‘আসুন, ভিতরে আসুন। আশা করি আপনাদের যাত্রা সুখকর হয়েছে। এত সদয় আর অমায়িক আচরণ করছেন কেন তিনি, ভাবলাম। আমার ধারণা, কেন এসেছি আমরা এখানে, সেটা তাঁকে জানায়নি হোথর্ন।
পুরু কার্পেট, অ্যান্টিক আসবাব আর দামি আর্টে ঠাসা একটা হলওয়ে ধরে তাঁর পিছন পিছন এগিয়ে চলেছি আমরা দু’জন। এরিজ জিল নামের একজন ডিযাইনারের একটা ড্রয়িং চিনতে পারলাম আমি। এরিক র্যাভিলিয়াস নামের এক চিত্রশিল্পীর একটা জলরঙও চোখে পড়ল। দুটোই আসল।
আমাদেরকে ছোট একটা লিভিংরুমে নিয়ে গেলেন নাইজেল ওয়েস্টন। এখান থেকে বাইরের শ্যামলিমা দেখা যায়। একধারের ফায়ারপ্লেসে জ্বলছে আগুন। একটা টেবিলের উপর আগে থেকেই আমাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে কফি আর বিস্কিট।
বসে পড়লাম আমরা।
‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগল, মিস্টার হোথর্ন,’ বলতে শুরু করলেন নাইজেল ওয়েস্টন। ‘বেশ নামডাক আছে আপনার। রাশান রাষ্ট্রদূতের সেই কেসটা… দ্য বেযরুকভ কেস… চমৎকার কাজ দেখিয়েছেন আপনি।’
‘কিন্তু শেষপর্যন্ত অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি তাঁকে,’ মনে করিয়ে দেয়ার কায়দায় বলল হোথর্ন।
‘নিজের জন্য খাসা একজন উকিল নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। আর… আমার ধারণা জুরিকে ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছিল। …কফি খাবেন?’
হোথর্নকে যে আগে থেকেই চেনেন নাইজেল ওয়েস্টন, আশা করিনি ভাবলাম, হোথর্ন যতদিনে বেরিয়ে এসেছে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে, সেই বেযরুকভ কেস কি সে-ঘটনার আগের নাকি পরের? কারণ ওই কেস হোথর্ন তদন্ত করবে… ব্যাপারটা কেমন যেন অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে।
আমাদের তিনজনের জন্যই কফি ঢালছেন নাইজেল ওয়েস্টন। এই সুযোগে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি আমি। ঘরের বড় একটা অংশ দখল করে রেখেছে ক্ষুদ্রকায় একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো। ঢাকনাটা নামানো আছে, সেটার উপর দামি ফ্রেমে ঠাঁই পেয়েছে আধ ডজন ফটোগ্রাফ। চারটা ছবিতে অন্য কোনো লোকের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে ওয়েস্টনকে। একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক লোকের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, তাঁদের দু’জনেরই পরনে হাওয়াইয়ান শার্ট আর শর্টস। আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই, ইতোমধ্যে এই ছবিগুলো দেখা হয়ে গেছে হোথর্নের।
‘তো… ক্যান্টাব্রিতে আসা হলো কেন?’ জানতে চাইলেন ওয়েস্টন।
‘একটা জোড়া খুনের কেস তদন্ত করছি আমি,’ ব্যাখ্যা করল হোথর্ন। ‘ডায়ানা ক্যুপার এবং তাঁর ছেলে।’
‘হ্যাঁ, পড়েছি আমি ওই খুন দুটোর ব্যাপারে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার। মেট্রোপলিটান পুলিশকে পরামর্শ দিচ্ছেন আপনি?’
‘হ্যাঁ, স্যর।’
‘ওরা আপনাকে একেবারেই ছেড়ে না-দিয়ে খুব ভালো কাজ করেছে। …কী ধারণা আপনার… ডিলে যে-দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং তার ফলে যে-ছেলেটা মারা গিয়েছিল, সে-ঘটনার সঙ্গে ওই খুন দুটোর কোনো সম্পর্ক আছে?’
