‘হ্যাঁ। অ্যাশলিইকে নিয়ে আসার জন্য গিয়েছিলাম সেখানে।
‘তা হলে বরং এক কাজ করুন… আবার গিয়ে চড়ুন ওই ট্যাক্সিতে, ফিরে যান আপনার বাবা-মায়ের কাছে। নিজের প্রয়োজনেই আপনাকে খুঁজে নেবেন মিডোস।’
‘আমি কি ফিরে যেতে পারবো? যদি যাই, ওরা হয়তো ভাববে… ‘
‘ওরা কিছুই ভাববে না। কারণ যা ঘটেছে, তার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত না আপনি। শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর আপনি ছিলেন পাবে… আমাদের সঙ্গে।’
‘আমি সেটা বলিনি।’ কিন্তু কথা আর বাড়াল না গ্রেস, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। মাথা ঝাঁকাল। ‘ঠিকই বলেছেন। ভিতরে যেতে পারবো না আমি… বিশেষ করে অ্যাশলিই যখন আছে আমার সঙ্গে তখন।
‘বাবা কোথায়?’ প্রথমবারের মতো কথা বলে উঠল অ্যাশলিই। দ্বিধান্বিত বলে মনে হচ্ছে তাকে। মনে হচ্ছে, একসঙ্গে এত পুলিশ দেখে ভয় পেয়েছে।
‘বাবা নেই এখানে,’ বলল গ্রেস। ‘নানা-নানীর কাছে ফিরে যাচ্ছি আমরা।’
‘আপনি কি চান এখন কেউ একজন থাকুক আপনার সঙ্গে?’ গ্রেসকে জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘যদি আপত্তি না-থাকে আপনার, তা হলে আপনার সঙ্গে যেতে কোনো অসুবিধা নেই আমার।’
‘না। কাউকে লাগবে না আমার।’
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে থাকতে কখনোই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না আমি। কারণ তারা কখন অভিনয় করছে আর কখন করছে না, সেটা ঠিক ঠাহর করতে পারি না। যেমন গ্রেস। আপসেট দেখাচ্ছে তাকে। অশ্রু দেখা দিয়েছে চোখে। মনে হয়তো সাংঘাতিক চোটও পেয়েছে। তারপরও… আমার ভিতরের একটা অংশ যেন বলছে আমাকে… আসলে অভিনয় করছে মেয়েটা। কেন যেন মনে হচ্ছে, ট্যাক্সিতে যখন ছিল সে, তখনই সেরে নিয়েছে অভিনয়ের মহড়াটা।
ট্যাক্সির কাছে ফিরে যাচ্ছে গ্রেস, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি আমরা তাকে। অ্যাশলিইকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল, সামনের দিকে ঝুঁকে কী যেন বলল ড্রাইভারকে। কিছুক্ষণ পর চলে গেল ট্যাক্সিটা।
‘দ্য গ্রিভিং উইডো,’ বিড়বিড় করে বলল হোথর্ন।
কিন্তু কথাটা কান এড়াল না আমার। ‘আসলেই কি তা-ই মনে করেন?
‘না, টনি। একবার এক তুর্কি দম্পতির বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে শোকের যে-বহিঃপ্রকাশ দেখেছি, সেটা, কিছুক্ষণ আগে গ্রেসের ভিতরে যে- শোক দেখা গেল তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। যা-হোক, আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন তা হলে বলবো, আমাদের কাছে অনেক কিছুই গোপন করেছে মেয়েটা।’ একটুখানি হাসল হোথর্ন। ‘ড্যামিয়েন কীভাবে মারা গেছে, এমনকী সেটাও জিজ্ঞেস করেনি সে।’
১৪. উইল্স্ডেন গ্রীন
