‘হ্যাঁ… ড্যামিয়েন যদি ঘটিয়ে থাকে দুর্ঘটনাটা, তা হলেও আপসেট হয়ে থাকতে পারেন মিসেস ক্যুপার। আমি বলবো, ওই মহিলা ছিলেন ওই ঘটনার… অন্যভাবে যদি বলি, ওই অপরাধের সহযোগী। …কীভাবে জানি না, কিন্তু যে- কোনোভাবেই হোক না কেন, অ্যালান গডউইন জেনে গিয়েছিল সত্যি কথাটা। আর সে-কারণেই তিনি সুযোগ পাওয়ামাত্র খুন করেছেন মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে। কারণ ওই দুর্ঘটনার জন্য ওই দু’জনই দায়ী।’
আমরা যে-ট্রেনে সওয়ার হয়েছি, সেটার গতি বেড়েছে। পূর্ব লন্ডন ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছি, আস্তে আস্তে কমে আসছে দালানকোঠার সংখ্যা। শ্যামলিমার দেখা মিলছে এখন। সামনে দেখতে পাচ্ছি কিছু খোলা জায়গাও।
‘আপনার থিউরি মনঃপুত হলো না আমার,’ বলল হোথর্ন। ‘ওই দুর্ঘটনার পর মিসেস ক্যুপারের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করার কথা পুলিশের। আরেকটা কথা।
‘কী?’
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন… ভাবখানা এমন, এই কথোপকথন আর চালিয়ে যেতে চাইছে না। কিন্তু তারপর, সম্ভবত, আমার উপর করুণা হলো ওর। ‘আন্ডারটেকার… মানে, মিস্টার কর্নওয়ালিসের কাছে যখন গিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার, তখন ঠিক কী খেলা করছিল তাঁর মনে? এবং ওই ফিউনারেল পার্লারে গিয়ে সবার প্রথমে ঠিক কোন্ জিনিসটা দেখেছিলেন তিনি?’
‘আপনিই বলুন।
‘আমার বলার দরকার নেই, মেইট। এই উপন্যাসের প্রথম চ্যাপ্টারটা যাচ্ছেতাইভাবে লিখে আমাকে দেখিয়েছিলেন আপনি একবার… মনে আছে? আমার প্রশ্নের জবাবটা সেখানে লিখে দিয়েছিলেন আপনি। যা-হোক, আমার মনে হয় যা দেখেছিলেন মিসেস ক্যুপার, সেটা এই কেসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।’
ভাবতে লাগলাম আমি। ওই ফিউনারেল পার্লারে গিয়ে সবার প্রথমে ঠিক কোন্ জিনিসটা দেখেছিলেন মিসেস ক্যুপার?
ওই মহিলার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা।
বাস থেকে নামলেন তিনি। হাঁটতে লাগলেন ফুটপাত ধরে। হ্যাঁ… ফিউনারেল পার্লারের নামটাই সবার আগে দেখেছিলেন তিনি… কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্স। অথবা… অফিসের ঘড়িটা দেখেছিলেন তিনি… তখন সে-ঘড়িতে দুপুর বারোটা বাজতে এক মিনিট বাকি আছে। কিন্তু… এই কেসের সঙ্গে ওই ফিউনারেল পার্লারের নাম অথবা ওই ঘড়ির সম্পর্ক কী? ও… ওই পার্লারের একটা জানালার গোবরাটে মার্বেল দিয়ে একটা বই বানানো ছিল… যে-কোনো আন্ডারটেকারের অফিসেই দেখা যায় ও-রকম কোনো-না-কোনো জিনিস… কিন্তু এসব দেখলে কি বিশেষ কোনো কিছু খেলা করার কথা মিসেস ক্যুপারের মনে? হোথর্ন আমাকে বলেছে, মিসেস ক্যুপার নাকি জানতেন, আজ বাদে কাল মারা যাচ্ছেন তিনি। কেউ একজন হুমকি দিয়েছিল তাঁকে কিন্তু তিনি পুলিশের কাছে যাননি। কেন?
