‘আপাতদৃষ্টিতে আর কোনো ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। তবে… পুরো ব্যাপারটা আমার অভিজ্ঞতার বাইরে… মানে, এ-রকম কিছু দেখিনি আগে কখনও।’ ক্রিসটা মুখে দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল হোথর্ন, কী যেন ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর ওটা রেখে দিল বোলে। ‘কেউ একজন একটা এমপিথ্রি রেকর্ডিংযুক্ত অ্যালার্ম ক্লক রেখে দিল কফিনের ভিতরে। সাড়ে এগারোটার সময় বাজতে শুরু করল ওই ঘড়ি… চালু হয়ে গেল একটা নার্সারি রাইম। কাজেই যদি বাজি ধরি কেউ একজন ইচ্ছাকৃতভাবে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করেছে কাজটা, তা হলে মনে হয় না ভুল হবে। আমি এখন যা জানতে চাই তা হলো, ওই ঘড়ি কীভাবে গেল মিসেস ক্যুপারের কফিনের ভিতরে।’
‘কোনো ধারণা নেই আমার।
‘একটু ভেবে বলছেন না কেন?’ দেখে মনে হচ্ছে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছে হোথর্ন। বিরক্ত হওয়ারই কথা। সারা বাড়ি অগোছালো, বাগানে সমানে চিৎকার করছে বাচ্চা দুটো… সেই তখন থেকে লাফিয়েই চলেছে, এদিকে কুড়মুড় শব্দে ক্রিস চিবুচ্ছে বারবারা… উইলসডেন গ্রীন, মানে এই বাসার সব কিছু বোধহয় স্নায়ু ধ্বংস করে দিচ্ছে হোথর্নের।
এমন এক দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকাল কর্নওয়ালিস যে, দেখে মনে হলো, সে বোধহয় সাহায্য প্রার্থনা করছে ওই মহিলার কাছে। তারপর তাকাল হোথর্নের দিকে। ‘আপনাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, আমার অধীনে কাজ করে, এমন কেউ ওই ঘড়ি রাখেনি মিসেস ক্যুপারের কফিনের ভিতরে। কর্নওয়ালিস অ্যান্ড সন্সে যে বা যারাই আছে, তারা কম করে হলেও পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে। তাদের বেশিরভাগই আমাদের পরিবারেরই সদস্য- কাছের বা দূরের আত্মীয়। আমি নিশ্চিত কথাটা আপনাকে আগেও বলেছে আইরিন। যা-হোক, হ্যাঁমারস্মিথে আমাদের একটা কেন্দ্রীয় মর্গ আছে, হাসপাতাল থেকে সেখানে সরাসরি নিয়ে আসা হয়েছিল মিসেস ক্যুপারের লাশ। তাঁকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করি আমরা, তাঁর চোখ দুটো বন্ধ করে দিই। মিসেস ক্যুপার চাননি, রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর লাশের পচন রোধ করা হোক। লাশটা দেখার কথা বলা হয়নি কাউকে; যদি হতোও, কোনো ভুল করার সুযোগ ছিল না।
‘নিজের জন্য প্রাকৃতিক উইলো উইভ কাঠের কফিন বেছে নিয়েছিলেন মিসেস ক্যুপার। সে-রকম একটা কফিনের ভিতরই রাখা হয়েছিল তাঁর লাশ। কফিনের ভিতরে কখন রাখা হয়েছিল তাঁকে সেটাও বলে দিই… সকাল আনুমানিক সাড়ে ন’টার দিকে। আমি অবশ্য তখন ছিলাম না সেখানে। তবে যে-চারজন লোক কফিন বহন করে নিয়ে গিয়েছিল গির্জায়, তারা ছিল। যা-হোক, সাড়ে ন’টার পর ওই চারজন কফিনটা বয়ে নিয়ে গিয়ে রাখে শবযানে। উঠানের মতো ব্যক্তিগত একটুখানি জায়গা আছে আমাদের, সেখানে ইলেকট্রিক গেটও আছে। কাজেই রাস্তা থেকে চাইলেই কেউ হুট করে ঢুকে পড়তে পারবে না আমাদের সেই কেন্দ্রীয় মর্গে। সেখান থেকে পরে কফিনটা নিয়ে যাওয়া হয় ব্রম্পটন সেমেট্রিতে।’
‘তার মানে মর্গ থেকে কবরস্থানে যাওয়ার সারাটা পথে কেউ-না-কেউ সার্বক্ষণিকভাবে চোখ রেখেছিল মিসেস ক্যুপারের কফিনের উপর?
