ডেস্কের এপ্রান্তে দুটো চেয়ার আছে। বসে পড়লাম আমরা।
হোথর্নের দিকে নার্ভাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন গডউইন। ‘আপনি পুলিশের অফিসার?’
‘হ্যাঁ… পুলিশের হয়ে কাজ করছি।’
‘আমাকে কি কোনো পরিচয়পত্র দেখাতে পারবেন?’
‘ব্রম্পটন কবরস্থানে কী করছিলেন আপনি?’
জবাব দিলেন না গডউইন।
‘পুলিশ কিন্তু জানে না সেখানে গিয়েছিলেন আপনি,’ বলে চলল হোথৰ্ন, ‘কিন্তু আমি জানি। কথাটা যদি জানিয়ে দিই তাদেরকে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী হয়ে উঠবে তারা। কাজেই আমার ধারণা, পুলিশের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে আমার সঙ্গে কথা বলাটা তুলনামূলকভাবে বেশি সহজ আপনার জন্য।’
দেখে মনে হলো, গডউইন নিজের চেয়ারের ভিতরে ঢুকে গেছেন খানিকটা। ভালোমতো তাকালাম তাঁর দিকে। ব্যর্থতার ভারে আক্রান্ত একজন মানুষ। এবং এই ব্যাপার খেয়াল করে তেমন একটা আশ্চর্য লাগল না আমার। একটা দুর্ঘটনায় দুই ছেলের এক ছেলেকে হারিয়েছেন তিনি। অন্য ছেলেটা মারাত্মক আহত হয়েছে। হয়তো ওই দুর্ঘটনাই তাঁর ব্যর্থতার সূচনা। কারণ ওই ঘটনার পর হারিয়েছেন তিনি নিজের বাড়ি, স্ত্রীর সঙ্গে বলতে গেলে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে তাঁর, আর এখন ব্যবসাতেও ভাটা পড়েছে। আমি জানি… মানে, বুঝতে পারছি, হোথর্নের প্রশ্নের জবাব দেবেন তিনি। কারণ প্রতিরোধ বা লড়াইয়ের কোনো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি না তাঁর ভিতরে।
‘ওই শেষকৃত্যানুষ্ঠানে গিয়ে নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ করিনি আমি?’ বললেন তিনি।
‘কেউ একজন মিসেস ক্যুপারের কফিনের ঢাকনা খুলেছিল এবং সেটার ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে একটা মিউযিক বক্স। এই ব্যাপারে কিছু জানা আছে আপনার?’
‘না।’
‘কিন্তু মিউযিক বক্স যে ঢোকানো হয়েছিল, সেটা তো জানেন? বাজনাটা বাজতে শুনেছিলেন নিশ্চয়ই?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’
‘ওই বাজনার বিশেষ কোনো অর্থ আছে আপনার কাছে?’
জবাব দেয়ার আগে একটু সময় নিলেন গডউইন। দেখতে পেলাম, তাঁর দুই চোখ যেন পরিণত হয়েছে হতাশার গভীর দুটো গর্তে। ‘টিমোথিকে যখন কবর দেয়া হচ্ছিল, তখন ওই মিউযিক বাজিয়েছিলাম আমরা।’ কণ্ঠ কর্কশ হয়ে গেছে তাঁর। ‘ওটা টিমোথির সবচেয়ে প্রিয় গান ছিল।
দেখে মনে হলো, কথাটা শুনে এমনকী হোথর্নও মানসিকভাবে হোঁচট খেয়েছে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না সেটা। আবার শুরু হলো ওর আক্রমণ। ‘মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে কেন গিয়েছিলেন?’ এমনভাবে জানতে চাইল, যেন জবাবটা দাবি করছে। ‘এমন একজন মহিলার শেষকৃত্যে কেন যোগ দিলেন, যাঁকে ঘৃণা করার সবরকমের কারণ ছিল আপনার?
