ভিক্টোরিয়া জায়গাটা মোটেও ভালো লাগে না আমার। সেখানে বলতে গেলে যাই না কখনও। কেনই বা যাবো? এই জায়গা লন্ডনের অদ্ভুত এক জায়গা… বাকিংহাম প্যালেসের এমন এক প্রান্তে অবস্থিত, যা আমার দৃষ্টিতে ভুল বলে মনে হয়। যতদূর জানি, ওখানে ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট নেই, প্রয়োজনীয় কোনো কিছু বিক্রি করা হচ্ছে এমন কোনো দোকান নেই। সিনেমা হল নেই একটাও। তবে দুটো থিয়েটার আছে। ভিক্টোরিয়া স্টেশনটাও এত পুরনো আমলের যে, সেখানে যদি কখনও হাজির হয় বাষ্পচালিত কোনো ট্রেন, আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে বলে মনে হয় না। সে-স্টেশন ছাড়িয়ে যাওয়ামাত্র আমার মনে হয়, একইরকম দেখতে জীর্ণশীর্ণ কতগুলো রাস্তার একটা জংশনে উপস্থিত হয়েছি যেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কর্তৃপক্ষ কিছুসংখ্যক গাইড দাঁড় করিয়ে দিয়েছে স্টেশনের সামনে; তাদের মাথায় থাকে বোলার হ্যাট, ট্যুরিস্টদের বিভিন্ন রকমের উপদেশ দেয় তারা। ওই লোকগুলোর প্রতি কোনো উপদেশ যদি দিতে বলা হয় আমাকে, তা হলে আমি তাদেরকে অন্য কোথাও চলে যেতে বলবো।
অ্যালান গডউইন কাজ করেন এখানেই। একটা প্রতিষ্ঠান চালান তিনি। কনফারেন্সের আয়োজন করে তাঁর সে-প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ীদের জন্য সামাজিক কিছু অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে। ১৯৬০ সালের একটা বিল্ডিঙের দ্বিতীয় তলায় তাঁর অফিস। ওই ভবনের বেহাল দশা হয়েছে আবহাওয়ার ছোবলে; ওটা দাঁড়িয়ে আছে সরু একটা রাস্তার শেষমাথায়। আকর্ষণহীন কিছু ক্যাফে দিয়ে গিজগিজ করছে রাস্তাটা। অনতিদূরে আছে একটা কোচ স্টেশন
আমি যখন হাজির হলাম সেখানে, তখন বৃষ্টি পড়ছে। আজ সকাল থেকেই মেঘলা ছিল আবহাওয়া। রাস্তার ধারের ফুটপাতগুলোয় জায়গায়-জায়গায় গর্ত আছে; বৃষ্টির পানি জমে গিয়ে সেগুলোতে তৈরি হয়েছে ছোটখাটো ডোবা। কোচ চলছে; রাস্তায় জমে থাকা পানি ছিটকে দিয়ে যাচ্ছে সেগুলো।
হাজির হলাম অ্যালান গডউইনের অফিসে। দরজায় ঝুলছে একটা সাইনবোর্ড: ডিয়ারবয় ইভেন্টস। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম লেখাটার দিকে… কোত্থেকে এল ওটা, ভাবছি। মনে পড়তে বেশি সময় লাগল না। হারল্ড ম্যাকমিলান নামের এক রক্ষণশীল ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ বলেছিলেন কথাটা একবার। তাঁকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাজনীতিবিদেরা আসলে কী ভয় পান। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘ইভেন্সট, ডিয়ার বয়, ইভেন্টস।’
ছোট এবং অসম আকৃতির একটা রিসিপশন রুমে নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে।
