চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল হোথর্ন। একরকমের চ্যালেঞ্জ খেলা করছে ওর দৃষ্টিতে। ‘কে?’
‘অ্যালান গডউইন।’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন, তবে সেটা সম্মতি জানানোর কায়দায় না। ‘ডায়ানা ক্যুপারকে খুন করার যথোপযুক্ত কারণ আছে ওই লোকের, কিন্তু আমরা যখন শেষকৃত্যানুষ্ঠানে ছিলাম, তখন তিনিও ছিলেন সেখানে। লন্ডনের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পাড়ি দিয়ে ড্যামিয়েনের ফ্ল্যাটে অত জলদি গেলেন কী করে তিনি?’
‘আমার ধারণা, বিশেষ সেই মিউযিক বাজতে শুরু করামাত্র কবরস্থান ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন তিনি। তা না-হলে আপনিই বলুন, আর কে ওই এমপি থ্রি প্লেয়ারটা রাখতে যাবে কফিনের ভিতরে? আমাদেরকে যা বলেছেন গডউইন, শুনেছেন আপনি। বলেছেন, গানটা নাকি তাঁর ছেলের প্রিয় গান ছিল।’ আমাকে হোথর্ন থামিয়ে দেয়ার আগেই বলে চললাম, ‘ডায়ানা ক্যুপারকে খুন করার কোনো কারণ নেই অন্য কারও। কেন, আপনি কি দোষ চাপাতে চান ওই ক্লিনার মেয়েটার উপর… কারণ সে টাকা চুরি করেছে মিসেস ক্যুপারের বাড়ি থেকে? নাকি দোষী সাব্যস্ত করতে চান রেমন্ড কুলকে… কারণ তিনি কিছু টাকা খসিয়ে নিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপারের কাছ থেকে? কী হলো… চুপ করে আছেন কেন? এই ব্যাপারটা নিয়ে এখনও তর্কাতর্কি করছি আমরা… আশ্চর্য লাগছে আমার কাছে।’
‘আমি কোনো তর্ক করছি না,’ বলল হোথর্ন, শান্ত আছে এখনও। যা বলেছি আমি তা ভাবল কিছুক্ষণ, তারপর কেমন দুঃখিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। ‘দুর্ঘটনাটা যখন যখন ঘটল, মানে.. মিসেস ক্যুপারের গাড়ির নিচে যখন চাপা পড়ল মিস্টার গডউইনের ছেলে দুটো, ড্যামিয়েন তখন নিজেদের বাসায়। ওই দুর্ঘটনার ব্যাপারে কিছুই করার ছিল না তার। কাজেই তাকে কেন খুন করবে গডউইন?’
‘আমার মনে হয় এই প্রশ্নের জবাবও বের করে ফেলেছি আমি। মনে করুন গাড়িটা আসলে ডায়ানা ক্যুপার চালাচ্ছিলেন না। খেয়াল করে দেখুন, মেরি ও’ব্রায়ান কিন্তু ঠিকমতো দেখতে পায়নি মিসেস ক্যুপারের চেহারা। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখেই কিন্তু শেষপর্যন্ত ধরা গেছে ওই মহিলাকে।’
‘তিনি কিন্তু শেষপর্যন্ত গিয়ে হাজির হয়েছিলেন পুলিশ স্টেশনে। ধরা দিয়েছিলেন পুলিশের কাছে।’
‘কাজটা তিনি ড্যামিয়েনকে রক্ষা করার জন্যও করে থাকতে পারেন। … আমার কথা হচ্ছে, যদি বলি গাড়িটা আসলে ড্যামিয়েনই চালাচ্ছিল, তা হলে?’ কথাটা যত ভাবছি, সম্ভাবনাটা ততই প্রকট বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। ‘ড্যামিয়েন, মিসেস ক্যুপারের ছেলে। যে-সময়ে ঘটেছে দুর্ঘটনাটা, সে-সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল সে। হতে পারে… মাত্রাতিরিক্ত মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় ছিল তখন। আবার এমনও হতে পারে, কোকেনের মাত্রাতিরিক্ত ডোজ নিয়ে ফেলেছিল। যে-কোনো কিছু হতে পারে আসলে। মিসেস ক্যুপার জানতেন, এসব কথা যদি জানাজানি হয়… যদি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় ড্যামিয়েন, তার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তাই ওই দুর্ঘটনার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সেজন্যই ভুলে-চশমা- ফেলে-যাওয়ার বানোয়াট গল্পটা বানিয়েছিলেন। এই গল্প বানানোর বিশেষ একটা উদ্দেশ্যও ছিল তাঁর… নিজে যাতে না-ফেঁসে যান আইনের চোখে।’
‘এসব আপনার অনুমান… এসবের পক্ষে উপস্থাপন করার মতো কোনো প্রমাণ নেই আপনার হাতে।
‘সত্যি বলতে কী… আছে।’ এতক্ষণে আমার টেক্কাটা চালোম। ‘আপনি যখন রেমন্ড কুন্সের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তিনি তখন বলেছিলেন, যেদিন লাঞ্চ করেছিলেন মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে… মানে যেদিন খুন হয়েছেন ওই মহিলা… সেদিন তিনি মিসেস ক্যুপারকে টিউব স্টেশন থেকে বের হয়ে আসতে দেখেছেন। আমাকে দেখে হাত নেড়েছিল সে… ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন মিস্টার কুন্স। এখন একটা কথা চিন্তা করে দেখুন। মিস্টার কুন্সকে রাস্তার ওপ্রান্তে দেখে যদি হাত নেড়ে থাকতে পারেন মিসেস ক্যুপার, তার মানে ওই মহিলার দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। যাঁর দৃষ্টিশক্তি আজ থেকে কিছু দিন আগে স্বাভাবিক থাকতে পারে, তাঁর সে-শক্তি বছর দশেক আগে কীভাবে খারাপ হবে? অর্থাৎ ওই দুর্ঘটনার পরে পুলিশের কাছে বানিয়ে কথা বলেছেন মিসেস ক্যুপার।’
বিরল একজাতের হাসি দেখা গেল হোথর্নের ঠোঁটের কোনায়। তবে পরমুহূর্তেই মিলিয়ে গেল সেটা। ‘হুঁ… দেখা যাচ্ছে এই কেসে বেশ মনোযোগ দিতে শুরু করেছেন আপনি।’
‘বুঝলাম, কিছু একটা বলতে চান আপনি,’ ক্লান্ত গলায় বললাম। ‘শুনছি।’
‘ওই টিউব স্টেশন থেকে যখন বের হয়ে এসেছিলেন মিসেস ক্যুপার, তখন যে চশমা ছিল না তাঁর চোখে, কে বলল আপনাকে? এ-রকম কি হতে পারে না, তখন চশমা পরে ছিলেন তিনি?’ হোথর্নকে দেখে মনে হচ্ছে আমার কথায় দুঃখ পেয়েছে যেন। আবার এমনও হতে পারে, আমার যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে কষ্ট পাচ্ছে মনে। ‘মিসেস ক্যুপার চশমা পরে ছিলেন কি না, সে-ব্যাপারে কিন্তু কিছুই বলেননি মিস্টার ক্লন্স। আরেকটা কথা। আপনি বলেছেন, সেদিনের সেই দুর্ঘটনার সময় মিসেস ক্যুপার নাকি গাড়ি চালাচ্ছিলেন না। সেক্ষেত্রে ওই ঘটনার পর গাড়ি চালানো ছেড়ে দিলেন কেন তিনি? কেন বাড়ি বদল করে চলে এলেন অন্য এক জায়গায়? ওই ঘটনার ব্যাপারে যে-ক’জনের সঙ্গে কথা বলেছি, মোটামুটি সবাই বলেছে, ঘটনাটার পর আপসেট হয়ে পড়েছিলেন মিসেস ক্যুপার… যেন এমন কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন, যা আসলে করেননি তিনি।’
