ওই দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটেছিল সেটা অনুমান করে নেয়াটা মোটেও কঠিন কোনো কাজ না এখন আমার জন্য: রাস্তার একটা কোনা ঘুরে বেরিয়ে এসেছিল মিসেস ক্যুপারের গাড়ি, দ্রুত ড্রাইভ করছিলেন তিনি। ঠিক ওই সময়ে জেরেমি আর টিমোথি সিদ্ধান্ত নেয় পালাবে মেরি ও’ব্রায়ানের কাছ থেকে, ফুটপাত ধরে ছুট লাগায় তারা। তারপর হুট করেই নেমে পড়ে রাস্তায়, দৌড় দেয় ওই আইসক্রিম শপের উদ্দেশে।
তার মানে… নাইজেল ওয়েস্টন হয়তো ঠিকই বলেছিলেন। ডায়ানা ক্যুপার যদি তখন চশমা পরেও থাকতেন, সময়মতো ব্রেক কষতে পারতেন কি না সন্দেহ। দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল বছরের এই সময়েই… আজকের তারিখের কাছাকাছি কোনো তারিখে। এই প্রমেনাড এখন যে-রকম জনশূন্য, সে-সময়ও হয়তো সে-রকমই ছিল। হয়তো আজকের মতো সেদিনও কেবল ফিকে হতে শুরু করেছিল শেষ- বিকেলের আলো।
‘কোত্থেকে শুরু করবো আমরা?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘আইসক্রিমের দোকান
দোকানটা, দেখতে পাচ্ছি, খোলা। রাস্তা পার হয়ে গিয়ে ঢুকলাম সেখানে।
দোকানটার নাম গেইল’স আইসক্রিম। ভিতরে সব জায়গায় কেমন একটা খুশি-খুশি ভাব। ফর্মিকা-বিছানো মেঝের উপর পেতে দেয়া হয়েছে প্লাস্টিকের চেয়ার। এখানে যে-আইসক্রিম বিক্রি করা হয় সেটা বাসায় বানানো। একটা ফ্রিয়ারের ভিতরে বারোটা আলাদা আলাদা টাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ওগুলো। বেশ পুরনো হয়ে গেছে ফ্রিয়ারটা, বেহাল দশা ওটার। জানালার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে কোন-গুলো। দেখে মনে হচ্ছে, ওগুলো বেশ কিছু দিন ধরে আছে ওখানে। এই দোকানে আরও পাওয়া যায় ফিযি ড্রিঙ্ক, চকলেট, ক্রিস্পস আর রেডি-মিক্স সুইট ব্যাগ। একদিকের দেয়ালে ঝুলছে একটা মেন্যু। তাতে বলা হচ্ছে, ডিম, বেকন, সসেজ, মাশরুম আর চিপসও পাওয়া যায় এখানে।
দোকানের মাত্র দুটো টেবিলে খদ্দের দেখা যাচ্ছে। একটা টেবিলে বসে আছে বয়স্ক এক দম্পতি। আরেকটা টেবিলে বসেছে যুবতী দুই মা, তাদের সঙ্গে আছে দুটো পুশচেয়ার, সেগুলোর ভিতরে আছে দুটো বাচ্চা। কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। সেখানে দেখা যাচ্ছে বড়সড় হাস্যোজ্জ্বল এক মহিলাকে। তাঁর বয়স পঞ্চাশের ঘরে। কাপড়ের উপর একটা অ্যাপ্রন পরে আছেন। ওই অ্যাপ্রন, এই দোকানের প্রবেশপথের শামিয়ানাটার মতোই চিত্রবিচিত্র। খদ্দেরদের সেবা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি।
জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী দেবো আপনাদের?’
‘সাহায্য,’ বলল হোথৰ্ন, ‘আমি পুলিশে আছি।’
‘ওহ্?’
‘আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে এখানে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ওটার ব্যাপারে খোঁজখবর করছি। একটা গাড়ির নিচে চাপা পড়েছিল ছোট দুটো ছেলে।’
‘কিন্তু… এই ঘটনা তো দশ বছর আগের!’
‘ডায়ানা ক্যুপার… মানে যে-মহিলা গাড়িটা চালাচ্ছিলেন তখন… মারা গেছেন। আপনি কি পড়েননি খবরটা?’
