‘মিস্টার হোথর্ন?’ বলল সে, তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মনোরম কণ্ঠ শুনলে উচ্চ-শিক্ষিত বলে মনে হয় তাকে।
‘না,’ বললাম আমি, ইশারায় দেখিয়ে দিলাম হোথর্নকে। ‘তিনি হোথর্ন।
‘আমি বারবারা। প্লিয ভিতরে আসুন। কিছু মনে করবেন না… আমাদের বাড়ির ভিতরটার অবস্থা বেশি ভালো না। রবার্ট অন্য একটা ঘরে আছে। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে কী ঘটেছে, সেটা আইরিন বলেছে আমাদেরকে। শুনে মনে আঘাত পেয়েছি আমি। …আপনারা তো পুলিশে আছেন, তা-ই না?’
‘এই কেসে পুলিশকে সাহায্য করছি আমি,’ বলল হোথৰ্ন।
‘এদিক দিয়ে আসুন! এই যে, এদিকে একটা রোলার স্কেট পড়ে আছে, খেয়াল রাখবেন। বাচ্চাগুলোকে এতবার বলেছি এসব যাতে হলে ফেলে না-রাখে… কথা শুনতে চায় না ওরা।’ বগলের নিচে চেপে রাখা কাপড়ের গাদার উপর চোখ পড়ল বারবারার। ‘আমার অবস্থা দেখুন! আমি দুঃখিত। ডোরবেলটা যখন বাজল, তখন এসব মাত্র ধুতে দিচ্ছিলাম। আমার ব্যাপারে কী ভাবছেন আপনারা, কে জানে!’
রোলার স্কেটটা টপকালাম আমরা দু’জন, এগিয়ে চলেছি হলওয়ে ধরে। এখানে-সেখানে পড়ে আছে কোট, ওয়েলিংটন বুট আর বিভিন্ন সাইজের কিছু জুতো। একদিকে একটা চেয়ারের উপর রাখা আছে মোটরবাইকের একটা হেলমেট। দুটো বাচ্চা ছুটে বেড়াচ্ছে সারা ঘরে। তাদেরকে দেখতে পাচ্ছি না আমরা, কিন্তু তাদের উঁচু কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি… ছুটতে ছুটতে মনের আনন্দে চেঁচাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত পরই একদিকের একটা খোলা দরজা দিয়ে ছুটে বের হলো তারা… দুটো ছেলে, দু’জনেরই চুল ধূসর, বয়স পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে। আমাদের দিকে একবারমাত্র তাকাল, তারপরই ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল আরেকদিকে। এখনও চিৎকার করছে।
‘টবি আর সেবাস্টিয়ান,’ বললেন বারবারা। ‘আর কিছুক্ষণ পর গোসলে ঢুকবে ওরা দু’জন, তারপর যদি একটু শান্তি পাই আমি! আপনাদের বাসায় কি বাচ্চাকাচ্চা আছে? …মাঝেমধ্যে আমার কী মনে হয়, জানেন? মনে হয়, এই বাড়ি যেন কোনো একটা যুদ্ধক্ষেত্র!’
এদিক-ওদিক তাকালাম আমি। বাচ্চা দুটো সারা বাড়ি তছনছ করে ফেলেছে। রেডিয়েটরের উপর পড়ে আছে কাপড়, সব জায়গায় ছড়িয়েছিটিয়ে আছে বিভিন্ন রকমের খেলনা… ফুটবল, প্লাস্টিকের তলোয়ার, স্টাফ-করা পশুপাখি, টেনিসের পুরনো র্যাকেট, প্লেয়িং কার্ডস, লেগোর পিস। এসব এড়িয়ে নিজেদের চলাচলের জন্য জায়গা করে নেয়া আসলেই মুশকিল কাজ। তারপরও যখন হাজির হলাম লিভিংরুমে, পুরনো এই বাসা বেশ আরামদায়ক বলে মনে হলো আমার কাছে। ফায়ারপ্লেসের ধারে দেখা যাচ্ছে শুকিয়ে-আসা ফুল, মেঝেতে বিছানো আছে সী- গ্রাস কার্পেট। একধারে দেখা যাচ্ছে একটা পিয়ানো, তবে সেটা আর কাজ করে কি না সন্দেহ। গোলাকৃতির পেপার ল্যাম্পশেডগুলো দেখলে মনে হয় ওগুলো কখনোই সেকেলে হয়ে যাবে না। দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে বেশ কিছু পেইন্টিংস; বিমূর্ত চিত্রকলা ঠাঁই পেয়েছে ওগুলোতে, তবে সবগুলোই বর্ণিল। দেখলে মনে হয় সাধারণ কোনো ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কেনা হয়েছে ওসব।
বারবারার পেছন পেছন তাদের কিচেনে যাচ্ছি, এমন সময় হোথর্ন বলল, ‘আপনার স্বামীর ব্যবসায় কি আপনিও কাজ করেন, মিসেস কর্নওয়ালিস?’
