কাজটা শেষপর্যন্ত সহজই হলো আমার জন্য। ফোন করলাম মেট্রোপলিটান পুলিশে, নাম বললাম মিডোসের; সঙ্গে সঙ্গে, আমার ধারণা, তার মোবাইলে ট্রান্সফার করা হলো লাইনটা। যতক্ষণ কথা বলছিলাম তার সঙ্গে, বায়ুচালিত কোনো একজাতের ড্রিলিঙের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম ব্যাকগ্রাউন্ডে।
প্রথমেই নিজের পরিচয় দিলাম লোকটাকে। কেন দেখা করতে চাই, বললাম সেটা। সন্দীহান হয়ে উঠল সে। দেখা না-করার জন্য এটা-সেটা বাহানা দিতে শুরু করল। হয়তো কেটেই দিত লাইনটা, যদি না… সরাসরিই বলি… ঘুষ দিতাম। অর্থাৎ, প্রতি এক ঘণ্টা সময়ের জন্য ৫০ পাউন্ড করে অফার করলাম। আরও বললাম, এমন কোনো পাবে দেখা করতে চাই, যেখানে ড্রিঙ্ক কিনে খাওয়াতে পারবো তাকে! রাজি হয়ে গেল লোকটা, কিন্তু কণ্ঠে তেমন উৎসাহ নেই।
সেদিন বিকেলেই সোহো’র একটা ক্লাবে দেখা হলো আমাদের।
আসতে দশ মিনিট দেরি হয়ে গেল মিডোসের। আমি ততক্ষণে ওই ক্লাবের উপরতলায় নির্জন একটা কোনা বেছে নিয়েছি নিজেদের জন্য। ভদকা মার্টিনির অর্ডার করল সে… আশ্চর্য হলাম কিছুটা। তার বিশাল পাঞ্জায় ত্রিকোণাকৃতির পানপাত্রটা কেমন হাস্যকর দেখাচ্ছে। মাত্র তিন চুমুকে খালি করে ফেলল ওই পাত্র, তারপর অর্ডার করল আরেকটা ড্রিঙ্ক।
মিডোসের জন্য অনেক প্রশ্ন নিয়ে এসেছি আমি, কিন্তু প্রথমে আমার ব্যাপারে এটা-সেটা অনেক কিছু জানতে চাইল সে। হোথর্নের সঙ্গে কী করে পরিচয় হলো আমার? ওর জন্য বই কেন লিখছি আমি? আমাকে কত টাকা দিয়েছে সে?
জবাব দিলাম সবগুলো প্রশ্নের। কিছু বাড়তি কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলাম, হোথর্নের ব্যাপারে সংশয় আছে আমার মনেও, এবং সে আমার বন্ধু না।
কথাটা শুনে হাসল মিডোস। ‘হোথর্নের মতো কোনো মানুষের কোনো বন্ধু থাকার কথা না। এমন অনেক চোর আর ধর্ষণকারীকে পাকড়াও করেছি আমি, যারা হোথর্নের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল।’
‘খুনখারাপি নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছি আমি, কিন্তু হোথর্নের মতো কারও সঙ্গে পরিচয় হয়নি কখনও।’
আবারও হাসল মিডোস। ‘পরিচয় না-হওয়ারই কথা, কারণ হোথর্নের মতো লোক খুব বেশি নেই। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।’
‘আপনি ঠিক কেন অপছন্দ করেন ওকে, বলবেন?’
‘কী মনে হয় আপনার? আমি আসলে তেমন একটা পাত্তা দিই না তাকে। আমার মনে হয়, তার মতো কাউকে… মানে, যারা আসলে পুলিশের লোক না… পুলিশের কোনো কাজে নিয়োগ দেয়া উচিত না।’
‘ঠিক কী ঘটেছিল, জানতে চাই আমি। কেন চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল ওকে?’
‘আপনি যে দেখা করতে এসেছেন আমার সঙ্গে, সেটা কি জানিয়েছেন হোথর্নকে?’
