‘এই যে… এর নামই অ্যান্ড্রিউ,’ পরিচয় করিয়ে দিল বারবারা। তাকাল বড় ছেলের দিকে। ‘এঁরা পুলিশের লোক।
‘পুলিশের লোক? কেন? কী হয়েছে?’
‘তোমার চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি, অ্যান্ড্রিউ। হোমওয়ার্ক শেষ করেছ?’
মাথা ঝাঁকাল ছেলেটা।
‘তা হলে ইচ্ছা করলে টেলিভিশন দেখতে পারো।’ ছেলের উদ্দেশে হাসল বারবারা। ‘স্কুলে যে-নাটকে অভিনয় করেছ তুমি আজ, সেটার ব্যাপারে এই দুই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিলাম আমরা। মিস্টার পিনোকিও!’
‘আমি যখন বড় হবো,’ বলছে অ্যান্ড্রিউ, ‘তখন একজন অভিনেতা হবো।’
‘ওসব নিয়ে এখনই কথা বলার দরকার নেই, অ্যান্ড্রিউ,’ বলে উঠল কর্নওয়ালিস। ‘আমাদেরকে যদি সাহায্য করতে চাও, বাগানে গিয়ে তোমার ভাইদের বলো, ঘুমাতে যাওয়ার সময় হয়েছে।
বাগানে এতক্ষণে ক্লাইম্বিং ফ্রেমের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছে টবি আর সেবাস্টিয়ান। একে অপরের উদ্দেশে চিৎকার করছে সমানে। অতিমাত্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে দু’জনই।
মাথা ঝাঁকাল অ্যান্ড্রিউ। যা করতে বলা হয়েছে তাকে, সেটা করার জন্য রওয়ানা হলো বাগানের উদ্দেশে।
‘আপনাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পারি?’ কর্নওয়ালিসের উদ্দেশে বললাম আমি। জানি পরে এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে রাগ করতে পারে হোথর্ন, তারপরও কৌতূহল বোধ করছি। ‘এই কেসের সঙ্গে আদৌ কোনো যোগসূত্র নেই আমার প্রশ্নটার, তারপরও জানতে ইচ্ছা করছে, জীবিকার জন্য এই কাজ বেছে নিলেন কেন।
‘মানে আন্ডারটেকার হলাম কেন, সেটাই তো জানতে চাইছেন?’ দেখে মনে হলো না, আমার প্রশ্ন শুনে বিব্রত হয়েছে কর্নওয়ালিস। ‘আসলে এই কাজ আমি বেছে নিয়েছি বলার চেয়ে, বলা ভালো, এই কাজই বেছে নিয়েছে আমাকে। দক্ষিণ কেনসিংটনে আমাদের যে-অফিস আছে, সেটার দরজায় একটা সাইনবোর্ড লাগানো আছে… দেখেছেন বোধহয়। এটা আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। আমার মনে হয় এই ব্যবসা চালু করেছিলেন আমার দাদার দাদার দাদা, তারপর থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এটা চলে আসছে আমাদের মধ্যে। একদিন হয়তো আমার তিন ছেলের কোনো একজন আমার থেকে বুঝে নেবে ব্যবসার দায়িত্ব।’
বাইরে অন্ধকার ঘনাচ্ছে। টবি আর সেবাস্টিয়ান তাদের বড় ভাইয়ের সঙ্গে তর্কাতর্কি করছে… বাসায় ফিরতে চাইছে না তারা, ওদিকে অ্যান্ড্রিউ চেষ্টা করছে ওদেরকে ফিরিয়ে আনতে।
কর্নওয়ালিস বলল, ‘কিছু মনে করবেন না… আর কোনো প্রশ্ন যদি জিজ্ঞেস না- করার থাকে আপনাদের, তা হলে এখন বরং আসুন আপনারা। টবি আর সেবাস্টিয়ানকে ঘুম পাড়াতে হবে।’
উঠে দাঁড়াল হোথর্ন। ‘খুব উপকার করলেন আমাদের।’
কথাটা আদৌ সত্যি কি না, সন্দেহ আছে আমার।
বারবারা বলল, ‘আপনারা যদি কিছু জানতে পারেন, তা হলে আমাদেরকে জানাবেন? বিশ্বাস করতে এখনও কষ্ট হচ্ছে আমার, খুন করা হয়েছে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। প্রথমে তার মা, তারপর সে। এরপর কে, সেটাই ভাবছি!’
