‘হোথর্ন। ড্যানিয়েল হোথর্ন। তবে নিজের নামের প্রথম অংশটা ব্যবহার করতে চায় না সে।
‘সে একজন গোয়েন্দা?’
‘এককালে তা-ই ছিল।’
‘তার মানে এখন বেকার। অদ্ভুত এক লোকের পেছনে ঘুরছেন… বেকার একজন গোয়েন্দা। ও-রকম কোনো নামই দিয়েছেন নাকি বইটার? …ওই বইয়ের কোনো নাম ঠিক করেছেন?’
‘না।’
চটে উঠল হিলডা, ওয়াইনের গ্লাসটা সশব্দে নামিয়ে রাখল টেবিলের উপর। কেন এই কাজে রাজি হলেন, বুঝতে পারছি না। ওই লোককে কি বিশেষ ভালো লেগে গেছে আপনার?’
‘না।’
‘তা হলে?’
‘লোকটা খুবই চালাক।’
‘তা-ই? এখনও কিন্তু রহস্যের সমাধান করতে পারেনি সে।’
আমাদের মেইন কোর্স নিয়ে ওয়েইটার হাজির হলো এমন সময়। গত কয়েকদিনে যেসব ইন্টারভিউ নিয়েছি আমি আর হোথর্ন, সেগুলোর কিছু কিছু বললাম হিলডাকে।
আমার কথা শেষ হলে সে বলল, ‘এই হোথর্ন লোকটা আসলে কে? ঠিক কোন্ কাজে মজা পায়? মল্টের হুইস্কি খায় নাকি? ক্লাসিক কোনো গাড়ি চালায়? জ্যায বা অপেরা পছন্দ করে? কোনো কুকুর আছে তার?’
‘হোথর্নের ব্যাপারে আসলে তেমন কিছু জানি না আমি। তবে এটা জানি, বিয়ে করেছিল এককালে, এবং এগারো বছর বয়সী একটা ছেলে আছে তার। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সিঁড়ি থেকে কাউকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল খুব সম্ভব। সমকামী পুরুষদের পছন্দ করে না মোটেও… কেন করে না, জানি না।’
‘নিজেও সমকামী নাকি?’
‘না। তবে সে নিজের ব্যাপারে কিছু বলতে ঘৃণা করে। আসলে আমাকে ওর কাছে ঘেঁষতে দিতে চায় না।’
‘তা হলে তার ব্যাপারে লিখবেন কীভাবে?’
‘যদি সে রহস্যটার সমাধান করতে পারে…’
‘কোনো কোনো কেস সমাধান করতে বছরের পর বছর লেগে যায়। আপনি কি আপনার জীবনের বাকিটা সময় ওই লোকের পেছন পেছন লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকবেন? যা-হোক, ওই বই যদি লেখেন শেষপর্যন্ত, পাত্র-পাত্রীদের নাম বদলে দিতে হবে। লোকজনের বাসায় হুটহাট করে ঢুকে পড়ে তাদেরকে নিয়ে বই লিখতে পারেন না আপনি!’ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে হিলডা। ‘আর… আমাকে নিয়েও যদি কিছু লেখেন ওই বইয়ে, নামটা বদলে দেবেন আমার। আমি অবশ্য চাই না আমাকে নিয়ে কিছু লেখা হোক জঘন্য ওই বইয়ে।’
‘দেখুন, কেসটা কিন্তু ইন্টারেস্টিং,’ বললাম আমি, জোর খাটানোর চেষ্টা করছি আসলে। ‘এবং আমার মনে হয় হোথর্ন একজন ইন্টারেস্টিং মানুষ। দরকার হলে ওর ব্যাপারে আরও কিছু জানার চেষ্টা করবো আমি।’
‘কীভাবে?’
