‘আসল ঘটনা মানে? আট বছর বয়সী একটা ছেলেকে পরপারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। ওই ছেলের ভাইকে পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটা যখন আদালত পর্যন্ত গড়াল, তখন নামকাওয়াস্তের শাস্তি পাওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু হলো না তাঁর।’
ওয়েস্টনের হাসিটা মলিন হলো। ‘রোড ট্রাফিক অ্যাক্ট ১৯৮৮-এর সেকশন টু- এ অনুযায়ী, প্রসিকিউশনের দায়িত্ব হচ্ছে, বিপজ্জনক ড্রাইভিঙের মাধ্যমে যদি কারও মৃত্যু হয়ে থাকে, সেটা প্রমাণ করা। কিন্তু তারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এবং তাদের সে-ব্যর্থতার কারণও আছে। মিসেস ক্যুপার আইন ভঙ্গ করেননি, আবার এমন কিছুও করেননি যার ফলে কেউ বলতে পারবে, ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিং করছিলেন তিনি তখন। গাড়ি চালানোর আগে তিনি ড্রাগ নেননি, মাত্রাতিরিক্ত মদও খাননি। আর কিছু কি বলার দরকার আছে আমার? আসলে আমি যা বলতে চাইছি তা হলো, কাউকে খুন করার কোনো ইচ্ছা ছিল না ওই মহিলার।
‘তিনি সে-সময় চশমা পরে ছিলেন না,’ বলল হোথর্ন, তাকাল আমার দিকে। আমি যাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি না-করি, সে-ব্যাপারে ইশারায় নিষেধ করল আমাকে।
‘মানলাম। ঘটনাটা দুঃখজনক। কিন্তু, মিস্টার হোথর্ন, আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, ঘটনাটা ২০০১ সালের। তারপর থেকে বিশেষ এই ব্যাপারে আইন অনেক কড়া হয়ে গেছে। এবং আমার মনে হয় সেটা ঠিকই হয়েছে। তারপরও, আমার মনে হয়, ও-রকম কোনো কেসে যদি আজ আমাকে বিচারকের ভূমিকা পালন করতে হতো, তা হলেও একই রায় দিতাম।’
‘কেন?’
সে-সময়ের আদালতের কার্যক্রমের লিখিত প্রতিলিপি যদি দেখে নেন, ভালো হয়। তারপরও বলি… ওই বাচ্চা দুটো… ওরাই কিন্তু দৌড়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল রাস্তার মাঝখানে। রাস্তার ও-প্রান্তে আইসক্রিমের দোকানটা দেখতে পেয়েছিল তারা। তাদের দেখভালের দায়িত্ব ছিল যে-মেয়ের উপর, সে সামান্য কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল ছেলে দুটোর উপর। ওই মেয়েকেও দোষ দেয়া যায় না আসলে। কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখুন, মিসেস ক্যুপার যদি চশমা পরে থাকতেনও, হয়তো সময়মতো থামাতে পারতেন না গাড়িটা।’
‘সে-কারণেই কি তাঁকে বেকসুর খালাস দেয়ার কথা বলেছিলেন আপনি জুরিকে?’ দেখে মনে হলো, হোথর্নের কথা শুনে মনে চোট পেয়েছেন ওয়েস্টন। কিছু বলার আগে চুপ করে থাকলেন কয়েকটা মুহূর্ত। ‘সে-রকম কিছুই করিনি আমি। আর… সরাসরিই বলি… আপনার কথা কিছুটা আক্রমণাত্মক বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। স্বীকার করে নিচ্ছি, আমি যে-রায় দিয়েছিলাম সেটা মিসেস ক্যুপারের পক্ষে গেছে, তারপরও পুরো ঘটনা ভেবে দেখার অনুরোধ জানাবো আপনাকে। ক্রিমিনাল রেকর্ড বলতে কিছুই ছিল না তাঁর, এবং তিনি ছিলেন সম্মানিত একজন মানুষ। ছেলে দুটোর পরিবারের জন্য ওই ঘটনা ছিল খুবই দুঃখজনক, কিন্তু সেটা বিবেচনা করে যদি কোনো রায় দিতাম, তা হলে সে-রায়ও যথোপযুক্ত হতো না।’
সামনের দিকে ঝুঁকল হোথর্ন। শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে এমন কোনো বুনো জন্তুর কথা মনে পড়ে গেল আমার আরও একবার। ‘ভদ্রমহিলাকে চিনতেন আপনি।’
তিনটা সাধারণ শব্দ উচ্চারণ করেছে হোথর্ন, অথচ তাতেই কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছেন ওয়েস্টন। আমার মনে হচ্ছে, যেন দড়াম করে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে কোনো শবকক্ষের দরজা। হঠাৎ করেই যেন বদলে গেছে আমার আশপাশের সব কিছু। নাইজেল ওয়েস্টন যেন হঠাৎই টের পাচ্ছেন, বিপদ হাজির হয়েছে এই ঘরে। আগুনে পুড়ছে কাঠ, সে-আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। সে-উত্তাপ টের পাচ্ছি নিজের চেহারায়।
‘সরি?’ বললেন ওয়েস্টন।
‘আমার মনে হয়, মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে পূর্বপরিচয় ছিল আপনার। এবং আমার আরও মনে হয়, রায় দেয়ার সময় সে-পরিচয় কিছুটা হলেও ভূমিকা পালন করেছে।’
‘আপনার ভুল হয়েছে। মিসেস ক্যুপারকে চিনতাম না আমি।’
দেখে মনে হলো, থতমত খেয়ে গেছে হোথর্ন। ‘রেমন্ড ক্রুন্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল আপনার।
‘আমার মনে হয় না…’
‘রেমন্ড কুন্স… থিয়েটারের প্রযোজক। ওই লোকের নাম তো আপনার ভুলে যাওয়ার কথা না। তাকে কাজে লাগিয়ে অনেক টাকা কামিয়েছেন আপনি।’
আত্মসংবরণ করতে কষ্ট হচ্ছে ওয়েস্টনের। ‘রেমন্ড কুন্সকে ভালোমতোই চিনি আমি।’
‘একটা শো-তে টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন আপনি।’
‘একটা না, দুটো। লা কেইজ অঁ ফলে এবং দ্য ইম্পর্টেন্স অভ বিইং আর্নেস্ট।’
‘দ্বিতীয় নাটকটাতে অভিনয় করেছিল ড্যামিয়েন ক্যুপার। সে-নাটক উপলক্ষে যে-ফার্স্ট নাইট পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল, সেটাতে ড্যামিয়েন আর তার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আপনার। ঠিক না?’
‘না।’
‘কিন্তু দুর্ঘটনার সেই কেস নিয়ে কুন্সের সঙ্গে কথা বলেছিলেন আপনি।’
‘কে বলেছে?’
‘কুন্স নিজেই।’
আর সহ্য করতে পারলেন না ওয়েস্টন। ‘আপনার সাহস তো কম না! আমার বাড়িতে বসে আমারই বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযোগ করে চলেছেন!’ কণ্ঠ চড়াননি তিনি, কিন্তু ক্রোধোন্মত্ত হয়ে গেছেন। যে-আর্মচেয়ারে বসে আছেন সেটার হাতল আঁকড়ে ধরেছেন দুই হাতে। তাঁর চামড়ার নিচের রগগুলো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। ‘ওই পার্টিতে গিয়েছিলাম আমি, কিন্তু ড্যামিয়েন ক্যুপার অথবা তার মা যদি সেখানে গিয়েও থাকে, আমার সঙ্গে দেখা হয়নি তাদের, কথাও হয়নি।’
