তার মানে, হোথর্ন যতটা বলেছিল, আসলে ততটা বোকা নয় মিডোস। একটা কথা ঠিকই বলেছে সে… হোথর্ন কোনোভাবে জানতে পেরেছিল কোনো একটা বিপদে পড়তে যাচ্ছে ড্যামিয়েন। কিন্তু কথা হচ্ছে, হোথর্ন কি স্বীকার করবে সেটা?
‘না,’ বলল হোথর্ন, ‘আমাকে ফোন করেনি ড্যামিয়েন।’
‘তা হলে এখানে এসেছেন কেন আপনি?’
‘আপনার কী মনে হয়? শেষকৃত্যের সেই ঘটনা… কিছু-একটা ছিল আসলে ওই ঘটনায়, এবং আপনি যদি আপনার সেই অস্তিত্বহীন চোরের পেছনে ঘুরে সময় নষ্ট না-করতেন, তা হলে আপনিও বুঝতে পারতেন। …ঠিক কী ঘটেছিল, সেটা ড্যামিয়েনের কাছ থেকে জানতে চাওয়ার ইচ্ছা ছিল আমার। কিন্তু এখানে যতক্ষণে পৌঁছালাম, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
চাবির কথাটা উল্লেখ করেনি সে। একটা ভুল যে করে ফেলেছে, সেটা স্বীকার করবে না কখনোই। কিন্তু বোধহয় ভুলে গেছে, আমি যদি কখনও লিখে শেষ করতে পারি এই বই… এটা যদি ছাপা হয় কখনও, তা হলে মিডোস অনায়াসেই পড়ে ফেলতে পারবে ব্যাপারটা।
‘আপনি বলতে চাইছেন আপনারা যতক্ষণে হাজির হয়েছেন এখানে, তার আগেই মারা গেছেন মিস্টার ক্যুপার?’
‘হ্যাঁ।’
‘এখান থেকে কাউকে চলে যেতে দেখেননি?’
‘টেরেসের একদিকে কোনো একজনের জুতোর তলার একটুখানি দাগ লেগে আছে… ড্যামিয়েনের রক্তে পা দিয়ে ফেলেছিল ভুলক্রমে… একটু কষ্ট করে যদি দেখে নেন, ভালো হয়। ওই দাগ দেখে লোকটার জুতোর মাপ অনুমান করতে পারবেন হয়তো। যা-হোক, আমি বলবো, ড্যামিয়েনকে খুন করার পর খুনি ফায়ার- এস্কেপ ধরে নেমে গেছে নিচের গলিতে। কাজেই আপনারা যদি সিসিটিভি ফুটেজ ঘাঁটেন, উপকার পেতে পারেন। তবে আমরা কাউকে দেখিনি। এখানে পৌঁছাতে আসলেই দেরি হয়ে গেছে আমাদের।’
‘ঠিক আছে তা হলে। আপনি বিদায় হতে পারেন এখন। আর সঙ্গে আপনার আগাথা ক্রিস্টিকেও নিয়ে যেতে পারেন।
আগাথা ক্রিস্টি বলতে আমাকে বোঝানো হয়েছে। আমি ক্রিস্টির দারুণ একজন ভক্ত, কাজেই মিডোসের কথাটা খারাপ লাগল।
উঠে দাঁড়াল হোথর্ন, ওর পিছু নিলাম আমি। কাঠের মেঝের উপর দিয়ে মোজা- পরা পায়ে হেঁটে হাজির হলাম সদর-দরজার কাছে।
কালো চামড়ার এক জোড়া জুতো বের করে আমাকে দিল হোথর্ন। নিচু গলায় বলল, ‘আপনার জন্য।’
‘কোথায় পেলেন?’