একজন ডিটেক্টিভের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে আমার। তাঁকে দিয়েই শুরু করবো।’ চার্লি মিডোসের কথা ভাবছি। তাকে যদি একটা ড্রিঙ্ক কিনে দিই, তা হলে হয়তো আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়ে যাবে।
‘টাকা-পয়সার ব্যাপারে মিস্টার হোথর্নের সঙ্গে কথা হয়েছে আপনার?’ জানতে চাইল হিলডা।
ঠিক এই প্রশ্নেরই ভয় পাচ্ছিলাম। ‘আধাআধির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে…’
‘কী?’ আরেকটু হলে হাত থেকে কাঁটাচামচ ফেলে দিয়েছিল হিলডা। ‘আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? চল্লিশটা উপন্যাস লিখেছেন আজপর্যন্ত। আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক। আর মিস্টার হোথর্ন একজন বেকার গোয়েন্দা। তাঁর উচিত আপনাকে পারিশ্রমিক হিসেবে টাকা দেয়া, অথচ…। আর বখরার কথা যদি বলেন, তাঁকে তো বিশ শতাংশের বেশি দেয়ার কোনো যুক্তিই দেখি না!’
‘কিন্তু গল্পটা তো ওর!
‘যারই হোক, সে-গল্প লিখছেন আপনি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল হিলডা। ‘আপনি কি আসলেই এই কাজ চালিয়ে যেতে চান?’
‘পিছিয়ে আসার ব্যাপারে দেরি হয়ে গেছে। যা-হোক, সত্যি বলতে কী, আমি এখনও নিশ্চিত না, কাজটা আসলেই করতে চাই কি না। …ড্যামিয়েন ক্যুপারের ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখেছি নিজের চোখে।’ নিজের স্টেইকের দিকে তাকালাম, নামিয়ে রাখলাম কাঁটাচামচ। ‘আসল কথা হচ্ছে, মিসেস ক্যুপার আর তাঁর ছেলেকে খুন করেছে কে, সেটা জানতে চাই আমি।’
‘ঠিক আছে,’ এমন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল হিলডা যে, দেখে মনে হলো, যা করতে চলেছি আমি তা কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না, কিন্তু ওই ব্যাপারে কোনো দোষ নেই তার। ‘মিস্টার হোথর্নের নম্বরটা দিন আমাকে। তার সঙ্গে কথা বলবো। একইসঙ্গে আপনাকে সাবধান করে দিয়ে বলতে চাই, আরও দুটো বই লেখার ব্যাপারে আপনি কিন্তু চুক্তিবদ্ধ। এবং সে-বই দুটোর কমপক্ষে একটা উনিশ শতকের উপর ভিত্তি করে লেখার কথা আছে। আর… মিস্টার হোথর্নকে নিয়ে যে-বই লিখতে চলেছেন, আপনার প্রকাশকরা সেটার ব্যাপারে আদৌ আগ্রহী হবেন কি না, আমি নিশ্চিত না।’
লাঞ্চের পর ভিক্টোরিয়ার উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। নিজেকে একজন স্কুলপালানো বালকের মতো মনে হচ্ছে। কেন হঠাৎ করেই সব কিছু গোপন করার চেষ্টা করছি সবার কাছ থেকে? হোথর্নের ব্যাপারে কিছুই বলিনি আমার স্ত্রীকে। আর এখন… চুপিসারে রওয়ানা হয়েছি হোথর্নের সঙ্গে আবারও দেখা করার উদ্দেশ্যে, অথচ হিলডাকেও কিছু বলিনি এই ব্যাপারে। কেঁচোর মতো গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে আমার জীবনে ঢুকে পড়ছে হোথর্ন, এবং এমন এক পদ্ধতিতে কাজটা করছে, যা অবশ্যই অমঙ্গলজনক। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার, ওর সঙ্গে আবার দেখা করার জন্য মুখিয়ে আছি– এই কেসে কোথাকার জল গড়িয়ে কোনদিকে যাচ্ছে তা জানার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছি। কিছুক্ষণ আগে সত্যি কথাটাই বলেছি হিলডাকে… আমি আসলে ফেঁসে গেছি।
