‘আপনি বলেছেন, পরে এখান দিয়েই পালিয়ে গেছে লোকটা,’ মনে করিয়ে দেয়ার কায়দায় বললাম আমি।
‘এখানে একজায়গায় একটা ফুটপ্রিন্ট আছে,’ ইশারায় দেখিয়ে দিল হোথর্ন। তাকালাম আমি।
ফায়ার এস্কেপের একধারে, সিকি চাঁদের আকৃতির লাল একটা দাগ দেখা যাচ্ছে।
বুঝলাম, ওটা খুনির জুতোর তলার দাগ… কোনো কারণে পা দিয়ে ফেলেছিল ড্যামিয়েনের রক্তে।
ডায়ানা ক্যুপারের বাসার সেই ফুটপ্রিন্টের কথা মনে পড়ে গেল আমার। হতে পারে, দুটো ফুটপ্রিন্ট একই জুতোর।
‘পালিয়ে যাওয়ার সময় এই ফ্ল্যাটের সামনের দিকের দরজাটা ব্যবহার করার উপায় ছিল না খুনির,’ বলল হোথর্ন। ‘আপনি দেখেছেন, কীভাবে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে ড্যামিয়েনকে। রক্তের ছিটা কমবেশি লাগার কথা খুনির গায়েও। ওই অবস্থায় ব্রিক লেন ধরে যাবে সে, আর কেউ লক্ষ করবে না তাকে… সেটা কি সম্ভব? কাজেই আমার অনুমান, কোট অথবা ওই জাতীয় কিছু-একটা চাপিয়ে নিয়েছে সে গায়ে, তারপর এই ফায়ার এস্কেপ ধরে নেমে গেছে, শেষে নিচের গলি ধরে অদৃশ্য হয়ে গেছে।’
‘কফিনের ভিতরে সেই অ্যালার্ম ক্লক এল কী করে, জানতে পেরেছেন?’
‘এখনও না। কর্নওয়ালিসের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে আমার মনে হয় না, খুব জলদি ছাড়া পেতে চলেছি আমরা এখান থেকে। মিডোসের কাছে আনুষ্ঠানিক একটা বিবৃতি দিতে হতে পারে আপনার। আগেই বলে রাখি, বেশি কিছু বলবেন না ওকে। খুব ভালো হয়, যদি বোবা সেজে থাকার চেষ্টা করেন।’
পরের দুই ঘণ্টায় পুলিশের লোক দিয়ে গিজগিজ করতে শুরু করল ড্যামিয়েন ক্যুপারের ফ্ল্যাটটা। আমরা দু’জন চুপচাপ বসে আছি… কিছুই করার নেই। পুলিশের যে-দুই কন্সটেবল হাজির হয়েছিল সবার আগে, তারা খবর দিয়ে নিয়ে এসেছে তাদের ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টরকে; ওই লোক পরে খবর দিয়েছে মার্ডার ইনভেস্টিশন টিমকে। বিশেষ সেই দলের জনা ছয়েক সদস্য এখন হুড়ওয়ালা প্লাস্টিসাইড্ পেপার স্যুট পরে, মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফ্ল্যাটের এখানে-সেখানে। তাদের একজনের থেকে অন্যজনকে আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই। হাজির হয়েছে পুলিশের একজন ফটোগ্রাফারও; লোকটা যখন কয়েক-মুহূর্ত-পর-পর অত্যুজ্জ্বল ফ্ল্যাশের সাহায্যে ফ্ল্যাটের এ-জায়গা সে-জায়গার ছবি তুলছে, তখন মনে হচ্ছে, এই ফ্ল্যাট যেন জমে যাচ্ছে কোনো বরফখণ্ডের মতো। একজন পুরুষ আর একজন মহিলা… দু’জনই ফরেনযিক টিমের সদস্য… ঝুঁকে আছে ড্যামিয়েনের মৃতদেহের উপর, কটন বাডের সাহায্যে লাশের হাত আর ঘাড় মুছছে খুব সাবধানে। ছুরিকাঘাতের সময় খুনির সঙ্গে যদি কোনো শারীরিক সংস্পর্শ ঘটে থাকে ড্যামিয়েনের, তা হলে হয়তো ড্যামিয়েনের দেহে খুনির ডিএনএ রয়ে যেতে পারে।