‘আমি কোনো সম্ভাবনাই বাদ দিচ্ছি না, স্যর।’
‘এসব কেসে আবেগ প্রচণ্ড একটা ব্যাপার হতে পারে কখনও কখনও। খেয়াল করেছি, ওই দুর্ঘটনার দশ বছর হতে চলেছে। আর তাই দুর্ঘটনাটাকে হত্যাকাণ্ড- দুটোর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ভাবছি আমিও। …ওই সময়ে আদালতে যেসব রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছিল, ইচ্ছা করলেই তো সেগুলো ঘাঁটতে পারেন আপনি; কাজেই আমি ঠিক কীভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে, বুঝতে পারছি না।’
এখনও একজন বিচারকের মতো কথা বলেন নাইজেল ওয়েস্টন। চিন্তাভাবনা না-করে একটা শব্দও উচ্চারণ করেন না।
‘যে বা যাঁরা জড়িত ছিলেন ওই বিচারকাজের সঙ্গে, আমার মনে হয় তাঁদের সঙ্গে কথা বলাটাও দরকার।’
‘মানলাম। সাক্ষ্য আর লিখিত প্রমাণের মাঝখানে কিছু-না-কিছু পার্থক্য থাকে সব সময়ই। …গডউইন পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন?’
‘হ্যাঁ, স্যর।’
‘তাদের জন্য খুব খারাপ লাগে আমার। তাদের জন্য ওই সময়ও খারাপ লেগেছিল আমার এবং সেটা বলেছিও। তারা ভেবেছিল, আমি বোধহয় ন্যায়বিচার করিনি তখন। কিন্তু, মিস্টার হোথর্ন, আপনাকে বলার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না, তারপরও বলছি… এসব কেসে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবার কী ভাবল না-ভাবল তা আমলে নেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না
‘বুঝতে পেরেছি।’
দরজাটা খুলে গেল এমন সময়, দ্বিতীয় আরেকজন লোককে দেখা গেল। এই লোককে পিয়ানো-উপর-রাখা ফটোগ্রাফে দেখেছি কিছুক্ষণ আগে। লোকটা বেঁটে, বেশ গাঁট্টাগোট্টা, বয়সে ওয়েস্টনের চেয়ে বছর দশেকের ছোট। হাতে একটা সুপারমার্কেটের-শপিংব্যাগ।
‘বাইরে যাচ্ছি আমি,’ বললেন লোকটা, ‘আপনার কিছু লাগবে?’
‘কিচেনে লিস্ট রেখে দিয়েছি।’
‘নিয়েছি ওটা। কোনো কিছু লিখতে ভুলে গেছেন কি না, সেটাই ভাবছিলাম।’
‘আরও কিছু ডিশওয়াশার ট্যাবলেট দরকার আমাদের।’
‘লিস্টে আছে ওটা।
‘তা হলে আর কিছু লাগবে বলে মনে হয় না।’
‘দেখা হবে,’ বলে গায়েব হয়ে গেলেন লোকটা।
‘কলিন,’ গাঁট্টাগোট্টার পরিচয় দিলেন ওয়েস্টন।
‘আপনি যে-রায় দিয়েছিলেন তখন, তাতে পত্রিকাওয়ালারাও খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেনি,’ বলল হোথর্ন। খেয়াল করলাম, অদ্ভুত একজাতের বিদ্বেষ খেলা করছে ওর চোখে।।
একটুখানি হাসলেন ওয়েস্টন। ‘আমি যে-রায় দিয়েছি সেটা নিয়ে পত্রপত্রিকায় কী লেখালেখি হলো, সেসব দেখার স্বভাব কোনোকালেই ছিল না আমার। পত্রিকাওয়ালাদের খুশি হওয়া অথবা বেজার হওয়ার সঙ্গে আসল ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।’
