‘মিসেস ক্যুপার কি ওই বিচারকাজ চলার সময় বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে রেমন্ড কুন্সকে পাঠিয়েছিলেন আপনার কাছে?’
‘কেন করতে যাবেন তিনি কাজটা?’
‘যাতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করেন আপনি ঘটনাটা। যাতে রেমন্ড কুন্সের কথা শোনেন আপনি। কারণ আপনি এবং মিসেস ক্যুপার দু’জনই টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন কুন্সের নাটকে।’
‘যথেষ্ট হয়েছে,’ উঠে দাঁড়ালেন ওয়েস্টন। ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছিলাম, কারণ ভেবেছিলাম হয়তো সাহায্য করতে পারবো আপনাকে। তা ছাড়া আপনার নামও শুনেছিলাম অনেক। কিন্তু আপনি আজেবাজে কথা বলে মেজাজটাই খারাপ করে দিলেন আমার… আপনার সঙ্গে কথা বলার আর কোনো প্রয়োজন বোধ করছি না।’
কিন্তু কথা এখনও শেষ হয়নি হোথর্নের। ‘আপনি কি জানেন রেমন্ড কুন্স জেলে যাচ্ছেন?’
‘আপনাকে চলে যেতে বলেছি!’ চিৎকার করে উঠলেন ওয়েস্টন।
আর কিছু বলল না হোথর্ন, বেরিয়ে এল।
আমিও তা-ই করলাম।
স্টেশনের পথে যখন ফিরে চলেছি, তাকালাম ওর দিকে। ‘আপনি আসলে কেন এসেছিলেন নাইজেল ওয়েস্টনের কাছে, বলুন তো?’
একটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন। ‘ওই দুর্ঘটনাটার ব্যাপারে আরও বেশি কিছু জানতে চাই। ডায়ানা ক্যুপার আর গডউইন পরিবারের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, জানতে চাই। আমার ধারণা, নাইজেল ওয়েস্টন ছিলেন সে- যোগাযোগের একটা অংশ। আর সেটাই বের করতে চাইছি আমি।’
‘তার মানে আপনি ভাবছেন খুন দুটোর ব্যাপারে কিছু-না-কিছু করার ছিল ওয়েস্টনের?’
‘যাদের সঙ্গেই দেখা করেছি আমরা, খুন দুটোর ব্যাপারে কিছু-না-কিছু করার ছিল তাদের প্রত্যেকেরই। হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারটাই ও-রকম। আপনি বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় মারা যেতে পারেন। ক্যান্সারে ভুগে মারা যেতে পারে। আবার বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগেও মারা যেতে পারেন। কিন্তু কেউ যখন আপনাকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, অথবা আপনার শ্বাসরোধ করবে, তখন বুঝতে হবে কোথাও-না-কোথাও কোনো-না-কোনো ছক আছে… একটা নেটওয়ার্ক আছে… আর সেটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি আমরা।’ মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘আমি আসলে জানি না! আপনি হয়তো এ-সবের জন্য উপযুক্ত না, টনি। অন্য লেখকদের কাছে যে যেতে পারিনি আমি, সেটা ভেবে এখন লজ্জাই লাগছে আমার।’
‘কী?’ ঘাবড়ে গেছি আমি। ‘কী বলছেন আপনি?’
‘যা বলেছি, শুনতে পেয়েছেন।’
‘অন্য লেখকদের সঙ্গে কথা বলেছেন আপনি?’