‘হ্যাঁ। তবে… যতদূর অনুমান করতে পারি, তিন কি বেশি হলে চার মিনিটের জন্য কফিনটা আমাদের সবার চোখের আড়ালে ছিল। কখন ঘটেছিল ঘটনাটা তা-ও বলে দিই… গির্জার পেছনের কার পার্কে যখন হাজির হয়েছিল কফিনটা, তখন। যা- হোক, এ-রকম কোনো ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর কখনও না-ঘটে, খেয়াল রাখবো।’
‘তার মানে ওই তিন কি চার মিনিটের মধ্যেই কেউ একজন অ্যালার্ম ক্লকটা ঢুকিয়ে দিয়েছে কফিনের ভিতরে?’
‘হ্যাঁ… তা-ই মনে হয় আমার।’
‘কফিনের ঢাকনা খুলে ফেলাটা কি সহজ কোনো কাজ? মানে… কেউ চাইলেই করতে পারবে সেটা?’
জবাব দেয়ার আগে কিছুক্ষণ ভাবল কর্নওয়ালিস। ‘হ্যাঁ… কফিনের ঢাকনা খুলে ফেলাটা মোটেও কঠিন কিছু না… বড়জোর কয়েক মুহূর্ত লাগবে যে-কারও। কফিনটা যদি সনাতনী কিছু হতো… অর্থাৎ নিরেট কাঠ দিয়ে বানানো থাকত, তা হলে ঢাকনাটা স্ক্রু দিয়ে আটকানো অবস্থায় থাকত কফিনের মূল কাঠামোর সঙ্গে। কিন্তু উইলো কফিনের ক্ষেত্রে ঢাকনা সাধারণত শুধু দুটো স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় থাকে।’
ওয়াইন খাওয়া শেষ বারবারার। আমাদেরকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা কি আসলেই ড্রিঙ্ক নেবেন না?’
‘না, ধন্যবাদ,’ বললাম আমি।
বারবারা বলল, ‘আমি আরেক গ্লাস খাবো। খুন আর মৃত্যু নিয়ে এত কথা শুনতে কেমন যেন লাগছে। রবার্টের কাজ নিয়ে আমরা সাধারণত বাসায় কোনো আলোচনা করি না। বাচ্চারা এসব ঘৃণা করে। অ্যান্ড্রিউ… মানে আমাদের সবচেয়ে বড় ছেলের স্কুলে একবার একটা আলোচনা হলো… কার বাবা কী করে সেসব নিয়ে। সে তখন বানিয়ে বানিয়ে সারা ক্লাসের সামনে বলে দিল, ওর বাবা একজন অ্যাকাউন্টেন্ট।’ হেসে উঠল সে। ‘অথচ অ্যাকাউন্টেন্সির কিছুই জানে না রবার্ট।’ টেবিল ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেল ফ্রিজের দিকে, নিজের জন্য ঢেলে নিল আরেক গ্লাস ওয়াইন।
ফ্রিজের দরজাটা যখন লাগিয়ে দিচ্ছে, তখন আরেকটা ছেলে ঢুকল কিচেনে। তার পরনে ট্র্যাকস্যুটের ট্রাউজার আর একটা টি-শার্ট। টবি আর সেবাস্টিয়ানের চেয়ে লম্বা। চুলের রঙ গাঢ়। সে-চুলের বোঝা কেমন অমার্জিত ভঙ্গিতে ঝুলে আছে চেহারার উপর। ‘টবি আর সেব বাগানে কেন?’ জিজ্ঞেস করল। পরমুহূর্তেই দেখতে পেল আমাদেরকে। ‘আপনারা কারা?