‘কিছু একটা পড়েছি। কিন্তু …’
‘আপনি যা বলবেন তার ফলে হয়তো নতুন কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে।’
‘ওহ্!’ নার্ভাস দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকালেন মহিলা। তাঁর সে-দৃষ্টি দেখে আমি ভাবলাম, বিশেষ কোনো কিছু গোপন করতে চাইবেন হয়তো। ‘কিছু মনে করবেন না… ওই ব্যাপারে আসলে বেশি কিছু বলার নেই আমার।
‘আপনি কি তখন ছিলেন এখানে?’
‘আমার নাম গেইল হারকোর্ট। এটা আমারই দোকান। এবং দুর্ঘটনাটা যেদিন ঘটেছিল, সেদিন আমি এখানেই ছিলাম। ওই দুটো বাচ্চার কথা যখনই মনে পড়ে, তখনই কেমন যেন অসুস্থ বোধ করি। ওরা শুধু আইসক্রিম খেতে চেয়েছিল, আর সে-কারণেই রাস্তা পার হতে ছুট লাগিয়েছিল। কিন্তু ওরা যদি আসত এখানে, কোনো লাভ হতো না… সেদিন এই দোকান বন্ধ ছিল।’
‘জুনের শুরুতে বন্ধ? কেন?’
ছাদের দিকে ইঙ্গিত করলেন মহিলা। ‘একটা পাইপ ফেটে গিয়েছিল। ফলে পানিতে ভেসে গিয়েছিল পুরো জায়গা। আমার মালসামান সব নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ইলেকট্রিক লাইনও। এই দোকানের কোনো কিছুরই বীমা করাইনি আমি। কারণ বীমার কিস্তি দেয়ার ক্ষমতা ছিল না আমার। কাজেই ওই পাইপ ফেটে যাওয়ার ঘটনায় বলতে গেলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল আমার ব্যবসা।’ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘দুর্ঘটনাটার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম। তবে দেখতে পাইনি ঘটনাটা। তৎক্ষণাৎ দৌড়ে বের হই রাস্তায়, দেখি ছেলে দুটো পড়ে আছে। একটা মেয়ে ছিল ওদের সঙ্গে… কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, প্রচণ্ড কোনো মানসিক ধাক্কা খেয়েছে। তার বয়স ছিল খুবই কম… বিশ্বের কোঠায়। যা-হোক, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই আমি তখন, দেখতে পাই গাড়িটা। পিয়ারের আরেক প্রান্তে গিয়ে থেমে দাঁড়ায় ওটা। মিনিটখানেকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আবার চলতে শুরু করে এবং একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।’
‘ড্রাইভারকে কি দেখেছিলেন?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন, কিন্তু পাত্তা দিলাম না।
‘দেখেছিলাম মানে… শুধু ওই মহিলার মাথার পেছনদিকটা দেখেছিলাম।’
‘তার মানে গাড়িটা কে চালাচ্ছিল তখন, সে-ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত না? অর্থাৎ, ড্রাইভার যে-কেউ হতে পারে?’
‘যে-কেউ মানে? ওটা তো ওই মহিলাই! তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল ওই দুর্ঘটনার কারণে।’ হোথর্নের দিকে তাকালেন গেইল হারকোর্ট। ‘একটা মানুষ কীভাবে ওই কাজ করতে পারে… মানে, কোনো দুর্ঘটনার জায়গা থেকে পালিয়ে যেতে পারে, জানি না আমি। দু’-দুটো বাচ্চা ছেলে পড়ে ছিল ওখানে! ওই মহিলা… আসলে একটা কুত্তী! আপনি জানেন কি না জানি না… তখন কিন্তু চশমা পরে ছিল না সে। চোখে দেখতে পায় না এমন কেউ কেন গাড়ি চালাবে, বুঝি না আমি। ওই মহিলাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া উচিত ছিল। আর ওই বিচারক… যে কিনা ওই মহিলাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে… তার চাকরি চলে যাওয়া উচিত ছিল। বিরক্তিকর! ন্যায়বিচার বলে কোনো কিছু আর বাকি নেই আমাদের দেশে।’