বাড়িটা ১৯৫০ সালের; ওটার মতোই দেখতে আরেকটা বাড়ির সঙ্গে একদিক দিয়ে লাগোয়া। প্রথম তলায় ব্যবহার করা হয়েছে লাল ইট, সেগুলোর সঙ্গে আছে হালকা ধূসর পলেস্তারার আবরণ। ছাদ ত্রিকোণাকৃতির। দেখলে মনে হয়, একইসঙ্গে তিনজন আর্কিটেক্ট কাজ করেছে বাড়িটা বানানোর সময়, অথচ তাদের কারও সঙ্গেই কারও দেখা হয়নি তখন। আয়নার প্রতিবিম্বের মতো দেখতে লাগোয়া বাড়িটার কারণে মনে হয়, ওই তিনজন তাদের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট। কাঠের ফেন্সের কারণে ভাগ হয়ে গেছে বাড়ি দুটোর ড্রাইভওয়ে, তবে দুই বাড়ির চিমনি একটাই। প্রতিটা বাড়িতে একটা করে বে-উইন্ডো আছে। সে-জানালা দিয়ে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়বে অসম-আকারের-সমতল-পাথর দিয়ে বানানো শানবাঁধানো ফুটপাত। নিচু একটা দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেছে ওই ফুটপাত, সে-দেয়ালের অপর পাশে স্পেয়িড রোড। আমার ধারণা, ওই বাড়িতে চারটা বেডরুম আছে। সামনের দিকের জানালায় ঝুলছে একটা পোস্টার; ওটা প্রকৃতপক্ষে উত্তর লন্ডনের একটা অনাথশালার জন্য প্রতিযোগিতবিহীন ফান-রানের বিজ্ঞাপন। একদিকে দেখতে পাচ্ছি একটা গ্যারেজ, সেটার দরজা খোলা। ভিতরে নিথর দাঁড়িয়ে আছে উজ্জ্বল সবুজ রঙের একটা ভক্সহল অ্যাস্ট্রা। আরও আছে একটা ট্রাইসাইকেল এবং একটা মোটরবাইক। জায়গা নিয়ে ওগুলোর মধ্যে মারামারি লেগে গেছে যেন।
সদর-দরজার প্রবেশপথটা খিলানাকৃতির; দরজাটা নকল-মধ্যযুগীয়, সেটাতে লাগানো আছে ফ্রস্টেড কাঁচের মোটা প্যানেল। অভিনব একটা ওয়েলকাম ম্যাট দেখতে পাচ্ছি দরজার সামনে; সেটাতে লেখা আছে: ‘কুকুর নয়, সেটার মালিক থেকে সাবধান!
হোথর্ন যখন চাপ দিল ডোরবেলে, স্টার ওয়ার্স-এর থিম সঙের শুরুর দিকের কয়েকটা লাইন শুনতে পেলাম। তবে আমার মনে হয় ওটার বদলে যদি চপিনের ফিউনারেল মার্চ শুনতে পেতাম, তা হলে মানানসই হতো বেশি। কারণ এই বাড়িতেই থাকে রবার্ট কর্নওয়ালিস।
যে-মহিলা দরজা খুলে দিল তার চেহারায় হাসিখুশি একটা ভাব আছে, কিন্তু একইঙ্গে মারমুখী ভাবও আছে। ব্যাপারটা যেন এ-রকম… গত একটা সপ্তাহ ধরে আমাদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিল সে। আমাদের দিকে কিছুটা এগিয়ে এল; ভঙ্গি দেখে মনে হলো, এখনই যেন বলবে, এসেছেন শেষপর্যন্ত? এত দেরি হলো যে?
তার বয়স প্রায় চল্লিশ; দেখলে মনে হয় মাঝবয়সের দিকে প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে চলেছে। চালচলনে ফুটে আছে সম্পূর্ণ বেপরোয়া একটা ভঙ্গি। ঢলঢলে আর বেখাপ্পা একটা জার্সি পরে আছে, সেটার সঙ্গে পরেছে বাজে ফিটিঙের জিন্স। সেটার একদিকের হাঁটুতে এমব্রয়ডারির সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুলের একটা নকশা। মাথায় কোঁকড়া চুল। অল্প যে-ক’টা গহনা দেখা যাচ্ছে গায়ে সেগুলো কেমন ছোট-ছোট আর মোটা-মোটা। ওজন বেশি। লন্ড্রিতে দেয়ার জন্য একগাদা কাপড় চেপে ধরেছে একদিকের বগলের নিচে। একহাতে দেখা যাচ্ছে একটা কর্ডলেস টেলিফোন। কিন্তু ওসব কাপড় অথবা ওই টেলিফোনের কোনো কিছুর প্রতিই তার কোনো খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। ওসবের কারণে দরজাটা খুলতে কষ্ট হলো তার; কল্পনার চোখে দেখতে পেলাম, একটা হাঁটু উঁচু করে সেটাতে ঠেস দিয়ে কাপড়ের বোঝা সামাল দিল, একইসঙ্গে কান আর কাঁধের সাহায্যে চেপে ধরল টেলিফোনটা।
