আপনমনে বললাম, ‘বিশেষ ওই দুর্ঘটনার পর মিসেস ক্যুপার প্রথমেই পুলিশের কাছে যাননি, কারণ তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল ড্যামিয়েন।’
কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল হোথর্ন, তবে আমি যা বলেছি সে-ব্যাপারে কিছু না। বরং বলল, ‘আপনাকে এখানে কিছুক্ষণের জন্য একা রেখে যেতে হবে আমাকে। ইতোমধ্যে নাইন নাইন নাইনে ফোন করেছি আমি। ফ্ল্যাটটা চেক করে দেখা দরকার।’
‘যান, চেক করুন।
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে, সর্পিলাকার সেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে।
আর্মচেয়ারে বসে আছি আমি, ভুলেও তাকানোর চেষ্টা করছি না ড্যামিয়েনের লাশের দিকে। ভয়াবহ যেসব ক্ষত তৈরি হয়েছে ওর শরীরে, সেগুলোর ব্যাপারে ভাবছি না। কাজটা মোটেও সহজ না। কারণ যখনই চোখ বন্ধ করে ফেলছি, রক্তের সেই গন্ধ যেন বাড়ি মারছে আমার নাকে। চোখ খুললেই দেখতে পাচ্ছি রক্তের সেই পুকুর, অথবা হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে-থাকা ড্যামিয়েনকে। শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নিলাম, তাকালাম আরেকদিকে… আসলে আমার দৃষ্টিপথ থেকে বিদায় করে দিতে চাইছি ড্যামিয়েন ক্যুপারকে।
ঠিক তখনই গুঙিয়ে উঠল সে।
চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম আবার, ধরেই নিয়েছি যা শুনেছি তা আমার কল্পনা ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু আবারও শুনতে পেলাম শব্দটা… কেমন বিভীষিকাময়। এখনও মেঝের সঙ্গে লেগে আছে ড্যামিয়েনের মাথা, আমার উল্টোদিকে তাকিয়ে আছে সে, কিন্তু আমি নিশ্চিত আওয়াজটা সে-ই করেছে।
‘হোথর্ন!’ চিৎকার করে উঠলাম। একইসঙ্গে টের পাচ্ছি, পিত্তরস উঠে আসছে আমার গলার কাছে। ‘হোথৰ্ন!’
সিঁড়িতে ধুপধাপ আওয়াজ হচ্ছে। হুড়মুড় করে উঠে আসছে হোথর্ন। ‘কী হয়েছে?’
‘ড্যামিয়েন!’ আবারও চেঁচালাম আমি। ‘বেঁচে আছে সে!’
ঘরের ভিতরে হাজির হলো হোথর্ন, সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এগিয়ে গেল লাশটার দিকে। ‘না, বেঁচে নেই।’
‘এই মাত্র তার গলার আওয়াজ শুনলাম।
আবারও গুঙিয়ে উঠল ড্যামিয়েন, এবার আগের চেয়েও জোরে। এবং ব্যাপারটা মোটেও আমার কল্পনা না। কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে লোকটা।
কিন্তু নাক সিঁটকানো ছাড়া আর কিছু করল না হোথর্ন। ‘যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন, টনি। এসব ভুলে যান, ঠিক আছে? মাংসপেশী শক্ত হয়ে আসছে ড্যামিয়েনের, এবং সেসব মাংসপেশীর মধ্যে লোকটার ভোকাল কর্ডের আশপাশের পেশীও আছে। শুধু তা-ই না, লোকটার পেটের ভিতরে কিছু গ্যাস আছে, সেগুলোও বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আর ওই শব্দও শুনতে পেয়েছেন আপনি। এ-রকম ঘটনা সব সময়ই ঘটে।’
‘ওহ্,’ কেন মরতে থাকতে গেলাম এখানে, ভেবে আফসোস লাগছে আমার। কেন এই জঘন্য বই লিখতে রাজি হলাম, সেটা ভেবেও আফসোস হলো।
একটা সিগারেট ধরাল হোথর্ন।
‘উপরতলায় কিছু খুঁজে পেয়েছেন?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘অন্য কেউ নেই এখানে,’ বলল হোথর্ন।
‘আপনি জানতেন খুন করা হবে ড্যামিয়েনকে।’
‘জানতাম বললে ভুল হবে। বলা ভালো, আমি জানতাম, তার খুন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
‘কীভাবে জানতে পারলেন?’