অ্যালান গডউইনের ব্যবসা কেমন চলছে, তা বুঝতে গোয়েন্দা হতে লাগে না। এই অফিসের আসবাবগুলো দামি, কিন্তু কেমন একটা শীর্ণতার ছাপ সবগুলোতে। ব্যবসাসংক্রান্ত যেসব ম্যাগাজিন ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে একধারের একটা টেবিলের উপর, অনেক আগেই পুরনো হয়ে গেছে সেগুলো। পাত্রে লাগানো গাছগুলো হারিয়েছে সতেজ ভাব। কেমন একটা উদসীনতার ছাপ রিসিপশনিস্টের চেহারায়, এবং সেটা গোপন করার কোনো চেষ্টাই করছে না সে। তার ডেস্কে রাখা টেলিফোনটা বাজছে না। একদিকের একটা ডিসপ্লে শেল্ফে রাখা আছে কিছু পুরস্কার। ওগুলো দেয়া হয়েছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে, যাদের নামই শুনিনি কখনও।
হোথর্ন ইতোমধ্যেই হাজির হয়ে গেছে এখানে, হাবভাবে ধৈর্যহীনতার লক্ষণ নিয়ে বসে আছে একদিকের একটা সোফায়। ওকে দেখে মনে হচ্ছে, অপরাধের প্রতি নেশাগ্রস্ত সে, এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতে তর সইছে না।
আমাকে দেখামাত্র বলল, ‘দেরি করে ফেলেছেন।’
হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। তিনটা বেজে পাঁচ মিনিট। ‘কেমন আছেন?’ জানতে চাইলাম। ‘আপনার উইকএন্ড কেমন কাটল?’
‘ভালো।’
‘কিছু করেছেন এই উইকএন্ডে? কোনো সিনেমা-টিনেমা দেখেছেন?
কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল সে। ‘আপনার কী হয়েছে, বলুন তো?’
‘কিছু না।’ বসে পড়লাম হোথর্নের মুখোমুখি। ‘রেমন্ড কুন্সকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে… জানেন নাকি?’
মাথা ঝাঁকাল হোথর্ন। ‘খবরের কাগজে দেখলাম। পঞ্চাশ হাজার খসিয়েছিলেন তিনি ডায়ানা ক্যুপারের কাছ থেকে; খবরটা জানামাত্র আমার মনে হয়েছিল, ধোঁকাবাজি করেছেন আসলে।’
‘হতে পারে, মিসেস ক্যুপার হয়তো কিছু-একটা জেনে ফেলেছিলেন কুন্সের ব্যাপারে। আর হয়তো সে-কারণেই কুন্স শেষ করে দিয়েছেন ওই মহিলাকে।’
আমার কথা শুনে এমন এক প্রতিক্রিয়া দেখা দিল হোথর্নের চেহারায় যে, মনে হলো, এই চিন্তা ইতোমধ্যেই বাতিল করে দিয়েছে সে। ‘আপনি কি তা-ই ভাবছেন?’
‘ব্যাপারটা সম্ভব।’
রিসিপশন এরিয়ায় হাজির হলো যুবতী এক মেয়ে। জানাল, মিস্টার গডউইন দেখা করতে চান আমাদের সঙ্গে। সংক্ষিপ্ত একটা করিডর ধরে পথ দেখিয়ে আমাদেরকে নিয়ে গেল সে গডউইনের কামরার সামনে। দরজা খুলে বলল, ‘আপনার ভিটিররা চলে এসেছেন, মিস্টার গডউইন।’
ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমরা।
দেখামাত্র চিনতে পারলাম অ্যালান গডউইনকে। মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে দেখেছি তাঁকে। তিনিই সেই উসুখুসু চুলের লম্বা লোক, যার হাতে সাদা রঙের রুমাল ছিল। এখন তিনি বসে আছেন একটা ডেস্কের পেছনে, আর তাঁর পেছনে দেখা যাচ্ছে একটা জানালা। তাঁর কাঁধ ছাড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি সেই কোচ স্টেশনটা। গোল গলার একটা জার্সির উপর একটা স্পোর্টস জ্যাকেট পরেছেন তিনি। তাকানোর ভঙ্গি দেখে অনুমান করে নিলাম, আমাদেরকে চিনে নিতেও কষ্ট করতে হয়নি তাঁকে। সঙ্গে সঙ্গে চেহারাটা ঝুলে গেল তাঁর।
