ডায়ানা ক্যুপারকে যতটুকু চিনেছি, সে-অনুযায়ী আমি বলবো, এই বাড়িতে চমৎকার মানিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। বাড়িটা ধূসর নীলাভ রঙের, দেখলে নিরেট বলে মনে হয়। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নিয়মিত করা হয় এখনও। বাড়িটা দুই তলা। চিমনির সংখ্যা একাধিক। একদিকে একটা গ্যারেজ আছে। সদর দরজার সামনে যেন পাহারায় নিয়োজিত আছে পাথরে-নির্মিত দুটো সিংহ। চারদিকে গাছের সারি, সুন্দর করে ছেঁটে রাখা হয়েছে সেগুলোর ডালপাতা; সরু কিছু ফ্লাওয়ারবেডে শোভা পাচ্ছে অর্ধগ্রীষ্মমণ্ডলীয় কতগুলো গাছ। নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর লাগানো হয়েছে ওগুলো। পুরো এলাকা যে ব্যক্তিগত সেটা বোঝানোর জন্য জায়গাটা ঘিরে দেয়া হয়েছে দেয়াল দিয়ে।
‘আমরা কি বেল বাজাবো?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি, দাঁড়িয়ে আছি লিভারপুল রোডের এককোনায়। যতদূর বুঝতে পারছি, ওই বাড়িতে কেউ নেই।
‘না। দরকার নেই।’ পকেট থেকে একটা চাবি বের করল হোথর্ন। দেখতে পেলাম, সেটার গায়ে একটা ট্যাগ লাগানো আছে, আর সেই ট্যাগে লেখা আছে বাড়িটার নাম।
থতমত খেয়ে গেলাম।
তবে ব্যাপারটা বুঝতে বেশি সময় লাগল না আমার। এই চাবি মনে হয় ডায়ানা ক্যুপারের কিচেন থেকে জোগাড় করে নিয়েছে হোথর্ন, কিন্তু কখন করেছে কাজটা সে-ব্যাপারে নিশ্চিত না আমি। পুলিশ যদি টের পেত মিসেস ক্যুপারের শেষ আবাসস্থল থেকে কোনো কিছু সরাচ্ছে হোথর্ন, তা হলে কাজটা কখনোই করতে দিত না তাকে। তার মানে, ধরে নেয়া যায়, এই চাবির অস্তিত্বে সম্পর্কে কিছু জানা ছিল না পুলিশের।
চাবিটা নিরেট আর মোটাসোটা। ইয়েল জাতীয় কোনো কিছু না। বুঝতে পারছি, এটা সদর-দরজার চাবি না আসলে। তার মানে এটা দিয়ে ওই ধাতব দরজা দুটোর কোনো একটা খোলা যাবে হয়তো। একটা দরজার দিকে এগিয়ে গেল হোথর্ন, ওই চাবি দিয়ে দু’বার চেষ্টা করল তালা খুলতে কিন্তু পারল না। মাথা নেড়ে বলল, ‘এটা এই দরজার চাবি না।’
দ্য বীচ লাগোয়া যে-রাস্তা আছে, সেখানে গেলাম আমরা; এখানকার দরজাটা খোলার চেষ্টা করল হোথর্ন সেই চাবি দিয়ে। কিন্তু এবারও পারল না। বিড়বিড় করে বলল, ‘দুঃখের বিষয়।’
‘এই বাড়ি ছেড়ে দেয়ার পরও এখানকার একটা চাবি নিজের কাছে রাখতে গেলেন কেন মিসেস ক্যুপার?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘আমিও জানতে চাই সেটা।’
এদিক-ওদিক তাকাল হোথর্ন। ভাবলাম, আমাদেরকে এবার হয়তো হেঁটে ফিরে যেতে হবে ডিলে। কিন্তু আরেকটা গেট দেখতে পেয়েছে সে… আমিও দেখেছি ওটা। স্টোনার হাউসে একটা আলাদা আর ব্যক্তিগত বাগান আছে… বেলাভূমির ঠিক পাশেই। আনমনে হাসল হোথর্ন, রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে গেল ওই দরজার দিকে, তৃতীয়বারের চেষ্টায় কাজে লেগে গেল ওর সেই চাবি।