হঠাৎ করেই টের পেলাম, রেগে যাচ্ছি আমি।
‘ঈশ্বরের দোহাই লাগে, হোথর্ন,’ বলে উঠলোম, ‘আমার নাকে দড়ি দিয়ে অর্ধেকটা ইংল্যান্ড ঘুরিয়েছেন আমাকে। কাজেই আমরা আসলে কী করছি, অন্তত সেটা তো বলতে পারেন… নাকি?’
‘সেটা ইতোমধ্যেই বলেছি আপনাকে। জাজ নাইজেল ওয়েস্টনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। তারপর যাবো যেখানে-দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল সেখানে।’
‘তার মানে আপনি ভাবছেন ওই দুর্ঘটনার সঙ্গে এই কেসের সম্পর্ক আছে।’
হাসল হোথর্ন। জানালার কাঁচে ওর চেহারার প্রতিবিম্ব দেখতে পেলাম। ‘দিনশেষে যখন আপনাকে আপনার কাজের জন্য টাকা দেয়া হবে, তখন সব কিছুর সঙ্গে সব কিছুরই কোনো-না-কোনো সম্পর্ক আছে।’
বইয়ে মনোযোগ দিল সে, আর কোনো কথা বলল না।
.
নাইজেল ওয়েস্টন, মানে যে-জাজ দ্য ক্রাউন বনাম ডায়ানা ক্যুপারের কেসটা পরিচালনা করেছিলেন এবং পক্ষপাত দেখিয়েছিলেন দ্বিতীয় পক্ষের প্রতি, থাকেন কেন্টাব্রি’র একেবারে কেন্দ্রস্থলে। তাঁর বাসস্থানের একপাশে আছে একটা গির্জা, আরেক পাশে আছে সেইন্ট অগাস্টিন’স কলেজ। সে-বাসস্থান দেখলে মনে হবে, সারাটা জীবন আইন নিয়ে কাজ করার পরও নিজেকে ঘিরে রাখার জন্য ইতিহাস আর ধর্ম বেছে নিয়েছেন তিনি। কারণ আমাদের চারপাশে এখন প্রাচীন সব দেয়াল আর চূড়া, সেইসঙ্গে পথেঘাটে বাইসাইকেলে সওয়ার হয়ে চলেছেন মিশনারিরা। তাঁর বাড়িটা কেমন চারকোনা, নিরেট, দেখলে মনে হয় সব কিছু বানানো হয়েছে সমান অনুপাতে। যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। জায়গাটা আরামদায়ক, এই শহর আরামদায়ক, এবং চারদিক দেখলে মনে হয় নাইজেল ওয়েস্টন আরামদায়ক একটা জীবন যাপন করছেন।
তাঁর সঙ্গে এগারোটার সময় দেখা করার ব্যাপারটা চূড়ান্ত করেছে হোথৰ্ন। ট্যাক্সি থেকে নেমে ড্রাইভারকে টাকা দিচ্ছি, এমন সময় খেয়াল করলাম আমাদের জন্য সদর দরজায় অপেক্ষা করছেন ওয়েস্টন। তাঁকে দেখলে যতটা না একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যারিস্টার বলে মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হয় একজন সুরকার… সুর-পরিচালকও বলা যেতে পারে সম্ভবত। হালকাঁপাতলা শরীর তাঁর, কেমন রোগাটে বলে মনে হয়। আঙুলগুলো লম্বা লম্বা, মাথায় রূপালি চুল। চোখে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি। বয়স সত্তরের ঘরে। দেখলে মনে হয়, বয়সের ভারে কুঁচকে যাচ্ছেন। ভারী একটা নিট-কার্ডিগান এবং মোটা সুতি কাপড়ের ফুল প্যান্ট পরে আছেন। মনে হচ্ছে ওগুলোর ভিতরে যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। শু পরেননি, বরং স্লিপার পরেছেন। চোখ দুটো গর্তে বসে গেছে। গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। কণ্ঠার হাড় দুটো দেখলে কেমন অনমনীয় বলে মনে হয় তাঁকে।