‘কারণ আমি তাকে আসলেই ঘৃণা করতাম!’ দুই গাল লাল হয়ে গেছে গডউইনের। তাঁর ভ্রূ জোড়া কালো আর ঘন, কুঁচকে গেছে ওগুলো, বোঝা যাচ্ছে রেগে গেছেন। ‘ওই মহিলার নির্বুদ্ধিতা আর বেপরোয়া আচরণের কারণেই মারা গেছে আমার আট বছর বয়সী ছেলেটা। আমার আরেক ছেলে… কতই না প্রাণোচ্ছ্বল ছিল সে, হাসাতে পারত সবাইকে… একই কারণে জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে তার। চশমা না পরে আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে ওই মহিলা। তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে গেছি, কারণ সে যে মারা গেছে, সেটা দেখে ভালো লাগছিল। তাকে যে আসলেই দাফন করা হচ্ছে, সেটা দেখতে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ওই দৃশ্য দেখতে পেলে আমার দুঃখকষ্টের অবসান হবে।’
‘আপনার দুঃখকষ্টের অবসান হয়েছে?’
‘না।’
‘এবার বলুন ড্যামিয়েন ক্যুপারের মৃত্যুর ব্যাপারে কী জানেন?’
আমার মনে হচ্ছে, হোথর্ন ইচ্ছা করলে টেনিস খেলোয়াড় হতে পারত। যেন সপাটে র্যাকেট চালিয়েছে সে… বলটা পাঠিয়ে দিয়েছে নেটের ওপ্রান্তে। ওর উদ্যম আর একাগ্রতা একজন টেনিস খেলোয়াড়ের মতোই।
অবজ্ঞার ভঙ্গিতে হাসলেন গডউইন। ‘মিস্টার হোথর্ন, আপনার কি ধারণা, আমি খুন করেছি ওই লোককে? আর সেজন্যই কি জানতে চেয়েছেন, মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর কী করেছি? …ওই অনুষ্ঠানের পর সোজা হাঁটা ধরি আমি… অনেকক্ষণ হেঁটেছি রাস্তায় রাস্তায়… কিং’স রোড ধরে চলে গেছি একেবারে থেমস নদীর পাড়ে। তবে হ্যাঁ, কোনো সাক্ষী নেই… মানে, আমাকে অতটা পথ হাঁটতে দেখেনি কেউ। আমি কোথায় ছিলাম তখন, সেটা আপনাকে বলে দেয়ার মতোও কেউ নেই। কিন্তু… একটা কথা ভেবে দেখুন… আমি কেন কোনো ক্ষতি করতে চাইবো ওই লোকের? সেদিনের সেই দুর্ঘটনার সময় সে তো চালাচ্ছিল না গাড়িটা। সে তখন ছিল তাদের বাসায়।’
‘হয়তো তাকে রক্ষা করার জন্যই তার মা গাড়ি না-থামিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন সেদিন।’
‘যদি কাজটা করেও থাকে ওই মহিলা, নিজের সিদ্ধান্তে করেছে। কাপুরুষের মতো, স্বার্থপরের মতো একটা কাজ করেছে সে, কিন্তু ওই ব্যাপারে তো কিছু করার ছিল না তার ছেলের!
আমি যা ভাবছিলাম, সেটারই যেন বহিঃপ্রকাশ ঘটল গডউইনের কথায়। ডায়ানা ক্যুপারকে খুন করার সব রকমের কারণ থাকতে পারে অ্যালান গডউইনের, কিন্তু নিজের রাগটা ওই মহিলার ছেলের উপর ঝাড়তে যাবেন কেন তিনি?
চুপ করে আছেন গডউইন, চুপ করে আছে হোথর্ন। তাঁদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, এতক্ষণ যেন বক্সিং করছিলেন দু’জন, এবং এইমাত্র একটা রাউন্ড শেষ হয়েছে।
বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না নীরবতা। হোথর্ন বলল, ‘মিসেস ক্যুপারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন আপনি।’
