটা প্রয়োজনীয় আর কোটা অপ্রয়োজনীয় বুঝবো কী করে? ফলে এই কেসের তদন্তের কাজে যেসব জায়গায় গেছি, সেসব জায়গায় যা-যা দেখেছি তার প্রায় সব কিছুই লিখতে হয়েছে আমাকে।
আমি এখনও নিশ্চিত, অ্যালান গডউইনই খুনি। ওই লোক যদি খুনি না-হবে, তা হলে আর কে খুন করে থাকতে পারে মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে? নিজের ডেস্কের ধারে বসে থেকে কথাটা আপনমনেই জিজ্ঞেস করলাম নিজেকে।
জুডিথ গডউইন… উদাহরণ হিসেবে কি বলা যায় ওই মহিলার কথা? ডায়ানা ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে খুন করার পেছনে যে-মোটিভ আছে অ্যালান গডউইনের, প্রায় একই মোটিভ আছে জুডিথেরও।
খুনির ব্যাপারে কী বলেছিল হোথর্ন, ভাবতে লাগলাম। হাতড়াতে শুরু করলাম আমার কাগজগুলো, নির্দিষ্ট কাগজটা খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না। আমি যা বলছি মেনে নিন– খুনি একজন পুরুষ। মেয়েরাও যে মেয়েদেরকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, জানি আমি; তারপরও… মিসেস ক্যুপারের বেলায় ঘটনাটা অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে।
এখন কথা হচ্ছে, কোনো কিছু অস্বাভাবিক হলেই কি সেটা অসম্ভব হয়ে যায়?
সুতরাং জুডিথ গডউইন খুন করে থাকতে পারেন ডায়ানা ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে। আবার মেরি ও’ব্রায়ানও করে থাকতে পারে কাজটা। গত দশটা বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছে সে গডউইন পরিবারে। বোঝাই যায়, প্রচণ্ড ভালোবাসে সে জেরেমিকে। ভালোবাসত টিমোথিকেও। অন্ধ সেই ভালোবাসাই কি কারও প্রাণহরণের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল তাকে?
জেরেমি গডউইন কি করে থাকতে পারে খুন দুটো? হতে পারে, সবাই তাকে যে-রকম অসহায় ভাবে, আসলে ততটা অসহায় না সে। শারীরিকভাবে অক্ষম কত খুনিরই তো বর্ণনা পাওয়া যায় দেশ-বিদেশে।
