‘দেখুন… আমি আসলে দুঃখিত। হোথর্ন কী করছে না-করছে সে-ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি না আমি। একটা চুক্তি হয়েছে আমাদের মধ্যে। ব্যাপারটা গোপনীয়।’
অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে মিডোস। তার সে-দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে, পেনশনভোগী কোনো বুড়ো লোককে যেন পিটিয়েছি আমি। অথবা খুন করেছি কোনো শিশুকে। এই নিয়ে মিডোসের সঙ্গে তিনবার দেখা হলো আমার। প্রতিবারই তাকে ধীরস্থির, লঘুচিত্ত এবং এমনকী আনাড়ি বলে মনে হয়েছে। প্রতিবারই তাকে জ্যাপ বা লেসট্রেড বলে ভেবেছি আমি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আসলে অবমূল্যায়ন করেছি তাকে। কারণ মিডোসের মতো লোকেরা কখনও কখনও বিপজ্জনকও।
‘অ্যান্টনি, আপনাকে দেখলে কিন্তু মনে হয় না, অনেক কিছু জানেন আপনি। তবে… পুলিশি কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়ার শাস্তি সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানা আছে আপনার?’
‘হ্যাঁ, আছে।’
‘১৯৯১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী, পুলিশের কাজে বাধা সৃষ্টি করলে আপনাকে এক হাজার পাউন্ড জরিমানা গুনতে হতে পারে। এমনকী জেলেও যেতে পারেন।’
‘পাগলামি করছেন আপনি।’
ঠিকই বলেছি আমি। কারণ এখন যেখানে আছি আমরা সেটা একটা পাব, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড না। এবং মিডোস আমাকে ধরে আনেনি, আমিই বরং আমন্ত্রণ জানিয়েছি তাকে।
‘আমি শুধু সহজ একটা প্রশ্নের জবাব জানতে চেয়েছি আপনার কাছে,’ কণ্ঠ কিছুটা কোমল হলো মিডোসের।
‘হোথর্নকে জিজ্ঞেস করুন।’
আমার দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা।
আমিও তাকিয়ে আছি তার দিকে। কী করবে সে, বুঝতে পারছি না। কিন্তু হঠাৎ করেই কেমন যেন শিথিল হয়ে গেল।
বলল, ‘একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার ছেলে যখন শুনল আপনার সঙ্গে দেখা করবো আমি, খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল।’
‘তা-ই?’ জিন অ্যান্ড টনিকের অর্ডার করেছিলাম, নিজের গ্লাসে চুমুক দিলাম একটুখানি।
‘হ্যাঁ। সে আবার অ্যালেক্স রাইডারের বড় একজন ভক্ত।’
‘শুনে ভালো লাগল।’
‘সত্যি বলতে কী…’ হঠাৎ করেই লাজুক হয়ে গেছে মিডোস। সঙ্গে করে চামড়ার একটা ব্রিফকেস নিয়ে এসেছে, হাত ঢুকিয়ে দিল সেটার ভিতরে।
কী ঘটতে চলেছে, বুঝে গেছি আমি। বছরের পর বছর ধরে এ-রকম ঘটনা এবং লোকজনের শারীরিক ভাষা দেখে যা বুঝবার বোঝা হয়ে গেছে আমার।
অ্যালেক্স রাইডার সিরিযের তৃতীয় বই ‘স্কেলিটন কী’ বের করল মিডোস। বইটা একেবারে নতুন। তার মানে এই পাবে আসার আগে কোনো একটা বইয়ের- দোকানে থেমেছিল সে।
বলল, ‘অটোগ্রাফ দিতে নিশ্চয়ই আপত্তি নেই আপনার?’
‘না, না, আপত্তি কীসের? বরং ভালোই লাগবে।’ কলম বের করলাম আমি। ‘ওর নাম কী?’
