‘কিন্তু একটা লোক ভালো কাজ করছে বলেই কি তাকে অপছন্দ করতে হবে?’
‘হ্যাঁ। কারণ সে গোদের উপর বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছিল আমাদের সবার জন্য। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত। কাউকে পছন্দ করত না, কারও যুক্তি-পরামর্শ শুনত না। সবচেয়ে বড় কথা, মদ খেত না কখনও। ওই জিনিস না-খাওয়াটা খারাপ কোনো কাজ না, কিন্তু সে-অভ্যাস কোনো কাজেই লাগেনি তার। সন্ধ্যা সাতটা বাজলেই গায়েব হয়ে যেত অফিস থেকে। হয়তো বাসায়, নিজের স্ত্রীর কাছে চলে যেত। কিন্তু অফিসের অনেকেই তখন আড়ালে ফিসফিস করে বলত, অন্য কোথাও নিজের যৌনচাহিদা মেটাতে গেছে। তবে এসব আসলে কোনো ব্যাপার না।’
‘সিঁড়ির ব্যাপারে আমাকে সাবধান থাকতে বলেছিলেন আপনি।’
‘কথাটা আসলে বলা উচিত হয়নি আমার।’ তৃতীয় আরেক রাউন্ড ভদকা মার্টিনি নিল মিডোস। ‘লোকটার নাম ছিল ডেরেক অ্যাবোট। ৬২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক, থাকত ব্রেন্টফোর্ডে। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধী বলতে যা বোঝায়, সে ছিল ঠিক সে-রকম। পঞ্চাশটা দেশে অপারেশন চালিয়ে পাকড়াও করা হয়েছিল তাকে। মেইল আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে চাইল্ড পর্নোগ্রাফিই ছিল তার কাজ। এই ক্রাইম চেইনের শুরুটা হয় কানাডায়, তিন শ’রও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তখন। সন্দেহ করা হয়, যুক্তরাজ্যে মেইন ডিস্ট্রিবিউটরের ভূমিকা পালন করছে অ্যাবোট। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয় তাকে। হোথর্ন তখন পাটনিতে কী যেন করছিল। ওই ব্যাপারে আসলে নিশ্চিত না আমি, কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, সে-সময় সেখানে ছিল সে।’
‘তারপর?’
‘কাস্টোডি অফিসে ছিল অ্যাবোট… সেটা ছিল আমাদের অফিস বিল্ডিঙের দ্বিতীয় তলায়। সেখান থেকে বেইযমেন্টে… মানে, ইন্টারভিউ রুমে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাকে। হোথর্ন তখন স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করতে চায়। সিদ্ধান্ত নেয়, হাতকড়া পরানো অবস্থায় থাকবে অ্যাবোট। অথচ ওই কাজের কোনো দরকার ছিল না। লোকটার বয়স ছিল ষাটের ঘরে। মারামারির কোনো রেকর্ড ছিল না তার যা-হোক, এরপর কী হয়েছিল, আপনি বোধহয় অনুমান করতে পারছেন। বিল্ডিঙের ওই অংশে সেদিন সিসিটিভিও কাজ করছিল না। পরে অ্যাবোট আমাদের কাছে কসম খেয়ে বলেছে, তাকে নাকি ল্যাং মেরেছিল হোথর্ন। অথচ হোথর্ন কথাটা বেমালুম অস্বীকার করে। মাথাটা নিচের দিকে দিয়ে সিঁড়ির চোদ্দটা ধাপ নিচে নেমে যায় অ্যাবোট। পতন ঠেকানোর কোনো উপায়ই ছিল না, কারণ তার দুই হাত পিছমোড়া করে আটকানো ছিল।’
‘ঠিক কী-রকম আহত হয়েছিল লোকটা?’
