গেইল হারকোর্টের প্রচণ্ডতা দেখে বিস্মিত হয়ে গেছি আমি। বিকট দেখাচ্ছে তাঁকে এই মুহূর্তে।
আরও দু’জন খদ্দের ঢুকল দোকানের ভিতরে, নিজেকে সামলে নিলেন গেইল হারকোর্ট, প্রস্তুত হলেন ব্যবসার জন্য। ‘পাশের বাসায় মিস্টার ট্র্যাভার্টন নামের এক ভদ্রলোক আছেন, আপনারা ইচ্ছা করলে কথা বলতে পারেন তাঁর সঙ্গে। তিনিও সেদিন ছিলেন এখানে। আমার চেয়ে বেশি দেখেছেন তিনি সেদিনের ঘটনাটা।’ কাউন্টারের কাছে চলে এসেছে মাত্র-দোকানে-ঢোকা খদ্দের, তার উদ্দেশে হাসলেন। ‘হ্যাঁ, কী নেবেন আপনি?’
.
‘এখনও যখন ভাবি ঘটনাটা, আমার মনে হয় মাত্র গতকাল ঘটেছে সেটা। তখন বিকেল সোয়া চারটা। দিনটা ছিল চমৎকার… আজকের মতো না। ঝকঝকে রোদ ছিল, সাগর-পানিতে গোসল করার জন্য যথেষ্ট গরম ছিল আবহাওয়া। আমি তখন কিছু-একটা বিক্রি করছিলাম একজন খদ্দেরের কাছে। ওই লোক ছিল একজন রহস্যমানব… পরে সবাই আগ্রহী হয়ে উঠেছিল তার উপর। দুর্ঘটনাটা যখন ঘটল, তার বড়জোর সেকেন্ড পাঁচেক আগে আমার দোকান ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে। আর সে-কারণেই বীভৎস শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমি। শুনতে পেলাম, গাড়িটা ছুটে এসে ধাক্কা মারল ছেলে দুটোকে। আওয়াজটা যে কী বীভৎস… বলে বোঝাতে পারবো না। এবং খুব জোরে হয়েছিল ওই শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম, খারাপ কিছু-একটা হয়েছে। থাবা চালিয়ে তুলে নিলাম আমার মোবাইল ফোন, একদৌড়ে বের হলাম বাইরে। আমার দোকানে তখন মিস প্রিসলি ছাড়া আর কেউ ছিল না। বিয়ে হয়ে গেছে তার, এখন সে আর ডিলে থাকে বলে মনে হয় না। যা-হোক, বাইরে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিলাম দোকানে আছে কি না মেয়েটা। আমাদের এই দোকানে অনেক ওষুধপত্র আছে, এবং কাউকে পাহারায় না রেখে এখান থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা যদি ঘটে… যেমন যে- ঘটনার কথা বলছি এখন… তবুও না।’
পিয়ার ফার্মেসি অদ্ভুত আর সেকেলে একটা দোকান। ঘরোয়া একটা আবহ আছে। অনেক কিছু বিক্রি করা হয় এখানে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে স্টাফ-করা খেলনা, জ্যাম, চকলেট বার, সিরিয়াল, টয়লেট পেপার, এমনকী কুকুরের-গলায়- বাঁধার ফিতা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি আমি। সাধারণ ওষুধপত্র তো আছেই। এককোনায় কিছু হার্বাল সামগ্রীও আছে। এখানকার স্টাফদের সবাই সাদা কোট পরে। তাদের হাতের নাগালে রয়েছে বিভিন্ন জাতের শত শত প্যাকেট, ফয়েল আর বোতল।
সে-রকম একজনের সঙ্গেই এখন কথা বলছি আমরা… গ্রাহাম ট্রেভার্টন। তিনি এই দোকানের মালিক এবং ম্যানেজার। বয়স পঞ্চাশের ঘরে। মাথায় টাক পড়ে গেছে। গাল দুটো লালচে। উপরের পার্টির সামনের দিকের দুটো দাঁতের মাঝখানে শূন্যস্থান আছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী তিনি। এবং যেসব ডিটেইল দিচ্ছেন আমাদেরকে, সেগুলো শুনে আমি অবাক। সেদিন যা ঘটেছিল, সে-ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে সব কিছুই ঠিকমতো মনে আছে তাঁর। সে-বর্ণনা শুনে দু’-একবার ভাবতে বাধ্য হলাম, কোনো কিছু বানিয়ে বলছেন কি না তিনি। কিন্তু কথা হচ্ছে, আগেও ইন্টারভিউ নেয়া হয়েছিল তাঁর… একবার নিয়েছিল পুলিশ, আরেকবার সাংবাদিকরা। কাজেই একই গল্প বার বার বলার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। তা ছাড়া আমার ধারণা, যখন ভয়ঙ্কর কোনো কিছু ঘটে, সে-ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেক কিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে রাখতে পারে অনেকেই।
‘দরজা দিয়ে বের হলাম আমি,’ বলছেন ট্রেভার্টন। ‘আরেকটু হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলাম রহস্যময় ওই কাস্টোমারের উপর… ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা।
‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলাম লোকটাকে। জবাব দিল না সে… কিছুই বলল না।
‘ততক্ষণে যা দেখার দেখা হয়ে গেছে আমার। ছেলে দুটো পড়ে ছিল রাস্তার উপর। দু’জনের পরনেই নীল শর্টস আর খাটো হাতার শার্ট। তাদের একজন এমনভাবে পড়ে ছিল যে, দেখামাত্র আমার মনে হলো, মারা গেছে বেচারা। চোখ দুটো বন্ধ ছিল, একটুও নড়ছিল না। অন্য ছেলেটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল তাদের আয়া মেরি ও’ব্রায়ান। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা, ভূতের মতো দেখাচ্ছিল তাকে। ঘটনাস্থলে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল মেয়েটা, অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। ভাবখানা এমন, সাহায্যের জন্য আকুতি জানাচ্ছে আমার কাছে, কিন্তু… কী-বা করার ছিল আমার? পুলিশে খবর দিলাম। আমার মনে হয় আমার জায়গায় থাকলে অনেকেই সে-কাজ করত ওই সময়।
‘নীল রঙের একটা ভক্সওয়্যাগন তখন দুর্ঘটনার-জায়গাটা থেকে কিছুটা দূরে থেমে দাঁড়িয়ে ছিল। খেয়াল করলাম, কেউ একজন বসে আছে গাড়ির ভিতরে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই চলতে শুরু করল গাড়িটা, তারপর একসময় গতি বাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। কসম খেয়ে বলতে পারি, ওই গাড়ির এক্সহস্ট থেকে তখন ধোঁয়া বের হচ্ছিল। রাস্তার উপর চাকার তীব্র ঘর্ষণের আওয়াজও শুনতে পেয়েছিলাম। তখন অবশ্য জানতাম না, যে-মহিলা দায়ী ছিল দুর্ঘটনাটার জন্য, গাড়িটা তারই। কিন্তু চট করে গাড়ির নম্বরটা লিখে নিলাম, এবং পরে সেটা রিপোর্ট করে দিলাম পুলিশের কাছে। যা-হোক, ওই রহস্যমানবের উপর নজর পড়ল আমার তখন আমি তাকে দেখছি টের পেয়ে চট করে ঘুরে গেল সে, হাঁটা ধরল। কিং স্ট্রীটের কোনা ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল একসময়।’