‘ঈশ্বর, না! আর আমাকে বারবারা বলে ডাকতে পারেন।’ একটা চেয়ারের উপর ধপ করে সব কাপড় নামিয়ে রাখল সে। ‘আমি একজন ফার্মাসিস্ট… তবে পার্ট-টাইম। ‘বুটস’-এর স্থানীয় একটা শাখায় কাজ করি। ওই কাজ যে খুব ভালো লাগে আমার, তা না, কিন্তু সংসারের খরচাপাতি জোগাতে গেলে কিছু-একটা করতে হয়।
কিচেনে হাজির হলাম আমরা। ঘরটা আলোকোজ্জ্বল, তবে এলোমেলো। একধারে একটা ব্রেকফাস্ট বার আর সাদা রঙের দেহাতি গড়নের একটা টেবিল আছে। সিঙ্কের উপর স্তূপ করে রাখা হয়েছে নোংরা জিনিসপত্র। সেগুলোর পাশেই আবার দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার কিছু তৈজস। কাজের সময় কোন্টা লাগবে না-লাগবে, সেটা কীভাবে নির্ধারণ করে বারবারা, ভেবে খানিকটা আশ্চর্য হলাম। রান্নাঘরে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো আছে, একটা বাগানের দিকে মুখ করে আছে সেটা। আকারে সবুজ একটা আয়তক্ষেতের চেয়ে কিছু বড় হবে ওই বাগান, সেটার এককোনায় গজিয়ে আছে কিছু লতাগুল্ম, বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে সেগুলো। টবি আর সেবাস্টিয়ান কলোনি স্থাপন করেছে ওখানেও… একটা ট্র্যাম্পোলিন দেখতে পাচ্ছি, আরও দেখতে পাচ্ছি একটা ক্লাইম্বিং ফ্রেম। লনের বেশিরভাগ জায়গা শেষ করে দিয়েছে ওসব জিনিস।
টেবিলটার এককোনায় বসে আছে রবার্ট কর্নওয়ালিস। ব্রম্পটন চ্যাপেলে যে- স্যুট পরে ছিল, সেটাই পরে আছে, তবে টাই পরেনি। কিছু হিসাবপত্র দেখছে। একজন ফিউনারেল ডিরেক্টরকে তাঁর পার্লারের বাইরে এভাবে বসে থাকতে দেখে আশ্চর্য লাগল আমার।
‘এই যে, রবার্ট,’ বারবারা জানিয়ে দিল আমাদেরকে… যেন পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে তার স্বামীর সঙ্গে। তারপর তাকাল কর্নওয়ালিসের দিকে। তিরস্কার করার ঢঙে বলল, ‘তুমি এখনও ওসব নিয়ে বসে আছ? সাপার রান্না করতে হবে আমাদেরকে, বাচ্চাগুলোকে ঘুম পাড়াতে হবে। এদিকে পুলিশ এসে হাজির হয়েছে বাসায়।
‘শেষ করে ফেলেছি,’ হিসাবনিকাশের খাতাটা বন্ধ করল কর্নওয়ালিস। তাকাল আমাদের দিকে, ইশারায় দেখিয়ে দিল তার সামনের দুটো চেয়ার। ‘মিস্টার হোথর্ন, প্লিয বসুন।’