ড্যামিয়েনের লাশ যখন সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় হলো, তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল দু’জন অফিসার; পলিথিন দিয়ে পেঁচিয়ে দিল পুরো শরীরটা। দৃশ্যটা দেখে একইসঙ্গে প্রাচীন মিশর আর ফেডেরাল এক্সপ্রেসের কথা মনে পড়ে গেল আমার।
ফ্ল্যাটের সদর-দরজার সামনে সাদা আর নীল টেপ পেঁচিয়ে দিয়েছে পুলিশ, সিঁড়ির খানিকটাও আটকে দিয়েছে ওই টেপ। এই ফ্ল্যাটের উপরতলা আর নিচতলার অধিবাসীদের ব্যাপারে কী করবে পুলিশ, জানি না ঠিক। এখন-পর্যন্ত পুলিশের কোনো অফিসার কিছু জিজ্ঞেস করেনি আমাকে। তবে প্লাস্টিকের স্যুট পরিহিত এক মহিলা হাজির হয়েছিল আমার কাছে, আমার জুতো জোড়া খুলতে বলেছিল। কাজটা আমি করার পর ও-দুটো নিয়ে চলে গেছে সে। ব্যাপারটা হতভম্ব করে দিয়েছে আমাকে।
হোথর্নকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার জুতো দিয়ে কী করবে পুলিশ?’
‘ফুটপ্রিন্ট,’ বলল হোথর্ন। ‘আনুষ্ঠানিক তদন্ত কার্যক্রম থেকে আপনাকে বাদ দিয়ে চায় ওরা আসলে।’
‘জানি। কিন্তু ওরা তো আপনার জুতো জোড়া নিল না?’
‘কারণ আমি আপনার চেয়ে অনেক বেশি সাবধান।’
নিজের পায়ের দিকে তাকাল সে। এখনও মোজা পরে আছে। তার মানে ড্যামিয়েনের লাশটা যখন দেখতে পেয়েছিল, তখনই হয়তো খুলে ফেলেছিল জুতো জোড়া।
‘আমার জুতো ফেরত পাবো কখন?’ জানতে চাইলাম।
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথৰ্ন।
এখানে আর কতক্ষণ থাকতে হবে আমাদেরকে?’
জবাব দিল না সে আবারও। আরেকটা সিগারেট দরকার হয়ে পড়েছে ওর, কিন্তু এখানে ধূমপান করতে দেয়া হবে না ওকে। এবং সে-কারণে বিরক্তি বোধ করছে সে।
কিছুক্ষণ পর হাজির হলো মিডোস। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে-থাকা লগ অফিসারের হাতেধরা কাগজে স্বাক্ষর করে ঢুকল ভিতরে। ড্যামিয়েন ক্যুপারের হত্যাকাণ্ডের কেস গ্রহণ করল আনুষ্ঠানিকভাবে। এবার তার এক অন্য রূপ দেখতে পেলাম আমি। শান্ত আছে, তবে কর্তৃত্বপূর্ণ একটা ভাব বজায় রেখেছে চেহারায়। ক্রাইম সিন ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলল কিছুক্ষণ, তারপর কথা বলল ফরেনযিক টিমের সঙ্গে। কিছু নোট নিল। শেষপর্যন্ত যখন এগিয়ে এল আমাদের দিকে, সরাসরি চলে গেল কাজের কথায়।
‘আপনারা কী করছেন এখানে?’
‘সান্ত্বনা জানাতে এসেছিলাম আসলে।
‘বাজে কথা বাদ দিন, হোথর্ন। সিরিয়াস একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছি আমি। নিহত লোকটা কি ফোন করেছিল আপনাকে? নাকি আপনি কোনোভাবে জানতে পেরেছিলেন বিপদে পড়তে পারেন তিনি?’