নিজের একহাতের তালুতে সিগারেটের ছাই ঝাড়ল হোথর্ন। বুঝতে পারছি, আমার প্রশ্নটার জবাব দেয়ার তেমন ইচ্ছা নেই ওর। বলল, ‘গাধামি করে ফেলেছি। তবে… আমরা দু’জন যখন প্রথমবার এলাম এখানে, আমার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন আপনি।’
‘তার মানে ভুলটা আমার?
‘আপনাকে বলেছিলাম, আমি যখন কারও সঙ্গে কথা বলবো, তখন মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা দরকার আমার। আপনি যদি তখন ব্যাঘাত ঘটান, তা হলে যা ভাবছি আমি তা নষ্ট হয়ে যায়… আমার চিন্তার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে যায়।’ একটু নরম হলো হোথর্নের কণ্ঠ। ‘তবে… দোষটা আমার। আমিই মিস করেছি ব্যাপারটা।’
‘কী মিস করেছেন?’
‘ড্যামিয়েন বলেছিল, তার মা নাকি এখানে এসেছিলেন, টেরেসের গাছগুলোতে পানি দিয়েছিলেন। বলেছিল, তার মা এমনকী তার মেইলও ফরওয়ার্ড করেছিলেন। কথাটা মনে রাখা উচিত ছিল আমার। আচ্ছা, আপনার কি মনে আছে, আমরা দু’জন যখন ডায়ানা ক্যুপারের বাসায় গিয়েছিলাম, তাঁর রান্নাঘরে পাঁচটা হুক দেখতে পেয়েছিলাম? মনে আছে?’
‘কাঠের একটা মাছের গায়ে লাগানো ছিল ওই হুকগুলো।’
‘ঠিক। এবং চারটা হুকে চার সেট চাবি ছিল।
‘একটা হুক খালি ছিল।’
‘হুঁ। কেউ একজন খুন করেছে মিসেস ক্যুপারকে। তারপর সুযোগ বুঝে বিশেষ এক সেট চাবি হাতিয়ে নিয়েছে ওই মাছের গা থেকে।’ থামল হোথর্ন, এইমাত্র যা বলল সেটা ভেবে দেখছে। ‘ব্যাপারটা কিন্তু একটা সম্ভাবনা হতে পারে।’
সদর-দরজার সঙ্গে যে-সিঁড়ি আছে, সেখান থেকে ভেসে আসছে একাধিক লোকের পায়ের আওয়াজ। ইউনিফর্ম পরিহিত দু’জন পুলিশ অফিসার হাজির হলো। প্রথমে লাশটার দিকে, তারপর আমাদের দিকে তাকাল তারা। বুঝবার চেষ্টা করছে, কী ঘটছে।
‘যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন আপনারা,’ বলল এক অফিসার। ‘আপনাদের মধ্যে কে ফোন করেছিলেন?
‘আমি,’ বলল হোথৰ্ন। ‘আসতে দেরি করে ফেলেছেন আপনারা।‘
‘আপনি কে, স্যর?’
‘প্রাক্তন ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর হোথর্ন… একসময় এম.আই.টি.-তে ছিলাম। ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর মিডোসের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছি। যা-হোক, বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে আমার, চলমান একটা হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সঙ্গে এই খুনের সম্পর্ক আছে। কাজেই স্থানীয় ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টরকে এবং মার্ডার স্কোয়াডে খবর দেয়াটাই বোধহয় ভালো হবে আপনাদের জন্য।’
