গত কয়েক দিনে এত বেশি ঘটনা ঘটেছে যে, এটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম আমি।
চিঠিটার ভাঁজ খুলল হোথর্ন। আপনার উপর নজর রেখেছি আমি, জানি কোন্ কোন্ জিনিস খুব প্রিয় আপনার কাছে।’
‘ পড়ল। ‘একটু আগে বললেন, আপনি নাকি হুমকি দেননি মিসেস ক্যুপারকে। কিন্তু চিঠির এই অংশটা সাংঘাতিক শাসানিমূলক বলে মনে হচ্ছে আমার।’
‘আসলে রেগে গিয়েছিলাম তখন। তবে… এই কথার মাধ্যমে তেমন কিছু বোঝাতে চাইনি।’
‘কখন পাঠিয়েছিলেন এই চিঠি?’
‘পাঠাইনি। হাতে হাতে দিয়ে এসেছিলাম।’
‘কখন?’
‘ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করার সপ্তাহখানেক পরে। সেদিন ছিল শুক্রবার… মাসের ছয় বা সাত তারিখ।’
‘অর্থাৎ মিসেস ক্যুপার মারা যাওয়ার আগের উইকএন্ড!’
‘চিঠিটা দিতে ওই বাড়ির ভিতরে ঢুকিনি আমি। দরজার নিচ দিয়ে ঠেলে দিয়েছিলাম।’
‘মিসেস ক্যুপার কি এই চিঠির কোনো জবাব দিয়েছিলেন?’
‘না। তাঁর পক্ষ থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ পাইনি
চিঠিটার দিকে আবার তাকাল হোথর্ন। ‘জানি কোন্ কোন্ জিনিস খুব প্রিয় আপনার কাছে… এই কথার মাধ্যমে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?’
‘কিছুই বোঝাতে চাইনি!’ ডেস্কের উপর দুম করে একটা কিল বসিয়ে দিলেন গডউইন। ‘কিছু-একটা লেখার দরকার ছিল, তাই লিখেছি ওভাবে। আমার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভেবে দেখুন ব্যাপারটা। ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়াটা ভুল হয়েছে আমার। তাকে চিঠি লেখাটাও ভুল হয়েছে। কিন্তু দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায় লোকের, তখন তারা বোকার মতো কিছু কাজ করতে বাধ্য হয়।’
‘একটা বিড়াল ছিল মিসেস ক্যুপারের,’ বলল হোথর্ন। ‘একটা পার্সিয়ান গ্রে। আমার মনে হয় না ওটা দেখেছেন আপনি।’
‘না। কোনো বেজন্মা বিড়াল দেখিনি আমি ওই বাসায়। এবং আপনাকে বলার মতো আর কিছু নেইও আমার। এখনপর্যন্ত নিজের আইডি কার্ডটা আমাকে দেখাননি আপনি। আমি আসলে জানিও না আপনি কে। কাজেই আমি চাই আপনি
এখন চলে যান।
পাশের অফিসে একটা টেলিফোন বেজে উঠল এমন সময়। আমরা এ-বিল্ডিঙে ঢোকার পর এই প্রথম কোনো যান্ত্রিক আওয়াজ শুনতে পেলাম।
‘কিছুক্ষণ আগে বললেন এখান থেকে নাকি বের করে দেয়া হবে আপনাদেরকে,’ বলল হোথর্ন। ‘আর কতদিন সময় আছে আপনার হাতে?’
‘মাস তিনেকের লিয বাজি আছে এখনও।’
উঠে দাঁড়াল হোথর্ন। ‘তা হলে পরে কোথায় পাওয়া যেতে পারে আপনাকে, সেটা জেনে নেবো আমরা।
প্রায় শূন্য অফিসের ভিতর দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এলাম আমরা। বাইরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছে।
রাস্তায় হাজির হওয়ামাত্র একটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন। ‘আগামীকাল ক্যান্টেব্রিতে যাবো আমি।’ হঠাৎ করেই বলল সে। ‘আপনি যাবেন?’
‘ক্যান্টেব্রিতে কেন?’
‘নাইজেল ওয়েস্টনের খোঁজ বের করতে পেরেছি।’
সহসা মনে করতে পারলাম না নামটা।
‘নাইজেল ওয়েস্টন… কিউসি… সিনিয়র ব্যারিস্টার,’ আমাকে মনে করিয়ে দিল হোথর্ন। সেই বিচারক, যিনি বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন ডায়ানা ক্যুপারকে। আর তারপর… ঠিক করেছি, ডিল-এ ঢুঁ মেরে আসবো একবার। আপনার হয়তো ভালো লাগবে, টনি। সাগরের বাতাস একটুখানি হলেও লাগাতে পারবেন গায়ে।’
‘ঠিক আছে,’ বললাম বটে, কিন্তু লন্ডন ছেড়ে কোথাও যেতে চাইছি না আসলে। প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন সব জায়গায় যেতে হচ্ছে আমাকে, এবং গাইড হিসেবে হোথর্ন যখন সঙ্গে থাকে তখন কেন যেন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারি না।
‘দেখা হবে তা হলে।
আমাদের দু’জনের পথ দু’দিকে… আমরা তাই আলাদা হয়ে গেলাম একজন আরেকজনের থেকে।
হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেছি রাস্তার শেষমাথায়, ঠিক তখনই প্রশ্নটা মনে পড়ে গেল আমার। এটা জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু খেয়াল ছুটে গেছে। অ্যালান গডউইন বলেছেন, মিসেস ক্যুপারের মৃত্যুতে খুশি হয়েছেন তিনি। অথচ শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময় তাঁকে কাঁদতে দেখেছি আমি। একটু পর পর রুমাল দিয়ে চোখ মুছছিলেন তিনি। কেন?
আরেকটা কথা।
গডউইন বলেছেন: চশমা না-পরে আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে ওই মহিলা।
কিছুক্ষণ আগে বলেছেন তিনি কথাটা। ওই সময়, খেয়াল করেছি, ক্রোধে অর্ধেক-বুজে এসেছিল তাঁর কণ্ঠ। অথচ আরেকজন সাক্ষী… রেমন্ড ক্লুন্স… বলেছেন সম্পূর্ণ আলাদা একটা কথা।
বাসায় ফেরামাত্র নিজের খাতাপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলাম… বিশেষ কিছু নোট খুঁজছি। ওটা পেতে বেশি সময় লাগল না। এই ব্যাপারটা মিস করেছে হোথৰ্ন… এটা সব সময় আমাদের চোখের সামনেই ছিল, কিন্তু নজর এড়িয়ে গেছে আমাদের দু’জনেরই।
তাকিয়ে আছি বিশেষ সেই নোটের দিকে।
কেন খুন করা হয়েছে মিসেস ক্যুপার এবং তাঁর ছেলেকে, সেটা বোধহয় বুঝতে পেরেছি আমি।
এবং কে করেছে খুন দুটো, তা-ও সম্ভবত জানা হয়ে গেছে আমার। সত্যি বলতে কী, এই ব্যাপারে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে।
টের পেলাম, ক্যান্টেব্রিতে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্গ্রীব হয়ে উঠছি ভিতরে ভিতরে।
কেন যেন মনে হচ্ছে, অন্তত একবারের জন্য হলেও টেক্কা মারতে পারবো এবার হোথর্নের উপর।
১৬. ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর নিডোস
বইয়ের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে… অন্তত তা-ই দেখতে পাচ্ছি আমি; উপলব্ধি করতে পারছি, আরও কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড দরকার আমার। কাজেই ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিডোসের সঙ্গে দেখা করার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।
