কিছু বলার আগে দ্বিধা করলেন গডউইন। ‘না।’
‘আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবেন না, মিস্টার গডউইন। আমি জানি আপনি গিয়েছিলেন সেখানে।’
‘কীভাবে জানতে পারলেন?’
‘মিসেস ক্যুপার তাঁর ছেলেকে বলেছিলেন আপনার কথা। আপনাকে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এবং ড্যামিয়েন ক্যুপারের ভাষ্যমতে, ওই মহিলাকে হুমকি দিয়েছিলেন আপনি।’
‘সে-রকম কিছুই করিনি আমি।’ থামলেন গডউইন, দম নিলেন লম্বা করে। ‘ঠিক আছে, ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কথাটা অস্বীকার করার কিছু আছে বলে মনে হয় না। ঘটনাটা তিন কি চার সপ্তাহ আগের
‘তার মানে মিসেস ক্যুপার খুন হওয়ার দুই সপ্তাহ আগের।
‘আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল জুডিথ, তার সপ্তাহ দু’-এক পরে গিয়েছিলাম মিসেস ক্যুপারের কাছে। ততদিনে আমি আর জুডিথ বুঝে গেছি, আমাদের বৈবাহিক সম্পর্কটা আর টিকিয়ে রাখা যাবে না। আর তখনই গিয়েছিলাম জঘন্য ওই মহিলার কাছে। ভেবেছিলাম, হয়তো সাহায্য করতে পারবে সে। ভেবেছিলাম, হয়তো সাহায্য করতে চাইতেও পারে।’
‘সাহায্য করবেন… আপনাকে? কীভাবে?’
‘টাকা দিয়ে! কেন, আপনি কী ভেবেছিলেন?’ আবারও লম্বা করে দম নিলেন গডউইন। ‘আমার প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো না। ব্যবসা বাড়ানোর আর কোনো সুযোগ নেই এখন। সবারই এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। ওদিকে আমি আর জুডিথ… আমরা দু’জনই শেষ। চব্বিশ বছরের বৈবাহিক জীবন ছিল আমাদের। একদিন হঠাৎ করেই বুঝতে শুরু করলাম আমরা, একই ছাদের নিচে একই ঘরে থাকা আর সম্ভব না আমাদের পক্ষে।’ আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিলেন ঘরের ছাদটা। ‘উপরতলায় এক বেডরুমের একটা ফ্ল্যাট আছে। এখন সেখানেই থাকি। আমার বয়স পঞ্চান্ন। কখনও বাসায় রান্না করে খাই, কখনও বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসি। এখন এই পর্যায়ে এসে ঠেকেছে আমার জীবন। যা-হোক, ওই বজ্জাত মহিলার সঙ্গে কেন দেখা করতে গিয়েছিলাম, জানেন? এই অফিস… আর কিছু দিন পর এখান থেকে বের করে দেয়া হবে আমাদেরকে। হ্যাঁরো-অন-দ্য-হিলে যে-বাড়ি আছে আমাদের, সেটাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। মর্টগেজের রিপেমেন্ট শোধ করে ওই বাড়ি নিজেদের দখলে রাখাটা আর সম্ভব হচ্ছিল না আমাদের পক্ষে। তারপরও এই ব্যাপারটা গায়ে মাখতাম না, যদি না ওই বাড়ি জেরেমির হতো। ওটা ওর বাসা। সেখানে নিরাপদ বোধ করে সে।’ ক্রোধ স্ফুলিঙ্গের মতো ছিটকে উঠল তাঁর দুই চোখে। ‘ওর কথা ভেবেই নিজের মান-মর্যাদা সব গিলে খেয়েছিলাম সেদিন, দেখা করতে গিয়েছিলাম মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে। ভেবেছিলাম, হয়তো সাহায্য পাবো। তার ঠিকানা জানা ছিল আগে থেকেই। পত্রিকা পড়ে জানতে পেরেছিলাম, তার ছেলে একইসঙ্গে নাম আর টাকা কামাই করছে হলিউডে। ভেবেছিলাম, শিষ্টাচার বলে যদি কোনো কিছু থাকে ওই মহিলার ভিতরে, তা হলে যা করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে নিজেকে হয়তো শুধরে নেয়ার চেষ্টা করবে। হয়তো টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করবে আমার পরিবারকে।’
‘সেটা করেছিলেন তিনি?’