‘না। তবে সে জানে, ওকে নিয়ে লিখছি আমি। কাজটা সে-ই করতে বলেছে আমাকে। এবং আমি ওকে বলেছি, ওর ব্যাপারে যা-যা জানা দরকার, সেগুলো জেনে নেবো যেভাবেই হোক।’
‘তার মানে আপনিও একটু-আধটু গোয়েন্দাগিরি করতে চান আর কী। …মার্ডার স্কোয়াডের ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলেছে হোথর্ন?’
‘না, বলেনি। আমি আসলে ওর ব্যাপারে বলতে গেলে কিছুই জানি না। এমনকী সে কোথায় থাকে, তা-ও না।’
‘রিভার কোর্ট, ব্ল্যাকফ্রায়ার্স।’
অর্থাৎ ক্লার্কেনওয়েলে যে-ফ্ল্যাটে থাকি আমি, সেটা থেকে মাত্র এক মাইল দূরে।
‘তবে বাসাটা হোথর্নের নিজের না,’ বলে চলল মিডোস।
‘ঠিকানাটা জানেন?’ জিজ্ঞেস করলাম।
মাথা নাড়ল মিডোস। ‘না।’
‘হোথর্ন আমাকে বলেছিল, গ্র্যান্টস হিলে নাকি…’
‘স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর ওই জায়গা ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে তাকে।’
‘আমিও তা-ই ভেবেছিলাম। ওর স্ত্রীর সঙ্গে কি কখনও দেখা হয়েছে আপনার?’
‘একবার। আমাদের অফিসে এসেছিল। অনেক লম্বা… পাঁচ ফুট এগারোর মতো হবে। ককেশিয়ান।’ এমনভাবে বর্ণনাটা দিল মিডোস যে, শুনে আমার মনে হলো, কোনো একটা কেসের কোনো একজন সন্দেহভাজনের ব্যাপারে বলছে। ‘তবে মহিলা যথেষ্ট সুন্দরী, মাথার চুলগুলো সাদা। বয়সে হোথর্নের চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। কিছুটা নার্ভাস প্রকৃতির। সেদিন অফিসে আমার কাছে এসে বলল দেখা করতে চায় হোথর্নের সঙ্গে। তখন তাকে হোথর্নের ডেস্কে নিয়ে গেলাম আমি।’
‘কী নিয়ে কথা হয়েছিল ওদের দু’জনের মধ্যে?’
‘কোনো ধারণা নেই আমার। …হোথর্নের সঙ্গে কেউ মিশত না। আমিও এড়িয়ে চলতাম।’
‘সহকর্মী হিসেবে সে কেমন ছিল?’
‘ভালো না। তার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন না আপনি। ২০০৫ সালে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় সে। অন্য একটা সাব-কমান্ডে ছিল… সাটন আর হেন্ডনে… সেখানে ওরা রাখতে চায়নি তাকে। কেন চায়নি, সেটা হোথর্ন আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার কয়েকদিন পরই বুঝতে পারি।’ থামল মিডোস।
অপেক্ষা করছি আমি।
‘কাজ শেষে একসঙ্গে ড্রিঙ্ক করা আমাদের অভ্যাস। আমরা একজন আরেকজনকে সাহায্য করি। কিন্তু হোথর্ন সে-রকম না। সে অন্য কারও সঙ্গে মেলামেশা করতে পছন্দ করে না। এবং সত্যি বলতে কী, এ-রকম কাউকে পছন্দ করে না কেউ। অথচ কাজেকর্মে সে কিন্তু সাংঘাতিক ভালো। যেসব কেস কখন ও সমাধান করা যাবে না বলে ধরেই নিয়েছিলাম আমরা, সেসব কেসে তাক-লাগানো সমাধান করে দেখিয়েছে সে। তার কাজ করার ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা… সম্পূর্ণ নিজের মতো। কারও অনুমতির তোয়াক্কা না-করেই কখনও কখনও গায়েব হয়ে যেত অফিস থেকে… কারণ হুট করেই কিছু-একটা মনে পড়ে যেত তার, অথবা কিছু-একটা অনুমান করে ফেলত। কিন্তু যা-ই করত, প্রতিবারই দেখা যেত, ঠিক কাজটাই করেছে। হয়তো সে-কারণেই তার উপর আস্তে আস্তে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম আমরা সবাই। তার মতো অ্যারেস্ট রেকর্ড নেই আমাদের ডিপার্টমেন্টের কারও।’
