দুই পুলিশ অফিসারকে কেমন নিরাশ বলে মনে হচ্ছে আমার। তাদের কারও কাছেই কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই। কারও পরনে সানগ্লাস নেই। দু’জনই যুবক, চেহারায় স্থিরসংকল্পের ছাপ। একজন এশিয়ান, অন্যজন শ্বেতাঙ্গ। আমাদের সঙ্গে আর তেমন কোনো কথা বলল না তারা কেউ।
রেডিও বের করল একজন, কী ঘটেছে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে লাগল। এই সুযোগে ঘরটা নিজের মতো করে দেখে নিচ্ছে হোথর্ন। ওর দিকে তাকিয়ে আছি আমি।
ঘরের দরজার কাছে হাজির হলো সে, তারপর গেল টেরেসে। দরজার হাতলে যাতে হাত না-পড়ে যায়, সে-ব্যাপারে সতর্ক আছে। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে সাবধানে ধরল হাতলটা। লক করা ছিল না ওই দরজা। টেরেসে গেল সে, তারপর গায়েব হয়ে গেল আমার দৃষ্টিপথ থেকে।
এখনও খুব খারাপ লাগছে আমার, তারপরও উঠে দাঁড়ালাম চেয়ার ছেড়ে, অনুসরণ করলাম হোথর্নকে। তাকালাম পুলিশের দুই অফিসারের দিকে। ফোন করার কথা ছিল তাদের, সেটা করেছে তারা। দেখে মনে হচ্ছে এখন আর কিছু করার নেই তাদের। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে… দেখছে কোথায় যাচ্ছি আমি। আমি কে, সেটাও জিজ্ঞেস করেনি।
টেরেসে, বিকেলের বাতাসে বেরিয়ে আসামাত্র ভালো লাগতে শুরু করল। এখানে কয়েকটা ডেকচেয়ার দেখতে পাচ্ছি। আরও আছে পাত্রে লাগানো বেশ কিছু গাছ। একধারে একটা গ্যাস বারবিকিউ-ও আছে। এসব দেখে স্টুডিয়ো’র কোনো সেটের কথা মনে পড়ে গেল।
একধারে দাঁড়িয়ে আছে হোথর্ন, তাকিয়ে আছে নিচের দিকে। খেয়াল করলাম, জুতো জোড়া খুলে ফেলেছে… খুব সম্ভব কোনো ফুটপ্রিন্ট রাখতে চাইছে না। আবারও ধূমপান করছে। সে এত বেশি সিগারেট খায় যে, আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় কাজটা করে আসলে আত্মহত্যা করার জন্য। কম করে হলেও বিশটা সিগারেট খায় দিনে। সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে তাকাল।
‘খুনি এখানে অপেক্ষা করছিল,’ বলল সে। ‘শেষকৃত্যানুষ্ঠান থেকে যতক্ষণে এখানে ফিরে এসেছিল ড্যামিয়েন ক্যুপার, তার আগেই ব্রিটানিয়া রোডের সেই বাসা থেকে হাতিয়ে-নেয়া চাবি কাজে লাগিয়ে এই ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়েছিল খুনি। এবং ড্যামিয়েনকে খুন করে পালিয়ে গেছে এখান দিয়েই।’
‘এক মিনিট। এসব কথা আপনি জানলেন কীভাবে? আর… বার বার বলছেন লোকটা’… একজন পুরুষমানুষই যে খুন করেছে ড্যামিয়েন ক্যুপারকে, নিশ্চিত হলেন কী করে?’
‘পর্দা আটকানোর দড়ি কাজে লাগিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল ডায়ানা ক্যুপারের। আর তাঁর ছেলেকে বলতে গেলে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে। কাজেই খুনি হয়-কোনো পুরুষমানুষ, নয়তো প্রচণ্ড রাগী কোনো মহিলা।’
‘কিন্তু বাকিটা? খুন কীভাবে হয়েছে সে-ব্যাপারে নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?’
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল হোথর্ন, কিছু বলল না।
‘আপনি যদি চান এই কেস নিয়ে কোনো বই লিখি, তা হলে সব কথা সোজাসাপ্টা বলতে হবে। অন্যথায়, এই কাজ বাদ দিতে হবে আমাকে।’ এ-রকম হুমকি আগেও দিয়েছি আমি, আবারও দিলাম।
‘ঠিক আছে।’ সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল হোথর্ন। দেখলাম, বাতাসে একবার গোত্তা খেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সেটা। ‘নিজেকে খুনির জায়গায় বসান। কী চিন্তাভাবনা চলছে তার মাথায়, ভেবে দেখুন।’
‘যেমন?’
‘যেমন আপনি জানতেন, শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান থেকে এখানে ফিরে আসবে ড্যামিয়েন। আর তাই আপনি একটা এমপি থ্রি প্লেয়ার ঢুকিয়ে দিলেন কফিনের ভিতরে, আর চালিয়ে দিলেন সেই ‘দ্য হুইলস অন দ্য বাস’ ছড়াটা। ইচ্ছাকৃতভাবেই করলেন কাজটা, যাতে এখানে আসতে বাধ্য হয় ড্যামিয়েন। আবার এমনও হতে পারে, আপনি নিজেই গিয়েছিলেন কবরস্থানে… মিশে ছিলেন জনতার ভিড়ে, অথবা অদৃশ্য হয়ে ছিলেন কোনো একটা কবরফলকের আড়ালে। হয়তো শুনেছেন, ড্যামিয়েন তার গার্লফ্রেন্ডকে বলছে, ‘বাসায় ফিরে যাচ্ছি আমি।’ আর ঠিক তখনই পরিকল্পনাটা এঁটে নিলেন মনে মনে।
‘শুধু একটাই সমস্যা ছিল আপনার… বাসায় একা ফিরবে কি না ড্যামিয়েন, সে-ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। তার সঙ্গে হয়তো গ্রেসও ফিরে আসত। আবার এমনও হতে পারত, সঙ্গে করে ভিকারকে নিয়ে আসত ড্যামিয়েন। কাজেই আপনার আসলে এমন একটা জায়গা দরকার, যেখানে লুকিয়ে থেকে অপেক্ষা করতে পারবেন… যদি সে-রকম কোনো সুযোগ না আসে তা হলে চট করে পালিয়েও যেতে পারবেন।’ বুড়ো আঙুলের ইশারায় টেরেসের নিচটা দেখিয়ে দিল হোথর্ন। ‘নিচতলার দিকে একটা স্টেয়ারকেস নেমে গেছে।’
‘তার মানে… খুনি সম্ভবত ওই পথেই হাজির হয়েছিল?’
‘না। লিভিংরুমের দরজাটা লক করা ছিল, এবং ভিতর থেকে হুড়কো আটকানো ছিল।’ মাথা নাড়ল হোথর্ন। ‘খুনির কাছে চাবি ছিল। সদর-দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকেছে সে। তারপর নিজের জন্য লুকানোর একটা জায়গা খুঁজে নিয়েছে… হাজির হয়েছে এখানে। এই জায়গা যুৎসই ছিল তার জন্য। এখান থেকে জানালার কাঁচ ভেদ করে তাকিয়ে সহজেই দেখতে পেয়েছে সে, ড্যামিয়েন ক্যুপার একা এসেছে, নাকি তার সঙ্গে অন্য কেউ আছে। যা-হোক, একাই এসেছিল ড্যামিয়েন। এবং সেটাই চেয়েছিল খুনি। লিভিংরুমের ভিতরেচট করে ঢুকে পড়েছিল ড্যামিয়েনের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে, এবং তারপর… ‘ বাকি কথা শেষ করল না।