‘উপরতলায় যখন গিয়েছিলাম, কাবার্ডের ভিতর থেকে বের করে নিয়েছি।’ ইঙ্গিতে দেখাল পলিথিনে পেঁচানো ড্যামিয়েন ক্যুপারকে। ‘এই জুতো জোড়া খুব সম্ভব ড্যামিয়েনের… আপনার পায়ে লাগার কথা।’
দ্বিধা ফুটে উঠল আমার চেহারায়। ‘অন্য কারও জুতো…’
‘এসবের আর দরকার হবে না ড্যামিয়েনের,’ আশ্বাস দেয়ার ভঙ্গিতে বলল হোথৰ্ন।
আর কথা বাড়ালাম না, পরে নিলাম জুতো জোড়া। ইটালিয়ান জুতো, বেশ দামি। আমার পায়ে চমৎকার লেগে গেল।
এবার নিজের জুতো পরে নিল হোথর্ন। ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা। পুলিশের আরও কয়েকজন ইউনিফর্ম-পরিহিত অফিসারকে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে লাগলাম ব্রিক লেন ধরে।
বাড়ির বাইরে পার্ক করে রাখা হয়েছে পুলিশের তিনটা গাড়ি। ‘প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স’ লেখা একটা ভ্যানও দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একপাশে। তবে ওটা আসলে কারও ব্যক্তিগত না। ড্যামিয়েন ক্যুপারের লাশ মর্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসলে আনা হয়েছে কালো ওই ভ্যান।
উৎসুক জনতার ভিড় তৈরি হয়ে গেছে, তাদেরকে রাস্তার আরেক প্রান্তে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। এই রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
তারপরও আমাদের সামনে এসে থামল একটা ট্যাক্সি, সেটার ভিতর থেকে বের হলো গ্রেস লোভেল। কনুই দিয়ে মৃদু একটা গুঁতো দিলাম আমি হোথর্নকে। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যে-কাপড় পরে গিয়েছিল মেয়েটা, এখনও সেটাই পরে আছে। একহাতে ঝুলছে হ্যান্ডব্যাগ। তবে এবার অ্যাশলিই আছে তার সঙ্গে। গোলাপি একটা পোশাক পরেছে বাচ্চাটা, মায়ের হাত ধরে রেখেছে!
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল গ্রেস, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। যা ঘটছে, তা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমাদেরকে দেখতে পেয়ে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এল।
‘কী হয়েছে?’ জানতে চাইল সে। ‘পুলিশ কেন এসেছে এখানে?
‘কিছু মনে করবেন না…’ বলল হোথর্ন, ‘ভিতরে যেতে পারবেন না আপনি। খারাপ খবর আছে।’
‘ড্যামিয়েন…?’
‘খুন করা হয়েছে তাঁকে।’
আমার মনে হয় কথাটা আরেকটু কোমলভাবে বলা উচিত ছিল হোথর্নের। কারণ ওর ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তিন বছর বয়সী একটা মেয়ে। সে যদি শুনে ফেলে থাকে কথাটা, এবং বুঝে ফেলে থাকে, তা হলে কী হবে?
মেয়েটাকে নিজের দিকে টেনে নিল গ্রেস, রক্ষা করার কায়দায় জড়িয়ে ধরেছে মেয়েটার কাঁধ। ফিসফিস করে বলল, ‘কী বলতে চাইছেন?’
‘শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর কেউ একজন হামলা চালিয়েছে ড্যামিয়েনের উপর।’
‘সে কি… মারা গেছে?
‘হ্যাঁ… বলতে খারাপই লাগছে… কিন্তু ঠিক সেটাই ঘটেছে।’
‘না। সম্ভব না। আপসেট হয়ে পড়েছিল ড্যামিয়েন। বলেছিল, বাসায় ফিরে যাবে। আসলে ভয়ঙ্কর সেই তামাশা শোনার পর পরই…’ হোথর্নকে ছাড়িয়ে বাড়ির দরজার দিকে তাকাল গ্রেস, তারপর আবার তাকাল হোথর্নের দিকে। এতক্ষণে বোধহয় বুঝতে পারছে, চলে যাচ্ছি আমরা। ‘কোথায় যাচ্ছেন আপনারা?’
‘ফ্ল্যাটের ভিতরে মিডোস নামের একজন ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর আছেন। তদন্তের দায়িত্ব এখন তাঁর উপর। আমার ধারণা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইবেন তিনি। তবে যদি আমার একটা পরামর্শ শোনেন… এই মুহূর্তে ফ্ল্যাটের ভিতরে যাওয়ার দরকার নেই আপনার। কারণ এখন সেখানে যাওয়াটা খুব একটা সুখকর হবে না আপনার জন্য। …আচ্ছা, এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনি? আপনার বাবা-মায়ের সঙ্গে?’