‘অবশ্যই, মেইট। তবে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁরা।’
১৮. ডিল
ট্রেনে সওয়ার হয়ে ডিলে যাওয়ার পথে হোথর্নের সঙ্গে একটা কথাও বললাম না। এবার একটু দূরে সরে বসেছি ওর থেকে। আগের সেই বইটা পড়ছে সে, থেকে থেকে পাতা উল্টাচ্ছে। আমি জানালা দিয়ে গোমড়া মুখে তাকিয়ে আছি বাইরে, হোথর্নের শেষ কথাটা ভাবছি। কিন্তু যখন হাজির হয়ে গেলাম ডিলে, ব্যাপারটা বেরিয়ে গেল আমার মাথা থেকে।
এর আগে কখনও ডিলে আসিনি আমি। তবে আসতে চেয়েছিলাম বহুবার। কারণ সমুদ্রতীরবর্তী কোনো শহরের প্রতি সব সময়ই একরকমের অনুরাগ ছিল আমার মনে… বিশেষ করে যখন পর্যটকদের মৌসুম চলে না, তখন। কারণ সে- সময় রাস্তাঘাট থাকে ফাঁকা। সে-সময় আকাশটা থাকে ধূসর, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও হয় কখনও কখনও। আমার ভালো লাগে বালিয়াড়ি, স্লট মেশিন, পিয়ার্স, সিগাল, প্রিন্ট- করা নামের পিপারমিন্ট রক। ক্যাফে আর চায়ের দোকান, পট থেকে কাদাপানির– মতো-দেখতে চা ঢালতে থাকা বুড়ি মহিলাদের দল, মাছ ধরার জাল বিক্রি করে এমন দোকান, গাছের সারি এবং নভেলটি হ্যাঁটের প্রতি একরকমের লালসা আছে আমার মনে।
কিন্তু যখন স্টেশন থেকে বের হলাম, ডিল শহরটা তখন আশ্চর্য রকম আকর্ষণহীন বলে মনে হলো আমার। হাঁটতে লাগলাম প্রধান সড়কটা ধরে। আমাদের মাথার উপর চিৎকার করছে সিগালের দল… বিভিন্ন বাড়ির ছাদে বসে আছে ওগুলো। এখন মে মাস, পর্যটনের মৌসুম শুরু হতে বাকি আছে এখনও। আবহাওয়া নিতান্তই খারাপ। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য এই শহর কেমন, সে-চিন্তা খেলে গেল আমার মনে।
হাজির হলাম সমুদ্রের ধারে। আবহাওয়া ঠাণ্ডা, চারপাশের কোনো কিছুর প্রতিই কোনো আকর্ষণ বোধ করছি না। একটামাত্র পিয়ার আছে বেলাভূমিতে; সেটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্বল পিয়ার বলে মনে হচ্ছে আমার। কোথাও কোনো পেনি আর্কেড নেই, ট্রাম্পোলিন নেই, ক্যারোযেল নেই। এ-রকম এক জায়গায় গডউইন দম্পতি তাদের দুই ছেলেকে পাঠাতে গেল কেন? এখানে অন্য কোথাও কি বিনোদনের ভালো কোনো ব্যবস্থা ছিল?
যেখানে ঘটেছিল দুর্ঘটনাটা, প্রথমেই সেখানে গেলাম না আমরা।
ডায়ানা ক্যুপার কোথায় থাকতেন, সেটা আগে দেখতে চায় হোথর্ন। আর তাই সাগরের ধারে পৌঁছে ডানদিকে মোড় নিলাম আমরা। এখান দিয়ে যাওয়া যায় কাছের একটা গ্রামে। গ্রামটার নাম ওয়ালমার। এখনও আমাদের দু’জনের মধ্যে কথা বলা বন্ধ আছে।
একটা অ্যান্টিক শপকে পাশ কাটাচ্ছি, এমন সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হোথর্ন, ওই দোকানের জানালা দিয়ে তাকাল ভিতরে। কিন্তু একটা জাহাজের- কম্পাস, একটা গ্লোব, একটা সেলাই মেশিন, নষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু বই আর ছবি ছাড়া অন্যকিছু নজরে পড়ল না।
আরও মিনিট পনেরো হাঁটলাম আমরা। তারপর সহসাই হাজির হয়ে গেলাম ওয়ালমার গ্রামে। গিয়ে দাঁড়ালাম স্টোনার হাউসের সামনে। বিশেষ সেই দুর্ঘটনা ঘটার আগে এখানেই থাকতেন ডায়ানা ক্যুপার, পরে বাধ্য হয়ে এই জায়গা ছেড়ে চলে যান। দু’পাশে দুটো রাস্তা স্যান্ডউইচের মতো ঘিরে রেখেছে বাড়িটাকে। পেছনের রাস্তাটা লিভারপুল রোড, আর সামনেরটা দ্য বীচ। দুই রাস্তার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে ব্যক্তিগত একটা ড্রাইভ। সেটার দুই মাথায় আছে সুসজ্জিত দুটো ধাতব গেট।