‘ব্রায়ান।’
বইটা খুললাম আমি। প্রথম পাতায় লিখলাম:
ব্রায়ানকে। তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। আরেকটু হলে আমাকে গ্রেপ্তার করে ফেলেছিলেন তিনি। অনেক শুভকামনা রইল।
স্বাক্ষর করে ফিরিয়ে দিলাম বইটা। ‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল। সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।
‘আমার মনে হয় আপনি বলেছিলেন, আপনাকে সময় দিলে কিছু টাকা দেবেন আমাকে।’
‘ওহ্, হ্যাঁ,’ ওয়ালেট বের করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম। ‘পঞ্চাশ পাউন্ড।’
হাতঘড়ি দেখল মিডোস। ‘আসলে… এক ঘণ্টা দশ মিনিট কথা বলেছি আমি আপনার সঙ্গে। আর এখানে আসতে সময় লেগেছে আরও আধ ঘণ্টা।’
এক শ’ পাউন্ড নিয়ে চলে গেল লোকটা।
ড্রিঙ্কের দামও চুকিয়ে দিলাম আমি। ভাবতে লাগলাম, এত কিছুর বিনিময়ে কী পেলাম?
আদৌ কিছু পেয়েছি কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হতে লাগল।
১৭. ক্যান্টারি
পরদিন কিং’স ক্রস সেইন্ট প্যানক্র্যাসে যখন দেখা হলো হোথর্নের সঙ্গে, দেখতে পেলাম, খোশমেজাজে আছে সে। ইতোমধ্যেই টিকেট কিনে ফেলেছে। আমাকে শুধু আমার টিকেটের দাম দিতে বলল।
ট্রেনের কামরায় একটা টেবিলের দু’প্রান্তে মুখোমুখি বসে পড়লাম আমরা। আমি কিছু বলতে শুরু করার আগেই হুট করে একটা পেপারপ্যাড, একটা কলম আর একটা পেপারব্যাক বই বের করল হোথর্ন। ওই বইয়ের প্রচ্ছদের দিকে তাকালাম। দ্য আউটসাইডার, লিখেছেন আলবেয়ার কামু। ফরাসি ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে ওটা। সেকেন্ড হ্যান্ড এডিশন, পেঙ্গুইন ক্লাসিক।
খুবই আশ্চর্য হলাম। ট্যাবলয়েড খবরের-কাগজ ছাড়া আর কিছু যে পড়ে হোথর্ন, কখনও মনেই হয়নি আমার। মনে হয়নি, কল্পকাহিনির প্রতি কোনো আগ্রহ থাকতে পারে ওর।
বিরক্ত করতে ইচ্ছা করছে না ওকে। কিন্তু ডায়না ক্যুপার আর তাঁর ছেলের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে যে-সমাধান বের করেছি, সেটা বলার জন্যও নিশপিশ করছে আমার ভিতরটা। মিনিট পনেরো চুপচাপ বসে থাকার পর আর সহ্য করতে পারলাম না। এই সময়ে তিন পৃষ্ঠা পড়ে ফেলেছে সে।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘বইটা পড়তে কি ভালো লাগছে আপনার?’
‘কী?’
‘দ্য আউটসাইডার।
‘লাগছে মোটামুটি।
‘তার মানে আধুনিক সাহিত্য ভালো লাগে আপনার।’
হোথর্নের চেহারা দেখে বোঝা গেল, আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছে। বলল, ‘এই বই আমি নিজে পছন্দ করিনি।’
‘মানে?’
‘মানে… একটা বইয়ের-গ্রুপের সঙ্গে জড়িত আছি।’
বইয়ের গ্রুপ! তা-ও আবার হোথর্ন!
বললাম, ‘আমার বয়স যখন আঠারো, তখন ওই বইটা পড়েছি। যা-হোক, আসল কথায় আসি। আমার ধারণা, কে খুন করেছে মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে, সেটা বুঝে ফেলেছি আমি।’