উঠে বাগানে চলে গেল… ছেলেদেরকে ফিরিয়ে আনবে।
আমাদেরকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল কর্নওয়ালিস।
আমরা যখন শেষবিকেলের ধূসর আলোয় শানবাঁধানো ফুটপাতে বেরিয়ে এসেছি, তখন কর্নওয়ালিস বলল, ‘আপনাদেরকে আরেকটা কথা বলা উচিত বলে মনে করছি। অবশ্য… কথাটা প্রাসঙ্গিক হবে কি না বুঝতে পারছি না… ‘
‘বলুন,’ বলল হোথর্ন।
‘দু’দিন আগে একটা টেলিফোন কল এসেছিল আমার। কেউ একজন ফোন করে জানতে চেয়েছিল, কবে এবং কোথায় অনুষ্ঠিত হবে মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠান। ওপ্রান্তের কণ্ঠটা ছিল একজন পুরুষের। লোকটা বলেছে, সে নাকি মিসেস ক্যুপারের বন্ধু এবং তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দিতে চায়। আমি তখন তার নাম জানতে চাইলাম, কিন্তু সেটা বলতে অস্বীকৃতি জানাল সে। সত্যি বলতে কী… লোকটার আচরণ তখন… কী বলবো… সন্দেহজনক লেগেছিল আমার কাছে। তাকে উন্মত্ত বা বিকৃতমস্তিষ্ক বলছি না, কিন্তু তার কণ্ঠ শুনে আমার মনে হয়েছিল, প্রচণ্ড কোনো মানসিক চাপের মধ্যে আছে। নার্ভাস বলে মনে হচ্ছিল তাকে। এমনকী, কোত্থেকে ফোন করেছিল সে, সেটাও বলেনি।
‘আপনি যে ওই শেষকৃত্যের তদারকিতে আছেন, সেটা ওই লোক জানল কী করে?’
‘কথাটা আমিও ভেবেছি, মিস্টার হোথর্ন। আমার কী মনে হয়, জানেন? আমার মনে হয়, ওই লোক আমাকে ফোন করার আগে পশ্চিম লন্ডনের সমস্ত আন্ডারটেকারকে ফোন করেছে এবং তাদের সবার কাছে একই কথা জানতে চেয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, আমাদের প্রতিষ্ঠান যেহেতু অন্য সবার চেয়ে বড় এবং একনামে-পরিচিত, সেহেতু আমাদেরকে দিয়েই শুরু করেছে খোঁজখবর। যা-হোক, আমি তখন খুব বেশিকিছু চিন্তা করিনি এই ব্যাপারে। ওই লোক যা-যা জানতে চেয়েছিল, বিস্তারিত বলে দিয়েছি। কিন্তু আজ যখন আইরিন বলল কী ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেছে মিসেস ক্যুপারের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে, তখন মনে পড়ে গিয়েছিল রহস্যময় সেই লোকের কথা।
‘লোকটা যে-নম্বর থেকে ফোন করেছিল আপনাকে, সেটা বোধহয় নেই আপনার কাছে, না?’
‘আছে। আমাদের কাছে যতগুলো ইনকামিং কল আসে, সবগুলোর রেকর্ড রাখি আমরা। …একটা মোবাইল নম্বর থেকে আমাকে ফোন করেছিল লোকটা। নম্বরটা দেখা গিয়েছিল আমাদের সিস্টেমে।’ পকেট থেকে একটা ভাঁজকরা কাগজ বের করে হোথর্নকে দিল কর্নওয়ালিস। ‘সত্যি বলতে কী, এটা আপনাকে দেবো কি না, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। আমি আসলে কাউকে কোনো ঝামেলায় ফেলতে চাই না!’