‘কী মনে হয় আপনার?’ অবজ্ঞাসূচক চাহনিটা ফিরে এসেছে গডউইনের চেহারায়। ‘বজ্জাত ওই মহিলা আমাকে দেখামাত্র তার বাসার দরজাটা আমার মুখের উপর লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আমি যখন জোর করে ভিতরে ঢুকে পড়লাম, পুলিশে খবর দেয়ার হুমকি দিল।’
‘জোর করে ভিতরে ঢুকে পড়েছিলেন?’ বলল হোথর্ন। ‘মানে কী কথাটার?
‘মানে… তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, আমার সঙ্গে যাতে কথা বলে সে। হুমকি-ধমকি দিইনি… ও-রকম কিছু করার কোনো ইচ্ছাও ছিল না আমার। হিংস্র কোনো আচরণ করিনি ওই মহিলার সঙ্গে… বিশ্বাস করা না-করা আপনাদের ইচ্ছা। বলতে গেলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলাম তার সামনে, আমার কথা শোনার জন্য দশটা মিনিট সময় চেয়েছিলাম তার কাছে।’ একটুখানি থামলেন গডউইন, তারপর আবার বলতে লাগলেন, ‘আমি শুধু কিছু টাকা ধার চেয়েছিলাম ওই মহিলার কাছে। আপনিই বলুন, খুব বেশি কিছু কি চেয়েছিলাম? কিন্তু বজ্জাত মহিলাটা আমার মুখের উপর বলে দিল, তার কাছে নাকি টাকাপয়সা নেই। একটা মানুষ এত নিরুত্তাপ আর নিস্পৃহ হয় কী করে, জানি না। বলল, তার বাড়ি ছেড়ে ওই মুহূর্তে বেরিয়ে যেতে। এবং ঠিক সে-কাজই করেছিলাম আমি। পরে ভীষণ অনুশোচনা হলো আমার… এত বেশি যে, অসুস্থ বোধ করছিলাম… কেন মরতে গিয়েছিলাম ওই বজ্জাত মহিলার কাছে? আসলে মরিয়া না-হলে জীবনেও যেতাম না আমি শয়তানটার বাড়িতে।’
‘আপনি যা-যা বললেন সেসব ঘটনা ওই বাড়ির কোন্ ঘরে ঘটেছিল, মিস্টার গডউইন?’
‘সামনের ঘরে। মানে… লিভিং রুমে। কেন?’
‘তখন ক’টা বাজে?’
‘লাঞ্চের আওয়ার ছিল তখন। তার মানে আনুমানিক বারোটা।
‘অর্থাৎ ঘরের পর্দাগুলো বেঁধে রাখা অবস্থায় ছিল?’
‘হ্যাঁ,’ গডউইনের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, হোথর্নের প্রশ্নে হতবুদ্ধি হয়ে গেছেন।
‘মিসেস ক্যুপার যে বাসায় ছিলেন, সেটা জানলেন কী করে?’
‘জানতাম না। স্রেফ গিয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিলাম ওখানে। কপালগুণে ওই মহিলাকে পেয়ে গেছি
‘এবং পরে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপারের কাছে?’
একটুখানি দ্বিধা করলেন গডউইন। ‘হ্যাঁ।’
পরনের জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল হোথর্ন, বের করে আনল একটা চিঠি… ওটা ওকে দিয়েছিল আন্দ্রিয়া কুভানেক।