ছোট একটা চৌকোনা জায়গায় প্রবেশ করলাম আমরা। চারদিকে ছোটবড় ঝোঁপঝাড়। আসলে বাগান বলতে যা বোঝায়, এই জায়গা সে-রকম কিছু না, বরং এটাকে একটা চত্বর বলা যেতে পারে। ক্ষুদ্রাকৃতির কিছু ইউ গাছ আছে এদিকে- সেদিকে, আর আছে গোলাপ ফুলের কিছু বেড। এগুলো ঘিরে রেখেছে মার্বেল পাথরে-বানানো সুন্দর একটা ফোয়ারাকে। ঘিরে রেখেছে কাঠের দুটো বেঞ্চকেও… ওগুলো দাঁড়িয়ে আছে একটা আরেকটার মুখোমুখি। ইয়র্ক পাথরে মুড়ে দেয়া হয়েছে জমিন। এত কিছুর কারণে পুরো জায়গায় তৈরি হয়েছে মঞ্চনাটকের মতো একটা আবহ… মনে হচ্ছে, বাচ্চাদের কোনো নাটকের কোনো দৃশ্য দেখছি যেন।
এগিয়ে গেলাম ফোয়ারাটার দিকে। শুকিয়ে খটখট করছে ওটা, বোঝাই যায় অনেকদিন হয়ে গেল আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। কেমন একটা দুঃখের অনুভূতি ভর করল আমার মনে। কী খুঁজে পেতে চলেছি আমরা, সে-ব্যাপারে একটা ধারণাও জন্মাল।
এবং সেটা চোখে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
ফোয়ারাটার একদিকে, পাথরের গায়ে খোদাই করা আছে :
লরেন্স ক্যুপার
৩ এপ্রিল –২২ অক্টোবর ১৯৯৯
‘টু স্লিপ, পারচ্যান্স টু ড্রিম।
‘মিসেস ক্যুপারের স্বামী,’ বললাম আমি।
‘হ্যাঁ। ক্যান্সারে ভুগে মারা গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। আর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যেই এই জায়গা বানিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। বেচারী এই বাড়িতে থাকতে পারেননি, কিন্তু জানতেন, এখানে ফিরে আসতে চাইবেন বার বার। আর তাই এই বাড়ির একটা চাবি রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাছে।
‘মিসেস ক্যুপার তাঁর স্বামীকে খুবই ভালোবাসতেন,’ বললাম আমি।
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন।
একটাবারের জন্য মনে হলো আমার, আমরা দু’জনই ভুগছি অস্বস্তিতে।
‘চলুন বেরিয়ে যাই এখান থেকে,’ বলল হোথর্ন।
.
যে-দুর্ঘটনা বদলে দিয়েছিল ডায়ানা ক্যুপারের জীবন, সেটা ঘটেছিল ডিলের কেন্দ্রস্থলে… দ্য রয়্যাল নামের একটা হোটেলের কাছে। হোটেলটা সুন্দর, জর্জিয়ান আমলের। এখানেই উঠেছিল মেরি ও’ব্রায়ান, তার সঙ্গে ছিল জেরেমি আর টিমোথি গডউইন। বিকেলের নাস্তা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে আর যখন মাত্র কয়েক মিনিট বাকি ছিল তাদের তিনজনের, তখনই ঘটে দুর্ঘটনাটা।
মেরি কী বলেছিল, মনে পড়ে গেল আমার। সৈকত থেকে উঠে এসেছিল জেরেমি আর টিমোথি… এই মুহূর্তে আমাদের পেছনে আছে ওই বেলাভূমি। এখানকার রাস্তাটা ডিলের যে-কোনো জায়গার রাস্তার তুলনায় চওড়া, ফলে এই জায়গায় হাজির হলে গাড়ির চালকেরাও স্বাভাবিকভাবে গতি বাড়িয়ে দেয়। রাস্তার একধারে একটা দোকান দেখা যাচ্ছে, আরেক প্রান্তে আছে একটা এন্টারটেইনমেন্ট আর্কেড। আরও দেখতে পাচ্ছি একটা পাব এবং একটা ওষুধের দোকান। দোকানটার নাম পিয়ার ফার্মেসি। সবশেষে, ওষুধের ওই দোকানের পাশে, দেখা যাচ্ছে আইসক্রিম শপটা। দোকানটার সামনের দিকের পুরোটা বানানো হয়েছে প্লেট-গ্লাস উইন্ডো দিয়ে, সেটার উপর লাগিয়ে রাখা হয়েছে একটা উজ্জ্বল আর চিত্রবিচিত্র শামিয়ানা।