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালেন মিডোস। ‘ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছিল সাংঘাতিক। শরীরের কয়েকটা হাড়ও ভেঙে গিয়েছিল। সে যদি মারা যেত, জেল খাটতে হতো হোথৰ্নকে।’
আশ্চর্য হলাম না ঘটনাটা শুনে। হোথর্নের ভিতরে প্রচণ্ড রাগ আর অবিচার দেখেছি আমি। যৌন-নিপীড়নকারী কাউকে লাথি মেরে সিঁড়ি থেকে ফেলা দেয়াটা খুবই সম্ভব ওর পক্ষে।
জানতে চাইলাম, ‘পরে কী হয়েছিল অ্যাবোটের?’
‘জানি না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। কিন্তু তারপর তাকে আর কখনও দেখিনি আমরা।’
প্রসঙ্গ বদল করলাম। ‘একজন ডিটেক্টিভ চিফ ইন্সপেক্টর সব সময় সাহায্য– সহযোগিতা করেন হোথৰ্নকে।’
‘রাদারফোর্ড। তাঁর মনে হোথর্নের জন্য নরম একটা জায়গা আছে। তিনিই এই প্যারালাল ইনভেস্টিগেশনের বুদ্ধিটা ঢুকিয়েছেন পুলিশের বড় কর্তাদের মাথায়। আর তাঁর সেই বুদ্ধির ফলেই হোথর্ন কখনও কখনও কাজ পেয়ে যায়। বিশেষ করে যেসব কেসের সমাধান করতে গিয়ে আমরা… মানে, রেগুলার পুলিশ অফিসাররা গলদঘর্ম হই, সেসব কেসে। … মিসেস ক্যুপারের বাসায় গিয়েছিলেন আপনি! দেখেছেন, কীভাবে সব কিছু রেখে দেয়া হয়েছিল হোথর্নের জন্য। সে সরাসরি রিপোর্ট করে রাদারফোর্ডের কাছে। আসলে এভাবে পুরো সিস্টেমটা পাশ কাটিয়ে… ‘ থেমে গেল মিডোস, বুঝতে পেরেছে যা বলা উচিত না তা বলে ফেলছে। হাতঘড়ি দেখল। ‘আর কিছু?’
‘জানি না। আমাকে বলার মতো আর কিছু কি আছে আপনার?’
‘না। তবে আপনি আমাকে এখন কিছু-একটা বলতে পারেন। হোথর্নের পেছন পেছন তো অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বলুন তো, অ্যালান গডউইন নামের কারও সঙ্গে কি দেখা করেছে সে?’
শীতল একটা অনুভূতি হলো আমার পেটের ভিতরে। কখনও কল্পনাও করিনি, এই কেসে হোথর্নের উপর টেক্কা মারার কাজে আমাকে ব্যবহার করবে মিডোস। মনে হলো, আমার সঙ্গে দেখা করতে যে রাজি হয়েছে লোকটা, এটাই হলো তার আসল কারণ। একইসঙ্গে বুঝতে পারলাম, তাকে কোনো কিছু বলতে পারবো না… বলাটা উচিত হবে না। মিডোস যদি খুনির পরিচয় ফাঁস করে দেয়, ভয়ানক একটা বিপর্যয় ঘটে যাবে। বিশেষ এই কাহিনি নিয়ে কোনো বই লেখা হবে না আমার!
আনুগত্য বা বিশ্বস্ততা যা-ই বলি না কেন, গত কয়েকদিনে হোথর্নের প্রতি সে- রকম কোনো এক আবেগ জন্মেছে আমার মনে। মাত্র দু’জন… তারপরও আমরা একটা দল। মিডোস অথবা অন্য কাউকে না, এই কেস সমাধান করতে হবে আমাকে আর হোথৰ্নকে।
দুর্বল গলায় বললাম, ‘অনেকের সঙ্গেই কথা বলছে হোথর্ন, তবে সবগুলো ইন্টারভিউ’র সময় হাজির থাকি না আমি।
‘কথাটা বিশ্বাস করতে পেরেছি বলে মনে হয় না।’
